”নাহ, প্যাকেটে কী আছে?”
”জামা আর জুতো।”
”কোথাও যাচ্ছ নাকি! এটা কী গায়ে পরেছ?”
”রবিবার থেকে আমি বাড়ি যাইনি।”
অবাক চোখে রুবি তাকাবে এটা সে ধরেই রেখেছিল। কিন্তু এতটা রুক্ষতা ফুটে উঠবে ভাবেনি।
”কেন যাওনি?”
না যাওয়ার কারণটা সুনীত বলতে পারল না। তার মনে হচ্ছে, সহ্যক্ষমতার কিনারে এখন সে পৌঁছেছে। খুন করেছে শুনলে, রুবির হৃদয়ের দরজাগুলো অবশ্যই বন্ধ হয়ে যাবে। এখন কিছু একটা অবলম্বন তার চাই যেটা ধরে সে খাড়া থাকতে পারে। তার মস্তিষ্ককে সজাগ ও সক্রিয় রাখা দরকার সিদ্ধান্তে পৌঁছতে, জেলে যাবে না নিজের পরিচয় ঘুচিয়ে কোথাও নিজেকে গোপন করে রাখবে?
”কোথায় ছিলে তাহলে এই ক’দিন?”
”রাস্তায়। ভাবছি কোথাও চলে যাব।”
”বউকে সঙ্গে নিয়ে?”
”না, একাই।”
”চাকরি ঠিক করে ফেলেছ?”
”না।”
”তবে?”
সুনীত মুখ নিচু করে, থালায় সাজানো চপগুলো আবার গুনল। এগুলো ভাজা হলে রং কেমন হবে? শ্বেত ভাল্লুকের তালুর রঙের মতো কি? সুনীতের চোখের সামনে ডান হাতের তালুটা উঠেছিল এবং কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার বাঁ-গালের উপর বিস্ফোরিত হয়েছিল। সে ছিটকেই পড়ত, যদি স্টিল আলমারিটা আর এক হাত দূরে থাকত। বিশ্রী একটা শব্দ হয়েছিল আলমারির গায়ে আছড়ে পড়ার। আশ্চর্য, চশমাটা কিন্তু নাকের উপরই ছিল ওই প্রচণ্ড ধাক্কা সত্ত্বেও। পঙ্কজ আচার্যের মার্জিত শিক্ষিত সুসভ্য মুখটা থেকে ছিঁড়েখুঁড়ে বেরিয়ে আসছিল অনিয়ন্ত্রিত হিংসা এবং আবেগ। যখন দু’হাতের থাবায় তার কাঁধ ধরে ঝাঁকাচ্ছিল তখন ওই বিশাল দেহের কাছে নিজেকে তুচ্ছ মনে হয়েছিল। দেহের আকার একটা বড়ো ব্যাপার! রুবির সামনে অপমানিত, নিগৃহীত হওয়া সত্ত্বেও সুনীতের তখন মনে হয়েছিল, এই লোকটা নির্ভরতা পাবার জন্য একটা দখল চায়।
সেই দখলে সে হাত বাড়িয়েছিল। তার কয়েক ঘণ্টা পর হাবাও দখলচ্যুত হতে চায়নি। কিন্তু কী ভাগ্য বেচারার। পঙ্কজ আচার্য দাঁতে দাঁত চেপে বলেছিল, ”থিফ…ইউ ব্লাডি থিফ।” হাবাও নিশ্চয় কিছু একটা বলেছিল।
”ভাবছি নতুন করে জীবন শুরু করব।”
”সেটা কী ব্যাপার? জীবনটা পুরনো হল কবে?”
কী করে একে বোঝাব জীবনে কী ঘটে গেছে। সুনীত ফাঁপরে পড়ে চশমাটা নাক থেকে নামিয়ে হাতে নিল। রুবি লক্ষ করেছে একটা কাচ নেই কিন্তু কিছু বলল না।
”এসব আলোচনা এখন থাক।”
”সেই ভালো।… বলো কীজন্য এসেছ।”
”এমনিই, কেন আমি কি অকারণে আসতে পারি না?”
