দালানের কোণে দেয়াল ঘেঁষে একটা ছোট্ট টেবিল। তার উপর ডেকচিতে গরম ভাত। সুনীত চেয়ারে বসে কয়েক হাতা ভাত তুলে থালায় রাখল। অদিতিকুমার গাওয়া ঘি ঢেলে দিলেন। ভাত থেকে ধোঁয়া উঠে তার মুখটা ভিজিয়ে দিতেই সে প্রচণ্ড খিদে বোধ করল। বিকেলে রেস্টুরেন্টেও সে এমন খিদে অনুভব করেছিল। এক ডেকচি ভাত আর এই ক’টা আলু, তার মনে হল খুবই কম, খিদের তুলনায়।
সুনীত গোগ্রাসে গরম ভাত খেতে শুরু করল।
বাবা দাঁড়িয়ে দেখছেন। একটা আরাম গলা দিয়ে পাকস্থলীতে পৌঁছে সারা শরীরে ছড়িয়ে যাচ্ছে একটু একটু করে। ঝিম লাগছে, ভারী হয়ে আসছে শরীর। মদ খেতে খেতে ঘোর যখন প্রথম আক্রমণ করে, সুনীতের মনে হল, সেই রকম এখন লাগছে। বাস্তবতা ও মস্তিষ্কের মধ্যে যোগাযোগ ঘটাবার ব্যবস্থাটা এবার যেন ভেঙে পড়বে।
”তুমি দাড়ি কামাওনি কেন?”
”ব্রণর মতো কয়েকটা ফুসকুড়ি হয়েছে, প্রায়ই হয়।…রান্নাবান্না কি নিজেই করো?”
”না…একটি মেয়ে করে। ক’দিন হল সে বাড়ি গেছে, কালই আসবে।”
”একটি মেয়ে,” শুনেই সুনীত মুখ তুলে একবার তাকিয়েছিল। নির্বিকার ধৈর্যপরায়ণ অদিতিকুমারের মুখ, মৃদু আলোয় প্রস্তরফলকের মতো লাগছে।
”মেয়েটি কমলার ভাইঝি।”
সুনীত চমকাল না বা আবার মুখ তুলে প্রশ্নবোধক চাহনি দেখাল না। কথাটা বললেন কেন? কমলার নামটা তো না করলেও পারতেন। করেছেন অযথা, ইচ্ছে করেই, কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে। কী প্রতিক্রিয়া হয় ছেলের মধ্যে তাই দেখতে চান?
দেখাব না। সুনীত ভাতে দই মাখতে মাখতে ঠিক করে ফেলল বাবাকে সে জানিয়ে দেবে বয়সের সঙ্গে তারও বোধবুদ্ধি বেড়েছে। চিন্তা ও বিচার ক্ষমতা তার আছে। কমলা নামক ব্যাপারটাকে সে স্বাভাবিক এবং বাস্তবসম্মত হিসাবেই গণ্য করে।
”দোকান-বাজার কি ওই করে?”
”হ্যাঁ। বহুবছর পর আজ বাড়ি থেকে বেরোলাম, প্রায় পনেরো বছর।”
”পনেরো।”
হতভম্বের মতো সুনীত তাকিয়ে রইল তার বাবার মুখের দিকে।
”দু-তিন বছর কমও হতে পারে। সুকুমারবাবু মারা যেতে দেখতে গেছলাম ওর বাড়িতে, তারপর আর বেরোইনি। নীচের ভাড়াটেরাই আছে বছর পাঁচেক।”
”আর এই মেয়েটি?”
”চার বছর…এখন বছর একুশ বয়েস।”
বয়স জানানোর দরকারই ছিল না। নিশ্চয় চাইছেন ছেলের কাছে নিজের আত্মম্ভরিতা জাহির করতে কিংবা তাকে অপমান করতে।
”এত বছর, এভাবে জীবন কাটাবার উদ্দেশ্য?”
”এমনি। দইটা কেমন? ষষ্ঠী ঘোষ মারা গেছে কিন্তু এখনও সেইরকমই দই ওর ছেলে করে।”
”বাপের গুণ পেয়েছে।…কিন্তু এমনি এমনি এইরকম বন্দি জীবনযাপন, মানুষ পারে কী করে!”
”জেলে কয়েদিরা কী করে পারে?”
