আসলে এই বৃদ্ধ লোকটির অস্তিত্বই এই বিশেষ গন্ধটা তৈরি করেছে। সুনীত ভাবল, বোধহয় এর একটা বিশেষ কার্যকারিতা আছে নয়তো মাথার মধ্যে এমন অবশ করা প্রশান্তি ঘনিয়ে আসছে কেন।
কাল সকালে, মেয়েটি আসবে। দেখতে হবে কতটা মিল আছে কমলার সঙ্গে। বোধহয় মিল আছে বলেই বাবা ওকে রেখেছে। কমলার স্মৃতি জাগিয়ে রাখা? কিন্তু মায়ের স্মৃতি…অদিতি মুখুজ্যে তার স্ত্রীর স্মৃতিরক্ষার্থে কী করেছে। একটি পুত্র উৎপাদন এবং পুত্রটি তার পিতাকেই অনুকরণ করেছে।
আমাকেও কি এইরকম বন্দিদশায় পচতে পচতে বন্ধ হতে হবে? এইরকম একটা গন্ধ তৈরি করতে হবে? তবু ভালো, সন্তান নেই। সুনীত পাশ ফিরে দেরাজের আয়নার দিকে তাকিয়ে রইল। ঘরের দরজার ফ্রেমে চৌকো একটা অন্ধকার আয়নায় প্রতিফলিত।
বন্দিত্বের বদলে ফেরার হয়ে থাকা। কোথায় থাকব? সুনীতের দিশাহারা হবার উপক্রম হল। এর বাড়ি তার বাড়ি ক’দিন করা সম্ভব! ওরা একদিন ধরে ফেলবেই। কিংবা হাজার মাইল দূরে কোথাও চলে গিয়ে, নিজের পরিচয় মুছে এমন চাকরি করা যাতে সার্টিফিকেট দেখাতে হবে না।…চায়ের দোকানের চাকরি, স্টেশনের কুলি, ধোপার সহকারী। বাবার থিয়োরি অনুযায়ী বলা যায়, এটাও এক ধরনের শাস্তি নেওয়া। কয়েদিদের তো পাথর ভাঙা, ঘানি ঘোরানোর কাজ করতে হয়।
দরজার ফ্রেমের অন্ধকারটা বিস্রস্ত করে ঢুকলেন অদিতিকুমার।
”ওরা শুয়ে পড়েছে, ডেকে তুলে আর বিরক্ত করলাম না।”
”আমার সিগারেট না হলেও চলে। এজন্য ব্যস্ত হতে হবে না।”
”না, ব্যস্ত ঠিক নয় তবে যার যেমন অভ্যাস তাকে সেইভাবে রাখলে সে খুশি হয়।”
অদিতিকুমার চেয়ারে বসলেন। একদৃষ্টে মেঝের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর বললেন, ”বহু বছর পর তোমায় দেখছি, আমি তো ভেবেছিলাম জীবনে আর দেখতে পাব না। তোমাদের তো সন্তান হয়নি।”
”না।”
”তোমার চেহারা যতটা বদলানো উচিত ছিল, ততটা বদলায়নি।”
”আমি আসায় তুমি খুশি না অখুশি?”
বিব্রত না হয়ে অদিতিকুমার হাসলেন।
”মানুষ আমার কাছে খুব দরকারি জিনিস নয়। তোমার কি অসুবিধা হবে যদি আলোটা নিভিয়ে দিই?”
