পায়খানা ও কলঘর পাশাপাশি। সুনীতের মনে হল কলঘরে গিয়ে এবার সে সিগারেট খেতে পারে। আকাশে তাকিয়ে বুঝল আর কিছু পরেই ভোর হবে। পরপর লরি চলার শব্দ এবার শুরু হয়েছে। উপরের ফ্ল্যাটে কাশতে কাশতে কে দরজা খুলল কলঘরে যাবার জন্য। কাছাকাছি একটা বাড়ির ছাদে পোলট্রি আছে। একটা মোরগ কয়েকবার ডেকে উঠল।
সুনীত সিগারেট ধরিয়ে প্রথম টান দিয়েই নিভিয়ে ফেলল। এতটা অসাবধানী সে কী করে হল। সিগারেটের গন্ধে কলঘর ভরে থাকলে সুবল কি চমকে উঠবে না?
এইবার থেকে তাকে সাবধানে, হিসেব করে প্রতিটি মুহূর্ত চলতে হবে। একটি ভুল করলেই সে ফাঁস হয়ে যাবে। বদ্ধ, সংকুচিত, গতিহীন জীবন, তার সঙ্গে উদ্বেগ আর ভয় এবার থেকে তাকে নিয়ন্ত্রিত করবে। সুনীত বিষণ্ণ হয়ে পড়ল। বাইরের পৃথিবী তার কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছে ভোর হবার সঙ্গে সঙ্গে। চৌবাচ্চচার পাড়ে বসে দু’হাতে সে মুখ ঢাকল।
দরজা খোলার শব্দ হয়েছে।
সুনীত ভেবে পাচ্ছে না কোথায় লুকোবে। সময় নেই ভাববার। যা থাকে বরাতে…সে প্রায় লাফিয়ে পায়খানায় ঢুকে দরজার পাল্লা সন্তর্পণে ভেজিয়ে দিল।
সুবলের পায়ের শব্দ এগিয়ে আসছে। সদ্য ঘুমভাঙা মানুষের অনিশ্চিত মন্থর পদক্ষেপ। জড়ানো গলায় কী যেন বিড়বিড় করল। কলঘরে বালতি সরাবার শব্দ। সুনীত উৎকর্ণ হয়ে রইল এবার আর একটা শব্দ শোনার জন্য এবং তা পেতেই বুকের মধ্যে জমে ওঠা বাতাস আস্তে আস্তে ছেড়ে দিল।
জল ঢেলে সুবল বারান্দা দিয়ে ফ্ল্যাটের মধ্যে ফিরে গেল। নীচে খড়মের শব্দ হচ্ছে, চরিত্তর উঠেছে। গেটের তালা খুলে বাইরে যাবে, দাঁতন করবে। পাল্লা ফাঁক করে সুনীত তাকিয়ে দেখল গুণেন ভবনের দেওয়ালে, জানলার এবং সিমেন্টের উঠোনে ভোরের ফিকে আলো হালকাভাবে পড়েছে। কুয়াশার মধ্য থেকে যেন বাড়িটা ফুটে উঠছে। সুবল আলো জ্বেলেছে দালানের। ওর ছায়াটার চলাফেরা মাঝে মাঝে দেখা যাচ্ছে। নিশ্চয় দালানের জানলা দুটোও খুলেছে।
সুবল দালান ঝাঁট দিল। বালতি নিয়ে কলঘরে এল এবং জল নিয়ে ফিরে গেল। কিছুক্ষণ পরেই সে বেরোবার জন্য দরজা খুলল। ফ্ল্যাট অরক্ষিত যেহেতু উমা এখনও ঘর থেকে বেরোয়নি সুতরাং বাইরে থেকে দরজায় তালা দিয়ে দুধ আনতে যাবে। সুনীত পায়খানা থেকে বেরিয়ে হাঁটু ভেঙে, কুঁজো হয়ে, দেয়াল ঘেঁষে নীচের দিকে তাকাল। সিঁড়ির শেষ তিনটে ধাপ এখান থেকে দেখা যায়। ওই ধাপক’টা দিয়ে সুবলের পাজোড়া নেমে যাবার পরই সে একটা নিশ্চিন্তির মধ্যে এবার আশ্রয় নিতে পারবে। চারপাশে দেয়াল, মাথায় ছাদ এবং প্রয়োজন মেটাবার জিনিসগুলো অন্তত পাবে।
উমা নিশ্চয় এখনও বিছানা থেকে ওঠেনি। ও কি ঘরের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ করে ঘুমোচ্ছে। সুনীত কোনোদিন তা দেখেনি কিন্তু এখন সে নেই বলে যদি খিল দেয়! ভাবতে গিয়ে সে বিরক্ত হল। বুড়ো সুবল ছাড়া চড়াও হবার মতো আর কে আছে এই ফ্ল্যাটে।
