উত্তর নেই।
”তুমি একটা মনস্টার।”
অস্ফুট একটা আর্তনাদ শুনে সুনীত স্থির করল, কাল ভোরের ট্রেনে সে কলকাতায় ফিরে যাবে।
পাঁচ
একদিন মিহিরের স্টুডিয়ো থেকে বেরিয়ে তারা তিনজন হাঁটছিল পার্ক সার্কাসের দিকে আমির আলি অ্যাভিনিউ ধরে। রাত প্রায় ন’টা। ট্র্যাফিক কমে গেছে। পথচারীও যৎসামান্য। মোটরগুলো বেগে ছুটে যাচ্ছে। যেখানে আলোর স্তম্ভ তার পনেরো গজ ব্যাসার্ধ নিয়ে আলোকবৃত্তের বাইরের রাস্তা আবছায়া।
মিহির হঠাৎ দাঁড়িয়ে গিয়ে পিছন ফিরে তাকাল। একটা স্টেটবাস আসছে। সে হতাশায় মাথা নাড়ল। সুনীত এই হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ার কারণ বুঝতে না পেরে রুবির মুখের দিকে তাকাল।
”অ্যাই মিহির, বারণ করেছি না। আর এসব খেলা নয়।”
রুবি এগিয়ে এসে মিহিরের হাত ধরল।
প্রায় ষাট কিলোমিটার বেগে একটা ফিয়াট আসছে। রুবির হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে মিহির ফুটপাথের কিনারে এল।
”মিহির না।”
মোটরটা তখন পনেরো থেকে কুড়ি গজ। মিহির রাস্তা পার হবার জন্য আলোকবৃত্তের দিকে এগোল। মোটরটা এবং সে একই লাইনে।
সুনীত চোখ বন্ধ করে রাস্তায় টায়ার ঘষার কর্কশ শব্দ এবং ড্রাইভারের নোংরা গালাগাল শোনার পর চোখ খুলে দেখল মিহির ট্রামলাইন পেরিয়ে ওধারে নেমেছে ততক্ষণে।
রুবির ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে সুনীত বলেছিল, ”মাথা খারাপ নাকি?”
”ও বলে, ড্রাইভারের রিফ্লেক্স পরীক্ষা করছি। একদিন এইভাবেই ও মারা যাবে।”
ওপার থেকে মিহির হাতছানি দিচ্ছে।
”চলে এসো, চলে এসো এপারে।”
”সুনীত যেয়ো না, খবরদার যেয়ো না। ও এখন বারবার এই খেলা খেলবে যতক্ষণ আমরা ওর সঙ্গে থাকব…ট্যাক্সি, ট্যাক্সি।”
রুবি ট্যাক্সি থামিয়ে ছুটে গিয়ে উঠেছিল, ওর সঙ্গে সুনীতও। ট্যাক্সিটা ছাড়তেই সুনীত মুখ ফিরিয়ে কাচ দিয়ে দেখেছিল, মিহির অভিমানী বাচ্চচাছেলের মতো মুখ করে দাঁড়িয়ে।
”ও কি আত্মহত্যা করতে চায়?”
”জানি না, অন্তত পঞ্চাশবার আমি ওকে এমন কাণ্ড করতে দেখেছি। এইভাবেই ও মরবে।”
রুবির কণ্ঠস্বরে তার মনে হয়েছিল মিহিরকে ও ভালোবাসে। ঈর্ষার ছোট্ট একটা দংশন সে রোধ করতে পারেনি।
ট্রেনের জানলা দিয়ে বিস্তীর্ণ প্রান্তরের উপর দৃষ্টি মেলে, কৃষ্ণনগর থেকে কলকাতার দিকে যাবার সময় সুনীতের মনে পড়ল ঘটনাটা। এমন নিস্তব্ধ শান্ত প্রাকৃতিক পরিবেশ মিহিরকে কেন সে মনের মধ্যে জাগিয়ে তুলল? রুবি সেদিন পালিয়েছিল মিহিরকে সম্ভাব্য মৃত্যুর হাত থেকে সরিয়ে রাখার জন্য। কিন্তু আমার এই পালানোটা নিজের জন্য, তবে মিহিরের স্মৃতি এখন কেন? মিহির মারা গেছে, মোটরের ধাক্কায় নয়। পিন দিয়ে দাঁত খোঁটার অভ্যাস ছিল। মাড়িতে খোঁচা লেগে সেপটিক হয়। শেষ সময়ে ও নিজেই হাসপাতালে যায়। মারা যাবার চার দিন পর রুবি খবর পেয়ে সুনীতকে জানাবার সময় বলেছিল, ”কতদিন ওকে বারণ করেছি, পিন দিয়ে দাঁত খুঁটো না।” ওর দিকে তাকিয়ে থাকার সময় জানতাম না বরাবরের জন্য সেই অভিমানী মুখটার ফোটো তুলে রাখছি। প্রকৃতির মধ্যেও কী অভিমান আছে।
সকালের প্রথম ট্রেন। অন্ধকার থাকতেই সুনীত নিঃশব্দে উঠে পড়ে। জামা-প্যান্ট পরে সিঁড়ি দিয়ে যখন নামছে, তখন বাবার চাপা গলা শুনতে পায়।
”ছবিটা নেবে না?”
