বহুদিন সুনীত চার মাসের শিশুটিকে মন দিয়ে লক্ষ করেছে, তার আকার গঠন এবং বাইরের রূপ থেকে কল্পনা করতে চেষ্টা করেছে, সে কোন কোন জায়গায় এই শিশুটি থেকে আলাদা হয়ে গেছে। কোনো মিল খুঁজে না পেয়ে অবাক হয়ে যেত।… প্রথম যেদিন রুবির ফ্ল্যাটে সে যায়, ওর শোবার ঘরের দেয়ালে ফাঁক করা পর্দার মাঝে ফ্রেমে বাঁধানো একটা বিভ্রান্তিকর জিনিসের দিকে তার চোখ পড়েছিল।
রুবি মুখ টিপে হেসে বলেছিল, ”ওটা কী বলো তো?”
সুনীত চোখ সরু করে তাকিয়ে থাকে। প্রথমে মনে হয়েছিল শঙ্খের একটা টুকরো তারপর মনে হয় বালিয়াড়ির স্ফীত একটু অংশ। অসহায়ভাবে সুনীত মাথা নাড়তেই রুবি দু’ধারের পর্দা আর একটু সরিয়ে দেয়।
”এবার বলো।”
”বুঝতে পারছি না।”
রুবি আরও ইঞ্চি চারেক সরায়। সুনীত আবার মাথা নাড়ে। তার মনে হচ্ছে ঘোড়ার মসৃণ পিঠ… পাথরে গড়া কোনো ঢালু উপত্যকা যদি উঁচু থেকে দেখা যায়…বা মেঘের অংশ।
পর্দাটা সম্পূর্ণ সরিয়ে, রুবি হাসতে থাকে। এক জানলা থেকে অন্য জানলা পর্যন্ত প্রায় পাঁচ ফুট বিস্তৃত দেওয়ালে ছবিটা সাঁটা। এক রমণী সোফায় উবুড় হয়ে শুয়ে। মাথা থেকে পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত নগ্ন। অন্ধকারের মাঝে পাশ থেকে আসা মৃদু আলোয় দেহটির উপর নরম আলোছায়ার রহস্য। বালিশে ডোবানো মুখ ঘিরে অন্ধকার। তুলির একটা জোরালো টানে যেন কাঁধ থেকে নিতম্বের বহিঃরেখা আঁকা হয়ে আছে। হাঁটু থেকে পায়ের পাতা তরল হয়ে গলে পড়েছে আলোর মধ্যে।
রুবি হেসেছিল।
”কে তুলেছে?”
”মিহির। বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করতে বলে দু’বছর আগে একদিন ওর স্টুডিয়োতে নিয়ে গিয়ে আমার অনেকগুলো ছবি তুলেছিল। তারই একটা এনলার্জ করে, বাঁধিয়ে দিয়ে গেছে। আমি তো কিছুতেই রাজি হচ্ছিলাম না। তবে মিহিরকে না বলা খুব কঠিন। ভালো হয়নি?”
সুনীত স্তম্ভিত হয়ে ছবিটার দিকে তাকিয়ে থেকেছিল। ছবির কারিগরি না দেহটি, কার যে প্রশংসা করবে ভেবে পায়নি।
”এভাবে ঢেকে রেখেছ কেন?”
”সবাই দেখুক এটা আমি চাই না।”
”বিজ্ঞাপনে ব্যবহার হলে, লক্ষ লক্ষ চোখ দেখবে।”
”তারা তো জানবে না ছবিটা কার।”
”তোমার তখন কিছু হচ্ছিল না?”
”কিছু! তুমি বলছ লজ্জাটজ্জা?…নাহ।”
‘নাহ’ ধ্বনিটি খুব স্বাভাবিকভাবেই রুবির মুখ থেকে বেরিয়েছিল। তারপর একটা ইংরেজি ইঞ্জিনিয়ারিং পত্রিকা খুব বিজ্ঞাপনটা দেখায়…বিরাট একটা যান্ত্রিক হাতুড়ির নীচে দেহটি, যেন থেঁতলে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে নিশ্চিন্ত সারল্যে। সুনীত শিউরে উঠেছিল।
”কী ভয়ংকরভাবে ব্যবহার করেছে তোমাকে।”
”মিহির ওইরকমই, এক এক সময় মনস্টার হয়ে যায়।”
‘মনস্টার’ শব্দটা তাহলে রুবিই মাথায় পুঁতে দিয়েছিল। মিহির এবং বাবা দুজনেই উত্ত্যক্ত হতে চায় হয়তো জীবন্ত থাকার জন্য। সুনীত ভাবল তাকেও কি উত্ত্যক্ত হতে হবে নাকি। কীভাবে?
