-আগে তুমি চাকরি পাও।
কথাটা বলে মাথা নিচু করে নখ খুঁটতে শুরু করল রমা। কোন সাড়াশব্দ নেই। তাই সে মুখ তুলল। হাতের পেন্সিলটা চোখের সামনে তুলে কি কি দেখছে। চোখ দুটো সরু করার জন্য পাতলা ভাঁজ পড়েছে চামড়ায়, যেন বিরক্ত হয়েছে। এখন যদি হাল্কাধরনের কিছু বলা যায় তাহলে ভাঁজ মিলিয়ে যাবে। অথচ ভাঁজগুলো আরো গভীর করে তুলতে ইচ্ছে করে রমার। ভবিষ্যতে যদি ছাড়াছাড়ি হয়, তার জন্য এখন থেকেই তৈরি হওয়া ভাল। আস্তে আস্তে তারা পরস্পরের ওপর বিরক্ত হয়ে দূরে সরে যাবে কেউ কিছু মনে করে রাখবে না।
-মন দিয়ে চাকরির চেষ্টা করো। এতলোক তো পাচ্ছে।
-আজ গেছলুম একজনের কাছে, বললতো করে দেবে।
-কিন্তু দাদা যে বলল, হয়রানি ক’রে শেষকালে দেবে না!
একটা কাক ট্যাঙ্কের ওপর বসেই উড়ে গেল। বিশ্রী ওর ডানার শব্দ, তার থেকেও বিশ্রী বিশ্বর গলার স্বরটা।
-তোমার দাদাতো মস্ত পণ্ডিত! নিজে কিছু করতে পারেনা, বড় বোলচাল মেরে বেড়ায় খালি।
-বোলচাল মারুক আর যাই করুক, তুমি কি করছ?
-আমি কি করছি না করছি, তা শুনে তোমার কি আরো দুটো হাত গজাবে?
-তাই বলে জানলায় দাঁড়িয়ে ফষ্টিনষ্টি করলেও পেট ভরবে না।
-আমার পেট আমি বুঝব তোমায় ভাবতে হবে না।
নিজেকে হাল্কা মনে হচ্ছে রমার। অনেকখানি দায় যেন মাথা থেকে নেমে গেল।
-বেশ ভাবব না। জানলায় হা-পিত্যেশ করে বসে থাক, তাহলেই আকাশ থেকে টুপ করে চাকরি খসে পড়বে।
-তোমার কি ধারণা আমি দিনরাত জানলার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে বসে থাকি? ঘরের মধ্যেই তো সব সময় থাক, বুঝবে কি করে বাইরের হালচাল কেমন।
-ঘরে বসে থাকলে কি কিছু বোঝা যায় না ভেবেছ? নিজেকে দেখছি খুব চালাক ভাব।
আর কথা কাটাকাটি করল না বিশ্ব। রমাও চুপ করে গেল। মুখ তুলে একবার তাকাল আকাশে। ফোঁটা ফোঁটা কতকগুলো চিল। চারতলা বাড়ির ছাদ থেকে চাকর শুকনো কাপড় তুলে নিয়ে গেল। দোতলার জানলা দিয়ে দেখা যাচ্ছে একটা মেয়ে পায়চারি করতে করতে বই পড়ছে। রেডিওর এরিয়ালে মরা কাকের মত একটা ঘুড়ি লটপট করছে। টবের মাটিতে চান করবার জন্য দুটো চড়ুই উড়ে এল। আবার তক্ষুনি উড়ে গেল। কালো পিঁপড়ের সার মুখে ডিম নিয়ে চলেছে জানলার চৌকাট ধরে। সে মুখ নামিয়ে কি যেন ভাবছে তখন থেকে।
-কথা বলছ না কেন, চলে যাব?
মুখে তুলে বিশ্ব হাসল। শুকনো হাসি।
-আমার ধৈর্যের একটা সীমা আছে। আমি কি করব বলতে পার? আমার সঙ্গে পরিচয় না হলেই ভাল হত। যেমন দিন কাটছিল তেমনিই কাটত।
কান্নার মত শোনাচ্ছে বিশ্বর কথাগুলো। রমার ইচ্ছে করছে দুহাতে ওর মুখটা ধরতে। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে। বিশ্বর আঙুলের ওপর সে হাত রাখল।
-কিচ্ছু হবে না। চাকরি হয়তো একটা পাব। কিন্তু আমাদের বিরক্তি কোনদিনই ঘুচবে না।
-কে বললো?