”তাদের বাধ্য করানো হয়।”
”আমাকে বাধ্য করিয়েছে…আমি নিজেই।…হাত ধোবার জল ছাদে বালতিতে রয়েছে।”
স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই সে হাত ধুয়ে ঘুরে এসে খাটে বসল। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে অদিতিকুমার তার দিকে তাকিয়ে যেন পরের প্রশ্নটির অপেক্ষায়। সুনীত ঠিক করেই ফেলেছে, কৌতূহল দেখাবে না।
”আমি নিজেই ঠিক করি শাস্তি নেব। নেওয়া উচিত, নেওয়া দরকার। খবরের কাগজ পড়া বন্ধ করি, রেডিয়োটা ভাড়াটেদের দিয়ে দিই। মাঝে মাঝে দু-চারজন রোগী আসত, তাদেরও আসা বন্ধ করে দিই, একটা চাকর ছিল দোকানবাজার করে দিত। খাটে শুতাম না। নিজে হাতে কাপড় কাচা, ঘর মোছা, রান্না সবই করতাম, চাকরটা বসে থাকত। পৃথিবীতে কী ঘটছে, এমনকী পাড়াতেও, আমি কিছুই জানি না। বাইরের জগৎ, জীবনের সঙ্গে যেখানে যত রকমের সম্পর্ক ছিল, সব ছিঁড়ে ফেলি একে একে। শুধু একটা-দুটো চিঠি, কয়েদিরা তো চিঠি পেয়ে থাকে, তাই আর বন্ধ করিনি। মাসে একবার ভাড়াটেদের একজন এসে টাকা দিয়ে যায়।”
”কত দেয়?”
”নব্বুই।”
”চলে?”
”হাতে কিছু তো আছে, ক্যাশ সার্টিফিকেট আর জমিজমাগুলো বিক্রি করে দিয়েছি।”
”মা-র গহনা?”
”নেই। ওই ব্যাপারটাতেই বাঁধা দিয়ে তক্ষুনি টাকার জোগাড় করে বাঁচতে হয়েছিল। ওগুলো আর ছাড়ানো যায়নি।”
সুনীত বালিশটা টেনে নিয়ে বিছানায় কাত হয়ে শুল। তার মনে হচ্ছে, কারুর কাছে বিবৃতি দেবার জন্য বাবা যেন এতকাল অপেক্ষায় ছিলেন। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে মানসিক কাঠিন্য ভেঙে পড়েছে। কিন্তু বলার ভঙ্গিতে কুণ্ঠা নেই, এটাই শুধু তাকে অবাক করছে।
”তুমি খাটের ওই দিকটায় লম্বালম্বি হয়ে শুয়ে পড়ো, আমি এদিকটায় শোব।”
”খাটে শোবে! এই যে বললে…”
”আমি এখন খাটেই শুই, আট বছর ধরে শুচ্ছি।”
”যেদিন থেকে মেয়েটিকে রাখলে?”
সুনীত বিদ্রূপটা স্পষ্ট করার জন্য ঠোঁট টিপে হাসির ভান করল। সেটা উপেক্ষা করে অদিতিকুমার দালানের আলো নিভিয়ে ঘরে এসে চেয়ারে বসলেন। সুনীতের চোখের পাতা ভার লাগছে। তার ঘুম পাচ্ছে।
”আমার তখন মনে হয়েছিল যথেষ্ট শাস্তি আমি পাচ্ছি না। বাইরের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করে কষ্ট হচ্ছিল বটে কিন্তু ক্রমশ সেটায় অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। লক্ষ করলাম আর কষ্ট লাগছে না। শরীর সব অসুবিধাই নিয়ে নিচ্ছে। তাই-তোমার বোধহয় এই সময় সিগারেট খাওয়ার অভ্যাস।”
”না, ঠিক আছে।”
”নীচে গিয়ে একটা চেয়ে আনতে পারি।”
”দরকার নেই।”
কথাটা অগ্রাহ্য করে অদিতিকুমার উঠে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। সুনীত বালিশটা জড়িয়ে চোখ বুজল। বাসি সোঁদা গন্ধ উঠছে বালিশটা থেকে। সারা বাড়িটা থেকেই গন্ধ উঠছে। পলেস্তরা-খসা দেয়াল, ভাঙা জানালা, সিমেন্ট-চটা মেঝে, শ্যাওলামাখা ছাদ, পাঁচিলের কিনারে বটের ঝোপ, তার মনে হল না শুধু এগুলোর জন্যই সে গন্ধটা পাচ্ছে।