ধড়মড়িয়ে সে উঠে বসল। খেয়াল করেনি তখন রুবি এসে পড়েছে। গেটের মধ্য দিয়ে ঢুকে যাচ্ছে খয়েরি সিল্কের শাড়ি পরা একজন, কোমর থেকে নিম্নাঙ্গের সুঠাম চলনেই বোঝা যায় রুবি। ওকে কিছুক্ষণ সময় দিতে হবে। তিনতলায় উঠবে, শোবে বা বসবে, ফ্রিজ থেকে জল বার করে খাবে, আয়নার সামনে দাঁড়াবে তারপর হয়তো স্নান করতে বাথরুমে ঢুকবে। কিন্তু এই ঠান্ডার দিনে কি স্নান করবে?
সুনীত ঠিক করল, মোটামুটি আধ ঘণ্টা সময় রুবিকে দেবে ক্লান্তি ও বিরক্তি কাটিয়ে ওঠার জন্য।
আধ ঘণ্টা পর সুনীত কলিংবেলের বোতামে চাপ দিল। একটু সময় নিয়ে দরজার পাল্লা ফাঁক হল। সুনীতকে দেখেই রাধুর মুখটা পাংশু হল এবং দরজার পাল্লা খুলবে কি না, তাই নিয়ে যেন দ্বিধায় পড়ল।
”কে?”
ভিতর থেকে রুবির স্বর ভেসে এল।
”আমি।”
এই দ্বিতীয়বার সুনীত আজ গলার স্বর চড়াল। নিজেই পাল্লাটা ঠেলে, রাধুকে সরিয়ে ভিতরে ঢুকল। খাবার টেবিলের পাশে রুবি চেয়ারে বসে। টেবিলের উপর যে জিনিসগুলো রয়েছে তাই থেকে সুনীত অনুমান করল মাছের চপ তৈরিতে রুবি ব্যস্ত।
শুকনো হেসে রুবি জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল। অস্বস্তি বোধ করল সুনীত, তার মনে হচ্ছে এখানে সে অবাঞ্ছিত। রবিবারের পর রুবি নিশ্চয়ই তাই ভাবতে পারে; শ্বেত ভাল্লুক শুধু অফিসেই কর্তা নয়, এই ফ্ল্যাটেও।
”তুমি অফিস যাওনি?”
সুনীতের মনে হল অফিস থেকে ফিরে আধ ঘণ্টার মধ্যেই এমন জাঁকিয়ে খাবার তৈরিতে বসে যাওয়া সম্ভব নয়। নিশ্চয় সে তাহলে অন্য কাউকে গেট দিয়ে ঢুকতে দেখেছে। যার শরীরের গড়ন রুবিরই মতো।
”না, ছুটি নিয়েছি। তুমিও তো যাচ্ছ না।”
সুনীত বলতে যাচ্ছিল, ‘কে বলল?’ নিশ্চয় শ্বেত ভাল্লুকই খবরটা দিয়েছে। ওরা এসেছিল কি না, রুবি সে সম্পর্কে কিছু জানে কি?
”কেউ কি খোঁজখবর করেছে?”
”জানি না।”
”আসার কথা আছে?”
”কেন?”
রুবি তাকে বসতে বলেনি। প্যাকেটটা টেবিলে রেখে সুনীত চেয়ার টেনে বসল। রুবি একবার তাকিয়েই সিদ্ধ আলুর মোড়কে পুর ভরার কাজে মন দিল। সুনীত জবাব দিল না।
রুবি থালাটা ঠেলে সরিয়ে রাখল। কাজ শেষ হয়ে গেছে। সুনীত গুনে দেখল সতেরোটি চপ। শ্বেত ভাল্লুক অন্তত গোটা দশেক খাবে।
”কেন?”
”চাকরি ছেড়ে দেব।”
রুবি ভ্রূ কোঁচকাল তারপর হাসল। হাতঘড়ি দেখে আবার ভ্রূ কোঁচকাল।
”ব্যস্ত? কেউ আসবে?”