চোখে চোখ রেখে পরস্পরকে যেন মেপে নিচ্ছে, এমনভাবে ওরা তাকিয়ে রইল। কে প্রথম চোখ সরাবে।
সুনীতই সরাল। রুবির চোখে অনাগ্রহ এবং প্রত্যাখ্যান লুকোনো নেই। সুনীত ধীরে মুখটা ফিরিয়ে শোবার ঘরের দিকে তাকাল। দরজার পর্দাটা সামান্য ফাঁক হয়ে আছে। তার মনে হল কী যেন একটা সে দেখতে পাচ্ছে না। চশমাটা পরল। পর্দার ফাঁক দিয়ে ঘরের দেওয়ালটা দেখা যাচ্ছে। ছবিটা নেই।
সুনীত তাকাল রুবির মুখের দিকে। রুবি দ্রুত মুখ ফিরিয়ে থালাটা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়াল।
”রাধু, এগুলো নিয়ে যা তো।”
রুবি শোবার ঘরের দিকে যেতে গিয়েও থমকে ফিরে এসে, টেবিলে এক হাতের ভরে শরীর রেখে ঝুঁকে পড়ল।
”আর তুমি এসো না। আমাকে ভুলে যাও…পারবে, অনায়াসেই পারবে, খুব ছেঁদো শোনালেও ভুলে যাওয়া এমন কিছু শক্ত কাজ নয়…আমার অসুবিধে আছে, সুনীত খুব অসুবিধে আছে। খেয়েপরে বেঁচে থাকাটাই সবথেকে বড়ো ব্যাপার…ভালোবাসা, আত্মা, স্বাধীনতা এসব নিয়ে এখন আর কিছু বোলো না।”
রুবির কাঁধ, ঘাড়, গলা বা ব্লাউজের স্ফীতি সুনীতকে আর উত্ত্যক্ত করছে না। এখন ভয় তাকে গ্রাস করতে এঁকেবেঁকে উঠে আসছে শিরদাঁড়া বেয়ে। রুবির প্রথম চুম্বনের সমু সে এই অনুভবই পেয়েছিল। মনে হচ্ছিল রুবি শুষে নিচ্ছে তার মস্তিষ্ক। বাস্তব বোধ এবং যুক্তি সে বোধহয় আর ফিরে পাবে না।
”চাকরিটা আমি হারাতে পারব না, কিছুতেই পারি না। তুমি তো জানো, বাবা-মা ভাই বোন, আটজনের সংসার আমাকেই দেখতে হয়। আমার ব্যক্তিগত ইচ্ছা-অনিচ্ছার জন্য ওদের তো বিপন্ন করতে পারি না, পারি?”
রুবির কণ্ঠস্বর শুকনো, আবেগবর্জিত। নিশ্চয় এই ক’দিন ধরে ও ভেবেছে, সিদ্ধান্তে এসেছে। সুনীত ভাবল, তাহলে আমার কী সিদ্ধান্ত!
”কেন পারা যায় না? বাঁচাটাই যদি বড়ো কথা হয় তাহলে চুটিয়ে বাঁচো। আমাদের জীবনের মাপ খুবই ছোটো, তার অর্ধেকই তো কেটে গেল। বলদের মতো আর কেন অন্যদের ভার বওয়া। ঝুঁকি নাও, আধপেটা শরীরকে পুষিয়ে দেবে তোমার মনের…।”
রুবি হাত তুলেছে। হাতটা টেবিলে আছড়ে নামাল। বিরক্তিতে ভ্রূ কোঁচকানো। কণ্ঠস্বরে তিক্ততা।
”তুমি যে এইসব বলবে মোটামুটি তা আমি জানি।…প্লিজ সুনীত তর্কাতর্কি নয়। অভাব আর খিদে কী জিনিস তা তুমি জানো না।”
”তাহলে…।”
”চাকরি ছাড়ার পাগলামি কোরো না, এত টাকা মাইনের চাকরি কোথাও পাবে না। ঘরে বউ আছে, দায়িত্ব আছে, কর্তব্য আছে এটা মনে রেখো।”
সুনীত উঠে দাঁড়াল। এবার তাকে যেতে হবে, কিন্তু কোথায়? সোজা থানায় গিয়ে ওদের চমকে দিয়ে কী বলবে, ”আত্মসমর্পণ করতে এসেছি…আর পারলাম না, কোথাও জায়গা নেই।”
রুবির ছবিটা তার দেখতে ইচ্ছে করল। কিন্তু দেয়ালে নেই। কেন খুলে ফেলল, ব্যাপার কী!
”আমি চলে যাবার পর, কিছু কি হয়েছিল তোমার সঙ্গে?”