”না।”
”গরম পাঞ্জাবিটা পরে যাও।”
”দরকার হবে না।”
”তোমার জুতো আর জামাটা?”
সুনীত ভুলে গেছল। বাবা ও-দুটো হাতে নিয়েই দাঁড়িয়েছিল। হাত থেকে নেবার সময় সুনীত বলেছিল, ”যা বলেছি ভুলে যাও।…আর স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করো।”
”স্বাভাবিক!”
সুনীত চেষ্টা করেও অন্ধকারে মুখটা দেখতে পায়নি। রাগ না অভিমান, কী ছিল সেই মুখে?
ভোরের ট্রেনে এত ভিড় হবে ভাবেনি। যখন সে কামরায় ওঠে তখন খালিই ছিল। একটার পর একটা স্টেশন এসেছে আর যাত্রী বেড়েছে। সুনীত কৌতূহল বোধ করল না কারুর মুখের দিকে তাকাতে, বা হকারদের চিৎকারে কান দিতে। জানলা দিয়ে কখনও তাকিয়ে, কখনও চোখ বন্ধ রেখে সে আড়াই ঘণ্টা পর শিয়ালদায় পৌঁছল।
আবার সেই সমস্যা, কোথায় যাব? এর একটা বিহিত হওয়া দরকার। অন্তত পকেটে যে ক’টা টাকা এখনও আছে তা ফুরিয়ে যাবার আগেই। নিজেকে কপর্দকহীন ভাবতেই সুনীতের বুকের মধ্যে একটি নতুন অনুভূতি কেঁপে উঠল। সেই সঙ্গে আর একটা প্রশ্ন উঁকি দিল-আর কখনও কি স্বাভাবিক মানুষের মতো বাঁচা সম্ভব?
ট্রামলাইনের কাছে গেট দিয়ে বেরোবার সময় সুনীত দু’ধারে তাকিয়ে পুলিশ আছে কি না দেখল এবং হাসল। ভয় ব্যাপারটাই এমন। বাদল নস্কর আর তার মেয়েকে মনে পড়ল ভিড়ের মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে। জীবনে আর বকরিহাটি সে যাবে না। গতদিন বিকেলে যে রেস্টুরেন্টে খেয়েছিল, সেটিতেই ঢুকল। একই জিনিস খেল। ভেবেছিল ছোকরাটি তাকে চিনবে কিন্তু তার ব্যস্ততার মধ্যে চেনাচেনির কোনো লক্ষণ সে পায়নি। সুনীত একমনে খেতে খেতে ভেবে গেছে, এখন কী করবে!
কী করে তারা যাদের কোনো কাজকর্ম নেই। ঘুরে বেড়ায় নয়তো কোথাও আড্ডা দেয়, নয়তো ঘুমোয়। সুনীত ঘোরাঘুরি বা আড্ডা বাতিল করে দিল। বাকি রইল ঘুম। বহুদিন আগে, উমার সঙ্গে সে একটা বাংলা ফিল্ম দেখেছিল। বেকার নায়ক চাকরির খোঁজে হাঁটছে আর হাঁটছে, অফিসে অফিসে ঢুঁ দিচ্ছে আর ম্লান বিষণ্ণ মুখে বেরিয়ে আসছে। অবশেষে কার্জন পার্কে গাছতলায় ক্লান্ত হয়ে বসল এবং ঘুমিয়ে পড়ল।
