অফিসযাত্রীদের ভিড় এইবার শুরু হবে। ট্রামগুলোয় বাসের তুলনায় কম ভিড়। হাসপাতালের স্টপে একটা ট্রাম প্রায় পুরো খালি হয়ে যেতেই সুনীত উঠে পড়ল এবং বসার জায়গাও পেল। সে ঠিক করল ট্রামটার টার্মিনাস পর্যন্ত যাবে।
কন্ডাক্টরকে টাকাটা দেবার সময় সে বলল ”কোথায় যাবে?”
”পার্ক সার্কাস।”
শোনামাত্র ধক করে উঠল তার বুক। রুবির ফ্ল্যাট পার্ক সার্কাসেই। ওর কাছে গেলে কেমন হয়! কিন্তু আজ শনিবার, এখন ও অফিসে বেরিয়ে গেছে। যাক, কোথাও অপেক্ষা করব। আজ ও চারটের মধ্যেই ফিরবে।
নভেম্বরের শেষাশেষি, দুপুরের রোদে জাদু আছে। ক’দিন আগের বৃষ্টি পেয়ে ঘাসগুলো তরতর বেড়েছে, পুষ্ট ও সবুজ হয়েছে। পার্কের রেলিংয়ের ধারে গাছের ছায়াটা পেয়ে সুনীত প্যাকেটের উপর মাথা রেখে চিত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। তিন ঘণ্টায় ছায়াটা সরে গিয়ে তাকে রোদের মধ্যে রেখে গেছে।
ঘুম ভাঙতেই সে মুখ ফিরিয়ে রেলিংয়ের মধ্য দিয়ে, বিরাট ফ্ল্যাট বাড়িটার গেটের দিকে তাকাল। ঘড়ি দেখল এবং সময়ের হিসাব করে আবার চোখ বুজল। রুবির ফিরতে এখনও ঘণ্টা দুয়েক অন্তত বাকি। চারটের মধ্যেই কি ফিরবে? কিংবা না-ও ফিরতে পারে।
কোথায় যেতে পারে? সিনেমা, বাবা-মা’র কাছে, কিংবা ভাল্লুকটার সঙ্গে কোথাও?
কোথাও বলতে তো এই ফ্ল্যাট। দিনের বেলা শ্বেত ভাল্লুক এখানে আসে না, তা ছাড়া ওর আসার দিন ঠিক করাই আছে-বুধ আর শনি। আজ আসবে। ঘড়ি ধরে সাতটায় আসে।
গত রবিবার অপ্রত্যাশিত আচমকা এসে পড়েছিল, তখন সুনীত ছিল ফ্ল্যাটে। পঙ্কজ আচার্য শনিবার সকালের প্লেনে বোম্বাই গেছল, কথা ছিল সোমবার ফিরবে। হঠাৎ রাত সাড়ে ন’টায় কলিংবেল বেজে ওঠে। রুবির ঝি সাধু ছুটে এসে ফিসফিস করে ”সাহেব এসেছে”, বলার সঙ্গে সঙ্গে পঙ্কজ আচার্যের বিরাট দেহটা শোবার ঘরের দরজায় দেখা যায়। সুনীত জামাটা পরে নেওয়ার সময়টুকু পায়নি। তবে রুবির মুখ থেকে স্কচের উষ্ণ রংটুকু বা চোখ থেকে ঔজ্জ্বল্য মুহূর্তে মুছে গিয়ে ফ্যাকাশে হয়ে যায়।
শ্বেত ভাল্লুক দরজায় দাঁড়িয়ে প্রথমেই টেবিলের উপর স্কচের বোতলটার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকে। আলমারিতে যতগুলো বোতল বা রেফ্রিজারেটার বা ফোম রাবারের শয্যা, যাবতীয় আরামদ্রব্যই পঙ্কজ আচার্যের অর্থে কেনা। এরপর ওর চোখ পড়ে দেয়ালে টাঙানো ছবিটার উপর। দেয়াল থেকে ঝোলানো পুরু পর্দার আড়ালে রুবির ছবিটা সর্বদাই ঢাকা থাকে। শ্বেত ভাল্লুকের নির্দেশেই ছবিটা আড়াল করা থাকে কেননা একমাত্র তিনি ছাড়া এই ছবি দর্শনের অধিকার আর কাউকে দিতে তিনি রাজি নন।
