আর একটু চেষ্টা করলে সে মাস, সপ্তাহ এমনকী বার-এর নামও মনে করতে পারে। এই সিনেমা হলটার সামনে দিয়েই সে প্রতিদিন অফিসে যাতায়াত করে কিন্তু কখনও তার স্মৃতিতে ভেসে ওঠেনি। তারা দুজনে আর কখনও এই হলে সিনেমা দেখেনি। তার আফসোস হল, মনের এই প্রাঞ্জলতা, তৎপরতা দেখার মতো কেউ এখন সঙ্গে নেই। ফোটোগ্রাফি মাফিক পুঙ্খানুপুঙ্খতায় তার স্মৃতি এখন কাজ করছে। কাহিনির ক্ষুধার্ত নায়ক গোগ্রাসে যখন একটা পাঁউরুটি খাচ্ছিল তখন এক বুড়ি ভিখারি জুলজুল চোখে তাকিয়ে থাকে। নায়ক তক্ষুনি আধখাওয়া রুটিটা তার হাতে দিয়ে চলে যায়।
পকেটে বাকি যা ছিল, প্রায় সাড়ে তিন টাকা, সুনীত ওই বুড়ির তালুর উপর রাখে। তালুটা সঙ্গে সঙ্গে মুড়ে ফেলে ঘড়ঘড় শব্দে সে কিছু একটা বলে। সুনীত বুঝে যায়, বুড়ি জানে না কত পয়সা এখন তার মুঠোয় রয়েছে।
বুড়িকে রেখে সে হেঁটেছিল। পরে তার মনে হয় বুড়িকে না দিয়ে ওই পয়সায় রাত্রির শো-এ সিনেমা দেখলে সময় অনেকখানি কাবার করা যেত। সুনীত ভেবে রেখেছিল, জামা এবং চটি ত্যাগ করবে। যা পরে গত রবিবারে বেরিয়েছিল তাই পরেই ফিরবে।
জামা ও চটি জলের মধ্যে ফেলে দেওয়াই নিরাপদ। রেললাইনের ধারে টানা একটা খালের কথা তার মনে পড়ে। কিন্তু রাত্রে অন্ধকারের মধ্যে মানুষ দেখলে রেলরক্ষী পুলিশ যদি চ্যালেঞ্জ করে? এই ভেবে সে রেললাইনের বাঁধের তলা থেকেই ফিরে এসেছে।
সুনীত এখন ভাবল জামা এবং চটি ইট ভেজানোর চৌবাচ্চচাটায় ডুবিয়ে রাখলে কেমন হয়! মিস্ত্রি মজুরদের মধ্যে যে প্রথম দেখবে তারই লাভ হবে। কাগজের মোড়ক খুলে সে নীল বুশশার্ট ও পাম্প শু বার করে পরে নিল এবং পরিত্যক্ত জিনিস দুটি চৌবাচ্চচায় ফেলে দিল। তারপর গোটাদশেক ইট বয়ে নিয়ে গেল পাঁচিলের তলায়।
পাঁচিল টপকাতে খুব অসুবিধা হল না। অপর দিকে জমিতে পা রাখার পর সুনীতের দুটো কনুই জ্বালা করতে শুরু করেছে। পাঁচিল থেকে লাফ দিলে, কনুই ঘষড়ে ঝুলে নামার দরকার হত না। কিন্তু লাফ দেবার মতো জোর, সে জানে, তার হাঁটুতে নেই।
সে ভেবেই রেখেছে এবার কী করবে। ডানদিকে গুণেন ভবন, বাঁদিকে মাঠ এবং সর্বত্র অন্ধকার। এখন শেষরাত, ঘুম এখন গাঢ়তম। কোলাপসিবল গেটে তালা দেওয়া। ভিতরের আলো নেভানো। সুনীতের মনে হল তার জন্য যেন পরিবেশটা সাজিয়ে রাখা হয়েছে। চাবিটা সাত দিন ধরে তার পকেটে। তালা খুলে, একটি মানুষ গলে যাবার মতো ফাঁক করল। ভিতরে এসে গেট বন্ধ করে তালা দিল। চরিত্তর সিং ভোরবেলায় গেটের তালা খোলা দেখে যেন অবাক না হয়। অবাক হওয়ার কারণটা খুঁজে পাওয়ার বাতিক অনেক মানুষেরই থাকে।
