”না।”
”ছবিটা কোথায়?”
”ঘরেই আছে।”
এত অনিচ্ছুক ক্লান্ত উদাসীন স্বর কেন!
সুনীত এগিয়ে এসে পর্দা সরিয়ে ঘরের মধ্যে তাকাল। সামনে নেই, ডাইনে বামে দেওয়ালেও নেই, তার গা ঘেঁষে দরজার পাশেই প্রায় একমানুষ লম্বা…চমকে এক পা পিছিয়ে এল সে।
স্মিত হাসি ভরা মুখে পঙ্কজ আচার্য তাকিয়ে। বিরাট শরীরটা বারান্দার রেলিংয়ে হেলিয়ে রাখা। পিছনে ময়দানের কয়েকটা গাছ এবং তার পিছনে আকাশ। ঊর্ধ্বমূল নয়, লোকটি যেন হাজার বছরের একটি কাণ্ড। ওরই পাতাবিহীন শাখাপ্রশাখাগুলো, সুনীতের সন্দেহ হল, বোধহয় তার নিজের শরীরের মধ্যেই বিছিয়ে আছে। ফোটোটার দিকে মুখ তুলে সে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকতে থাকতে নিজের মধ্যে তীব্র কটু একটা গাছের গন্ধ পেল। নিজের বাহুতে হাত বুলোল-কর্কশ রুক্ষ পুরু ছাল!
এখন যদি আকাশমুখো হাত তুলি, সুনীত ভাবল, তাহলে কি বাওবাব হয়ে যাব?
ছয়
গুণেন ভবনের দক্ষিণ ঘেঁষে তৈরি হচ্ছে একতলা বাড়িটা। তৈরির কাজ বন্ধ হয়ে এখন অর্ধ সমাপ্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। পাঁচ ফুট উঁচু পাঁচিলে ঘেরা, পুবদিকে পাঁচিলের খানিকটা খোলা লরিতে মাল আনার জন্য। বাড়ির পিছন দিকে পশ্চিমে ফুটবল মাঠটা। এই বাড়ির পরই বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটা সদ্য তৈরি বাড়ি আর অপেক্ষায় আছে ঝোপঝাপ ভরা প্লট। তারপর অযত্ন অবহেলায় ক্ষতবিক্ষত একটা পিচ ও পাথরকুচির রাস্তা যেটা এঁকেবেঁকে সি আই টি রোডে পড়েছে। গুণেন ভবনের দক্ষিণ দিকের ফ্ল্যাটগুলো থেকে বিস্তীর্ণ জমি এবং গাছপালা দেখা যায়। দক্ষিণের ঘরগুলোয় এত হাওয়া যে হালকা ছবি দেয়াল থেকে পড়ে যায়। অধিকাংশ সময় জানলা বন্ধ রাখতে হয় হাওয়ার উৎপাতে।
মশারা ছেঁকে ধরেছে সুনীতকে। শব্দ না করে সে ঘাড়ে চাপড় দিল। তালুতে আঙুল ঘষে ভিজে ভিজে নরম একটা জিনিস অনুভব করল। এই নিয়ে বোধহয় এগারোটা। ঠান্ডায় আড়ষ্ট শরীরে মশার কামড়ের জ্বলুনি কমই লাগে।
মুখ তুলে তাকাল সে। গুণেন ভবন অন্ধকার। জানলাগুলো বন্ধ। গোলাপবাগান রোডের দিকে রাস্তায় আলো জ্বলছে না। সি আই টি রোডের আলো জ্বলছে। পরিষ্কার আকাশে ঝকঝকে তারাগুলোর জন্য অন্ধকারটা পাতলা হয়ে সুনীতকে সাহায্য করছে তার চারপাশের জিনিসগুলোকে দেখতে।
সে বসে আছে সারিবদ্ধ ইটের মাঝে একটা তক্তার উপর ইটে ঠেস দিয়ে। হাত কয়েক দূরে ইট ভেজবার চৌবাচ্চচা। বৃষ্টির জল জমে আছে বোঝা যায় তারার আলোর প্রতিবিম্ব থেকে। বাঁশ আর তক্তা এবং ভাঙা ইট ইতস্তত ছড়ানো। বহুবার তার সিগারেট খেতে ইচ্ছে করেছে, কিন্তু পকেটে হাত দিয়েও বার করতে ভরসা পায়নি। অন্ধকারে বহু দূর থেকে আগুনের ফোঁটা দেখা যায়।
সে ঠিক করে ফেলেছে কীভাবে কাজটা করবে। পাঁচিলটা টপকে গুণেন ভবনের গা ঘেঁষে নামতে হবে। গলা সমান উঁচু পাঁচিল। সে এটুকু জানে, দু’হাতের চাড় দিয়ে নিজেকে টেনে তোলার মতো জোর শরীরে নেই। ব্যায়াম না করলে এটা সম্ভব নয় এবং কোনোদিনই সে করেনি। কিছু ইট পাঁচিলের কাছে নিয়ে গিয়ে ধাপ বানাতে হবে।