পর্দা তখন সরানো ছিল। দ্রুতপায়ে ঘরে ঢুকে উন্মুক্ত ছবিটার উপর পর্দা টেনে দিয়ে ঘুরে দাঁড়ান রুবির দিকে। ধীরে ধীরে ডান হাতটা তুলে আবার ধীরে ধীরে নামালেন, তারপর সুনীতের দিকে এগোলেন।… এর কয়েক ঘণ্টা পরই হাবা মরে।
সুনীত ঝাঁকড়া নরম ঘাসের উপর দিয়ে একপাক গড়িয়ে আবার চিত হয়ে রইল। মুখের উপর রোদ। মোটরের হর্নের শব্দে তাকাল মাথা তুলে। মোটরেও আসতে পারে রুবি, শ্বেত ভাল্লুক বাড়ি যাবার পথে বহুদিন নামিয়ে দিয়ে গেছে। রংটা দেখে নিয়েই সুনীত আবার চোখ বন্ধ করল, এটা মাখন রঙের নয়।
বেশ কিছু লোক এখন পার্কের ঘাসে গড়াচ্ছে। ঝুড়ি মাথায় একটা লোক পার্কে ঢুকল। নিঃসন্দেহে চিনাবাদামওলা, সুনীত হাত নেড়ে ডাকল। দেখতে পেল না ও।
”অ্যাই, অ্যাই বাদাম।”
চেঁচিয়ে উঠেই তার মনে হল, এটা তার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে। চারধারে তাকাল। কেউ ভ্রূক্ষেপও করছে না।
”অ্যাই বাদামওলা।”
সুনীত আরও জোরে, প্রায় চিৎকারই করল এবং হাত তুলল। লোকটা ফিরে তাকিয়ে এগিয়ে এল।
প্রথমে পঞ্চাশ গ্রাম কিনল। পরিমাণ দেখে আরও পঞ্চাশ গ্রাম। বেশ কিছুটা সময় একটা কিছু নিয়ে তাকে কাটাতে হবে।
এখন সে স্বচ্ছন্দ বোধ করছে। বাদামওলাকে ডাকার জন্য এমন জোরে চিৎকার শেষ কবে সে করেছে। বরাবরই মৃদু, ধীর, নম্র স্বরের লোক হিসাবে সে আলাদা এক দূরত্ব পেয়ে এসেছে। দূরত্বটার মধ্যে মেশবার বা সাধারণভাবে কথাবার্তা বলার যত চেষ্টাই সে করেছে, নিজের কাছেই তা কৃত্রিম ঠেকেছে। আবেগ বা অনুভবগুলোকে যদি কান্তির মতো সঙ্গে সঙ্গে কাজের মাধ্যমে প্রকাশ করতে পারত, তাহলে হয়তো সে অনেক সরল জীবনযাপন করত।
খোসা ভেঙে একটি একটি করে বাদামের দানা মুখে দেওয়ার সঙ্গে সুনীত চোখ রেখেছে গেটের দিকে। একটা মোটর স্বচ্ছন্দে ঢুকে যেতে পারে। নোংরা দেওয়াল, চওড়া ছোটো ছোটো ধাপের সিঁড়ি ধরে তিনতলায়। পরপর তিনটি দরজা, শেষেরটি রুবির, বাড়ির পিছন দিকে ওর ফ্ল্যাটটা।
গেটের পাশেই ফোটোগ্রাফারের দোকান। সাইনবোর্ডের অক্ষরগুলো ময়লা। পকেট থেকে চশমাটা বার করে সুনীত চোখে দিল, ‘ইউনির্ভাসাল আর্ট…’ তারপর আর পড়া যাচ্ছে না। দরজার দু’পাশের শো-কেসে ছবি সাজানো। নানান মুখ। বসা এবং দাঁড়ানোর ভঙ্গিগুলো যা হয়ে থাকে। সুনীত দেখতে না পেলেও জানে স্বামী-স্ত্রীর যুগ্ম বা পারিবারিক গ্রুপ ছবিতে কে কেমনভাবে অবস্থান করছে। কৃষ্ণনগরে দাদু, জ্যাঠা, বাবা এবং তাদের পরিবারবর্গকে নিয়ে তেরোজনের একটা ছবি ছিল। বয়স্করা চেয়ারে আড়ষ্ট হয়ে, দুই ঊরুর উপর হাত রেখে, সোজা হয়ে বসে। তাদের পায়ের কাছে বাচ্চচারা, পিছনে দাঁড়িয়ে যুবকরা। সুনীত ছিল মায়ের কোলে, বয়স তখন চার মাস।