হাঁটু পর্যন্ত কাপড় তোলা, সুবলের লিকলিকে পা দুটি দেখামাত্র সুনীত প্রায় ছুটেই বারান্দা অতিক্রম করে দালানে এল। আলো জ্বলছে, জানলা দুটো খোলা। সুনীত ঝপ করে বসে পড়ল। পর্দা ঝুলছে বটে কিন্তু জানলার সবটা ঢাকা নেই। কান্তির বউ খুব ভোরে রান্নাঘরে এসে উনুন ধরাবার তোড়জোড় শুরু করে। সেখান থেকে এই দালান দেখা যায়।
শোবার ঘরের দরজা বন্ধ। হামাগুড়ি দিয়ে দরজার দিকে যাওয়ার সময় তার মনে হল, জুতো পরে বারান্দা দিয়ে ছুটে আসাটা বোকার মতো কাজ হয়েছে। হামাগুড়ি দেওয়া উচিত ছিল। মৃদু আলোর মধ্যে, দুই তিন কি চার সেকেন্ডের জন্য হলেও, একজন ছুটে গেল, এবং তা যদি কেউ ঘুমভাঙা চোখে দেখে থাকে তাহলে সেটা গল্প করার মতো বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
দরজায় চাপ দিতেই খুলে গেল। ঘর অন্ধকার, জানলাগুলো বন্ধ। ঘুমন্ত মানুষের শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। এই অন্ধকারে উমাকে গায়ে হাত দিয়ে জাগালে ও ধড়মড়িয়ে উঠে বসবে এবং চিৎকার করতে পারে। আলো জ্বেলে নিলে? ঘুমভাঙা অসাড় অসংলগ্ন চেতনায়, একটা সাত দিনের দাড়িওলা, উসকোখুসকো চুলভরা মুখ যদি হঠাৎ ছায়া ফেলে তাহলে কী প্রতিক্রিয়া হবে? তার থেকে বরং স্বাভাবিক ওর ঘুমভাঙার জন্য অপেক্ষা করা যেতে পারে। এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা সে বসে থাকতে পারে। এটা তার নিজের ঘর।
ঘরের কোথায় কোন জিনিস সে জানে, অবশ্য এই সাত দিনে যদি উমা অদলবদল করে না থাকে। সন্তর্পণে জানলার পাল্লা সে একটু ফাঁক করল। কোমল আলোর ভাপ ফাঁক দিয়ে ঘরের মধ্যে এসে অন্ধকারকে ঠেলে সরাতে পারল না। কাত হয়ে কুঁকড়ে থাকা উমাকে সে বুঝতে পারছে।
সুনীত বিছানার কাছে এগিয়ে এল। সাবধানে খাটে বসল। প্রায় অসহায় সরল ঘুমন্ত মুখখানি ঘিরে কালোচুলের রাশ। ঘুমের গভীরে নেমে প্রশান্তির মধ্যে উমা এখন অবগাহনে ব্যস্ত। ব্লাউজের উপরের বোতাম দুটি খোলা, রাত্রে শোবার আগে ও ব্রেসিয়ার খুলে রাখে।
মনে পড়ছে না তার, এতখানি বয়সেও সে এমন অসামান্য বিমোহনকারী কোনো দৃশ্যের সম্মুখীন হয়েছে। হয়তো দিনের এই প্রথম আলোর মায়া কিংবা আশ্রয় লাভের স্বস্তি তাকে মুগ্ধ হতে সাহায্য করছে। শূন্য থেকে ধীরে ধীরে নেমে আসা তুলোর আঁশের মতো সন্তর্পণ কোমলতা এখন উমার সারা অবয়বে। নীচের ঠোঁট আলগা হয়ে নেমে রয়েছে। অভিমানীর মতো। ওর কাঁধ, বালিশ চাপা গাল, ভুরু, চোখের পাতা সে আজই প্রথম খুঁটিয়ে লক্ষ করতে করতে আবিষ্কার করল, উমা একটি শিশু। পুতুল বুকে জড়িয়ে এইভাবে ওরা ঘুমোয়।