”না।”
আলো নিভিয়ে উনি আবার চেয়ারেই বসলেন।
”তোমাকে তখন যা বলছিলাম…এক সময় মনে হল যথেষ্ট শাস্তি আমি পাচ্ছি না। বাইরের জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাহ্যিক কতকগুলো অসুবিধা, কষ্টের মধ্যে পড়েছি মাত্র, ভিতরে কিন্তু আমি শান্ত, বিশেষ কোনো কষ্ট নেই। ভাবলাম, তাহলে কি আমার ফাঁসি হয়ে গেল, আমি মরে গেছি, কিন্তু ফাঁসি হওয়ার মতো অপরাধ তো আমার নয়। যে অপরাধের যে শাস্তি সেটাই আমি নেব, তার কম বা বেশি নয়…”
সুনীত ভাবল অট্টহাসির কি এই একটা চমৎকার সুযোগ। বৃদ্ধের মুখে কি ছেলেমানুষের মতো কথা, ‘কম বা বেশি’ উনি নেবেন না! হিসেব জ্ঞানটা টনটনেই ছিল।
”কমলার ভাই বীরু এল দেশ থেকে। ওকেও কিছু টাকা দিতে হয়েছিল, তাই দিয়ে একজোড়া বলদ কেনে। বলল, মেয়েটাকে বাড়ির কাজে লাগাতে চায়, যদি কোথাও আমি ব্যবস্থা করে দিতে পারি। বললাম, আমি পারব না। বলল, আপনার কাছেই রাখুন, বললাম, দরকার নেই। তখনও পর্যন্ত মেয়েটিকে আমি দেখিনি। বীরু নেমে গেল, আমি জানলায়। ওরা রাস্তায় বেরোতেই চোখে পড়ল মেয়েটিকে। আমি চোখ ফেরাতে পারলাম না সে কিশোরীকে দেখে। হুবহু কমলা। দপ করে জ্বলে উঠল শরীর, আমি বহু বহু বছর পর কামনা অনুভব করলাম। এক পা এক পা করে ও বাবার সঙ্গে চলে যাচ্ছে আর আমার শিরাগুলোকে গোছা করে ধরে শরীর থেকে টেনে বার করে নিচ্ছে। ওদের ডাকলাম। আমি যে চেঁচাতে পারি এটা জানতাম না। এরা ফিরে এল।”
অন্ধকার ঘরে নিচু গলায় থেমে থেমে অদিতিকুমার বলে যাচ্ছেন। মন্থর গম্ভীর ধ্বনিপুঞ্জ তাদের দূরত্বকে বিস্তৃত করে ভেসে বেড়াচ্ছে। একঘেঁয়ে বিষণ্ণ কণ্ঠস্বরের এই স্বীকারোক্তি সুনীতকে যেন আবেদন জানাচ্ছে এই বৃদ্ধের প্রতি করুণা দেখাবার জন্য।
”মেয়েটিকে আমি যখনই দেখি তখনই আমার এই বৃদ্ধ শরীর…” অদিতিকুমার গলা আরও নামিয়ে ফিসফিস করে বললেন, ”সুনীত তুমি তো কমলাকে দেখেছ, কল্পনা করো তাকে। মেয়েটির রূপ নেই, লাবণ্য নেই কিন্তু আগুনের চাবুকের মতো শরীর। শুধুই রক্ত মাংস চামড়ায় তৈরি একটা প্রলোভন, যার থেকে রেহাই পাবার জন্য নিজেকে দুমড়ে মুচড়ে ফেলেছি। যতই ওর ভাবভঙ্গি চলাফেরা তাকানো আমাকে খেপিয়ে দেয়, ততই ইচ্ছে করে ওকে শরীর দিয়ে ধ্বংস করে ফেলি। আর আমি নিজেকে তখন নিরস্ত করি। কী কষ্ট যে হয় নিজেকে ধরে রাখতে। এক একদিন পাগল হয়ে যাই প্রায়, নিজেকে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখার কথাও ভাবি।”
”মেয়েটি কিন্তু এসবের কিছুই জানে না। চার বছর ধরে আমি এই চাবুক খাচ্ছি, ভাবতে পারো, চা-র-ব-ছ-র! কিন্তু এটাই চাই, এইজন্যই ওকে রেখেছি। চার বছরে তিলেতিলে চাবুকটা যত তীক্ষ্ন হয়েছে, ততই অসহ্য বোধ করছি আর…এই শাস্তিটা, সুনীত, দাগড়া দাগড়া করে দেয়। ওকে কিছুই বুঝতে দিই না…আমাকে ও ‘দাদু’ বলে।”
”তোমার শরীর এখনও এইসবে সাড়া দেয়?”
”দেয়।”
”বাবা, তুমি কি সুখী?”
সুনীত উত্তর পেল না।
”বিপজ্জনক খেলা এটা। যে-কোনো সময়ই নিজের উপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারো।”
”কিন্তু চার বছর তো হারাইনি!”
”তাতে প্রমাণ হয় না পাঁচ বছরে হারাবে না। তখন কী করবে?”