সে ভেবেই রেখেছে এরপর কী করবে। উঠোনে সিমেন্টের ঢাকা ট্যাঙ্কটায় এবার উঠতে হবে। ট্যাঙ্কের তলা পরিষ্কার করতে ভিতরে নামার জন্য এর উপর উঠতে হয় এবং ওঠার জন্য চারধাপ পাকা সিঁড়ি আছে। সেখান থেকে, সে যাকে ‘ব্রিজ’ বলে, সেই চারগজ লম্বা দোতলার বারান্দাটায় পৌঁছতে হবে দেয়ালের খাঁজে পা রেখে, পাইপ ধরে। বারান্দাটাকে সে ‘ব্রিজ’ বলে যেহেতু কলঘর পায়খানা তাদের ফ্ল্যাট থেকে একটা দ্বীপের মতো বিচ্ছিন্ন এবং খোলা বারান্দাটার দ্বারা যুক্ত। প্রত্যেক ফ্ল্যাটেরই এই ‘ব্রিজ’ রয়েছে চারতলা পর্যন্ত থাক দিয়ে।
উমা বলেছিল, খোলা বারান্দা দিয়ে কলঘরে যাওয়া-আসাটা অশ্লীল ঠেকে। সুনীত মিস্ত্রি এনে বারান্দার কোমর সমান পাঁচিলের উপর কাঠের ফ্রেম বসিয়ে তাতে ত্রিপল লাগিয়ে দেয়। রোদ, বৃষ্টি, বাতাস প্রভৃতি কালক্রমে জীর্ণ করে দেওয়ায় এখন ত্রিপলের সবটাই খসে গেছে, ফ্রেমের কাঠও খুলে গেছে দু-তিন জায়গায়।
বহুবার মাঝরাতে কলঘরে আসার জন্য দরজা খুলে সুনীত দাঁড়িয়ে থেকেছে। কেন যেন তার মনে হত, কেউ হয়তো অন্ধকারে ঘাপটি মেরে আছে। বুকটা কেঁপে উঠত। যদি চোর এসে লুকিয়ে থাকে। বারান্দা দিয়ে কেউ এলেই মাথায় ডান্ডা মেরে অজ্ঞান করে, ফ্ল্যাটে ঢোকার জন্য হয়তো অপেক্ষা করছে। তখন সে ভাবত, চোরটা কীভাবে আসতে পারে? সেই ভাবনা থেকেই সে বারান্দায় উঠে আসার ঘাঁতঘোঁতগুলো বার করে ফেলে।
সুনীত খসে যাওয়া ত্রিপলের ফাঁক দিয়ে বারান্দায় উঠে এল। চমৎকারভাবে নির্ঝঞ্ঝাটে এ পর্যন্ত সে প্রতিটি কাজ করেছে, চরিত্তরের ঘরটা ট্যাঙ্কের পাশেই, ভয় ছিল যদি শব্দটব্দ হয়।
কেউ দেখেনি, কারুরই ঘুম ভাঙেনি এই শীতের ভোর রাতে। কিন্তু সুনীত ঘামছে। কনুই দুটো জ্বালা করছে ঘাম গড়িয়ে নামায়। এবার সব থেকে কঠিন অংশটা বাকি। তাকে অপেক্ষা করতে হবে। ভোরের আলো ফুটলেই আর এই ব্রিজের উপর অপেক্ষা করা চলবে না। ‘বি’ ব্লকের কেউ দেখে ফেলতে পারে বিশেষত কান্তির ফ্ল্যাট থেকে।
প্রথমে ওঠে সুবল। দরজার খিল খুলে সে পেচ্ছাব করতে আসবে। কিন্তু কোথায় করতে আসবে, কলঘরে যে নর্দমাটা আছে সেখানে না পায়খানায়? সুনীত এইবার দিশাহারা হল। সুবল এতদিন কোথায় পেচ্ছাব করে আসছে এই তথ্যটা তার জানা নেই। যদি কলঘরে যায় তাহলে সে পায়খানায় ঢুকে দরজা বন্ধ করে থাকবে। কাজ সেরে ফেরার পর ও বারান্দার দরজাটা বন্ধ করবে না। যতক্ষণ না দুধ আনার জন্য ফ্ল্যাট থেকে বেরোবে ততক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। সুবল খুঁতখুঁতে সাবধানী লোক।