সুনীত নড়েচড়ে বসল। বারকয়েক দাড়িতে তালু ঘষল। সিগারেট কেনার সময় দোকানটার আয়নার মুখ দেখেছিল। কামিয়ে ফেলবে কি না ভেবেছিল। তারপর ঠিক করে থাকুক। দাড়িটা সাত দিনে এমন কিছু বড়ো হয়নি যে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে বরং ব্যক্তিত্ব বদলে সাহায্য করছে। জামা এবং চটিই বরং বেমানান লাগছে দাড়ির সঙ্গে।
পকেটে ছিল প্রায় এগারো টাকা। এগুলো রেখে দেবার কোনো যুক্তি সে পেল না। উমা খুশি হবে টাকাটা পেলে। সঙ্গে সঙ্গে মাটির ঘটের মধ্যে ফেলবে নোটগুলো ভাঁজ করে করে। তারপর একদিন ঘটটা ভেঙে রেজগি আর নোটগুলো গুনতে বসবে ব্যাঙ্কে জমা দিতে যাবার আগে।
শেষবারের মতো কী খাওয়া যায়, যা আর সম্ভব হবে না। সুনীতের বহুরকম খাদ্যের কথা মনে পড়ে এবং ভেবে দেখে আশ্চর্য হয় সব খাবারই সে উমাকে দিয়ে আনাতে বা তৈরি করিয়ে নিতে পারে। তবে মদ আনানো সম্ভব নয় এবং এখন তার কাছে মদ খাওয়ার মতো টাকাও নেই বা থাকলেও সে খাবে না। তখন সে একটা মিষ্টির দোকানে ঢুকে আটটা রাজভোগ খায়। খেতে কোনোরকম অসুবিধা বোধ করেনি।
দোকান থেকে বেরিয়ে সে এক কনস্টেবলকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে, গোলাপবাগান রোড কোনদিক দিয়ে যাবে? লোকটি কিছুক্ষণ ভেবে বলেছিল, জানে না। তার ইচ্ছা হয়েছিল তর্ক করতে, মানিকতলার মোড়ে দাঁড়ানো পুলিশ কেন বলতে পারবে না? গোলাপবাগান রোড বেশি দূরে নয়, তা ছাড়া বোমা, ছোরা, খুনের জন্যও রাস্তাটার খ্যাতি আছে। কিন্তু কথা না বাড়িয়ে সুনীত সরে যায়। নিশ্চিন্ত হয়, তার ফোটো এই লোকটা দেখেনি বা তার পোশাক ও দৈহিক বিশেষত্বগুলি জানিয়ে সুনীত মুখার্জিকে দেখলেই পাকড়াও করার নির্দেশ একে দেওয়া হয়নি। হয়তো পুলিশবাহিনীর কাউকেই দেওয়া হয়নি কিংবা দেওয়া হয়েছে কিন্তু এই কনস্টেবলটি বোকা ধরনের কিংবা কর্মতৎপর হওয়ার কোনো ইচ্ছা এর নেই।
সিনেমা-বাড়ির গেটের লাগোয়া দেওয়ালে ঠেস দিয়ে এক থুরথুড়ে বুড়ি বসেছিল আলোর নীচেই। ডান হাতটি জমির উপর পেতে রাখা, তালুতে একটি পাঁচ পয়সা। বুড়ি মুখ তুলে ঘোলাটে চোখদুটিও পেতে রেখেছে পথচারীদের মুখে। সুনীত থমকে দাঁড়িয়ে পকেটে হাত ঢোকায়। বাকি পয়সা একেই দিয়ে যাবে। বুড়ির মুখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ তার মনে হয় এইরকম চোখ সে আগে দেখেছে। ধীরে ধীরে তার মনে পড়ে বহু বছর আগে, প্রায় তেরো-চোদ্দো বছর হবে, এই সিনেমা হলেই উমার সঙ্গে একটা হিন্দি ফিল্ম দেখেছিল। গল্পটাও তার মনে পড়ছে, এমনকী কোন সিটে তারা বসেছিল তা-ও। সেই ফিল্মে ঠিক এইরকম এক বুড়ি ভিখারিকে তিরিশ সেকেন্ডের জন্য দেখা গেছল। তারপর আরও খুঁটিনাটি তার মনে ভেসে ওঠে-সিনেমা হল থেকে ম্যাটিনি শো দেখে যখন তারা বেরোয় তখন রোদের ঝাঁঝ কেমন ছিল, আকাশের রং কী ছিল, দুজনে একটা দোকানে চা খায়, দোকানটার নাম বিষ্ণু কেবিন।