এইটুকু কথা বলতেই গলা আটকে গেল রমার। চোখে চোখ রাখল বিশ্ব।
-কে আবার বলবে? চাকরি পেলে আমাদের বিয়েটা হয়তো হয়ে যাবে, কিন্তু তা হলেই কি সুখী হব?
-এ রকম করে কথা বললে আর কিন্তু আসব না।
-আমরা বড্ডো একঘেয়ে হয়ে যাচ্ছি। এই একঘেয়েমিটা কাটান উচিত।
কথা বলল না রমা। ক্লান্তি তারও এসেছে। এটা কাটিয়ে ওঠা দরকার। নয়তো এই ঘিঞ্জি বাড়িটায় একমুহূর্তও তিষ্ঠোন যাবে না। কিন্তু এ ক্লান্তি কাটবে কেমন করে? কি এমন যাদু জানে বিশ্ব যে একঘেয়েমি কাটিয়ে দিতে পারবে? এই ছোট বাড়িটাকে কি ও বড় করে দিতে পারবে। এ বাড়ির মানুষগুলোর স্বভাব কি ও বদলিয়ে দিতে পারবে? বাইরে থেকে চেষ্টা করে কি বদল করা সম্ভব, যতক্ষণ না ভেতর থেকে বদলাবার তাড়া আসে? এ বাড়িটাই তো ধুঁকছে। এর মানুষগুলো মরতে বসেছে। তাহলে বিশ্ব একঘেয়েমি কাটাবে কেমন করে। স্তোক দিচ্ছে। তার মনে কোন মতলব আছে। সেটা কি হতে পারে!
-কি করে কাটাবে?
-আমাদের সাধ্যে কুলোয়, এমন ভাবে।
রমার গলায় হাত রাখল বিশ্ব। হাতটা গলা বেয়ে আস্তে আস্তে নামাচ্ছিল, সরিয়ে দিল রমা।
-কলে জল এসে গেছে বোধ হয়। আমি যাই, নয়তো কল পাবনা, নিচের বৌদিকে এক ডাঁই কাপড় সেদ্দ করতে দেখেছি।
আর কিছু শোনার জন্য রমা দাঁড়াল না। ট্যাঙ্কের ভাঙা কোণায় আঁচল আটকে গেছল। সাবধানে ছাড়িয়ে নিল। তবু ছিঁড়ল একটুখানি। বিরক্ত হল রমা। পরবার মত কাপড় তো মোটে দু’খানা। সিঁড়িটা অন্ধকার। চড়া আলো থেকে এসেই হোঁচট খেল। জ্বালা করছে, বোধ হয় নখটা চোট খেয়েছে। বিরক্তি তো পদে পদে। শাড়িটা ছিঁড়ল, মন খিঁচড়ে গেল। পায়ে লাগল, মন বিগড়ে গেল। এই মনটাকে বিশ্ব মেরামত করবে কতক্ষণের জন্য? আবার তো কোথা থেকে ঘা পড়বে, অমনি হুড়মুড় করে ভেঙ্গে যাবে। এই ভাঙ্গা আর গড়ে তোলা তো সারাজীবন চালাতে হবে। তাতে কি একঘেয়েমি বাড়ে না? মাধবীর জীবনটা তো একঘেয়ে। কিন্তু তবু সে নিজেকে টিঁকিয়ে রেখেছে এই করেই। তা না হলে, একটানা জীবনটাও তো একঘেয়ে। এই একঘেয়ে বাড়ির মানুষগুলো মরে গেছে কি? বোধ হয় না। ওপরটা কেমন ঝিমোন মনে হয়, কিন্তু তলায় তলায় কি খাটুনিই না খাটছে। এই ভাঙ্গাগড়ার খাটুনি। এতেই মানুষ বেঁচে আছে।
তা হলে চলে এলুম কেন? এক তলায় পৌঁছে রমা ভাবল। আবার ফিরে গেলেই তো হয়। কলের জল তো সত্যি সত্যিই আর আসেনি। এখনকার মত একঘেয়েমিটা কাটত। সেইটেই তো আপাতত বড় কথা। পরের কথা পরে ভাবা যাবে। অনেকগুলো ‘কিছুক্ষণ’ নিয়েই তো গোটা জীবন। জীবনটা মস্ত বড়। একটা ‘কিছুক্ষণে’র পর কি ঘটবে তা কে বলতে পারে। তা’হলে এখন কি করা উচিত?
