এই প্রিয়ব্রতই তাকে একদিন বলে, ”সবাই তোর বাবার নামে যা-তা বলছে। তোদের ওই ঝিয়ের সঙ্গে নাকি তোর বাবার…”
সুনীতের ফ্যাকাশে মুখ দেখে সে থেমে যায়। এক রাত্রে ঘুম ভেঙে যেতে সুনীত দেখেছিল বাবা বিছানায় নেই। কিন্তু ভাবেনি তাই নিয়ে। এখন সে ভাবল এবং প্রিয়ব্রতর চোখ থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে ক্ষীণ স্বরে বলে, ”সব বাজে কথা।”
”তোর বাবা নাকি ওষুধ খাইয়ে পেট খসাতে গিয়ে মেরে ফেলেছে।”
”সব বাজে কথা।”
”পুলিশকে কুড়ি হাজার টাকা ঘুষ দিয়ে ধামাচাপা দিয়েছে নয়তো যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর হত।”
”এসব কে বলেছে তোকে?”
”কে আবার বলবে, সবাই জানে। সবাই বলছে তোর বাবা দুশ্চরিত্র, খুনি।”
সুনীত রাগে থরথর কেঁপেছিল। কারুরই জানার কথা নয়, সে নিজে পর্যন্ত কিছুই জানে না। চিৎকার করে কিছু বলার চেষ্টা করতে গিয়ে দেখে স্বর বেরোল না, চোখের সামনে একটা কালো পর্দা কাঁপছে। পর্দাটার পিছনে দাঁড়িয়ে দু-হাতে ওটাকে ধরে কেউ যেন দোলাতে দোলাতে এগিয়ে আসছে তার দিকে। সুনীত আবার চিৎকার করার চেষ্টা করে।
”কী ব্যাপার, স্বপ্ন দেখছিলে নাকি।”
চোখ খুলে সুনীত দেখল সে খাটের উপর শুয়ে। কখন শুয়ে পড়েছে জানে না, কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল বুঝতে পারেনি। বাবা ঝুঁকে রয়েছেন। মুখে মৃদু হাসি। সুনীত উঠে বসল।
”আলুভাতে-ভাত হয়ে গেছে, একটু দই কিনে আনি!”
”তুমি বাইরে বেরোও।”
অপ্রতিভতার একটা ঝলক দুজনের মুখের উপর দিয়ে পিছলে গেল। দুজনেই চোখ সরিয়ে নিল। কথা না বলে অদিতিকুমার ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। বোকার মতো মুখ ফসকে কেন যে কথাটা বেরোল! সুনীত কপালে তালুর উলটোদিকে ঠেকিয়ে ভাবল, জ্বর আসবে বোধহয়।
পসার, প্রতিপত্তি, মর্যাদাচ্যুত হয়ে, নিজেকে বন্দি করে রাখতে বাধ্য হওয়া লোকটি এখন বৃদ্ধ। বেঁচে থাকলে কমলা এখন পঞ্চাশের কাছাকাছিই হত। ও মরে না গেলে, দুজনে এখন কীভাবে জীবনযাপন করত! বাবা এতগুলো বছর ধরে এই বলে কি আক্ষেপ করেছেন, শারীরিক তাড়না এড়াতে পারলে জীবনে এমন বিপর্যয় নেমে আসত না! উনি কি জানেন, তার ছেলে এখন ঠিক তাঁর মতো অবস্থায় পড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। জানলে কি অট্টহাসিতে ফেটে পড়বেন? বলবেন কি, ”পুত্র আমাকে তুমি রক্ত মাংস মেদ মজ্জায় বহন করছ, আমায় আর ঘৃণা কোরো না। তার থেকে পাপ, আর কিছু হতে পারে না। এইবার আমি মুক্ত।”
জিজ্ঞাসা করতে হবে, এখন তুমি কী ভাবছ, কী করে দিন কাটাও! কখনও কি স্ত্রীর কথা তোমার মনে পড়ে? বলেছিলে আত্মহত্যা করবে যদি আমি জানতে পারি, জেনেছি, কিন্তু করোনি। কেন? জীবন সম্পর্কে কোনো লেকচার নয়, শুধু জানতে চাই আত্মহত্যা করোনি কেন?
কী জবাব দিয়েছিলে যখন সেন্ট পিটার্স স্কুল বোর্ডিঙের ফাঁকা ভিজিটার্স রুমে কথাটা জিজ্ঞাসা করেছিলাম?
”তুমি এখন ছোটো, তুমি বুঝবে না…”
”কী বুঝব না, কেন বুঝব না?”
”আগে তোমার দেহ তৈরি হোক, সম্ভোগের সুখ জানুক, তারপর আমায় জিজ্ঞাসা কোরো। এসব কথা এখন থাক, তুমি আমার সঙ্গে কৃষ্ণনগরে যাবে কি?”
”না।”
”কেন, লজ্জা করছে?”
”কোনোদিনই আমি যাব না, ও-বাড়িতে আর পা দেব না…।”
আরও অনেক কথা সে বলেছিল প্রচণ্ড রাগে। বাবা শুধু শূন্য দৃষ্টিতে মুখের দিকে তাকিয়ে বসেছিলেন। যাবার সময় বলেছিলেন : ”শরীরকে অগ্রাহ্য কোরো না সুনীত, সে কখন যে কী চেয়ে বসবে তা কেউ জানে না, আমিও জানতাম না। এখনও আমার শরীর বাঁচতে চায়, তাই আত্মহত্যা করিনি।”
তাই কি আমি পালিয়ে বেড়াচ্ছি? এই শরীর, উমার কাছ থেকে দীর্ঘকাল যত্ন সেবা সান্ত্বনা ইত্যাদি পেয়েই কি লোভী হয়ে পড়েছে! বাবার ক্ষেত্রেও কি ঠিক এইরকমই ঘটেছিল? সুনীত ভেবে পাচ্ছে না হঠাৎ কেন হাবার বউয়ের শরীরটাকে দখলের ইচ্ছা তার হল। ওর থেকে কিছুটা ভালো… চিন্ময় যাদের কাছে যায়, তেমন মেয়েদের কাছেও তো সে যেতে পারত… এটা কি অনুকরণের ইচ্ছা থেকে? কমলার জায়গায় হাবার বউ… বাবার সমকক্ষ হওয়ার জন্য একটা বাসনা তার মধ্যে সুপ্ত কোনো বোধকে কি জাগিয়ে তুলেছিল যেটার অস্তিত্ব সম্পর্কে সে কোনোদিনই সন্দিহান হয়নি বা যেটা দীর্ঘদিন উমার সঙ্গে সহবাসের জন্য চাড়া দিয়ে ওঠেনি?
কিন্তু এটা কি তার অধিকারের মধ্যে পড়ে না? প্রত্যেকেরই এই অধিকার কি নেই, জীবনে এক-আধবার বিশেষ কিছু করার, এমন কিছু যেটা নিত্যনৈমিত্তিকের বাঁধা গৎ থেকে কিছুটা উপরে তুলে দেবে?
সুনীত তার মায়ের ছবির সামনে দাঁড়াল। কপালের কাছে সিঁদুরের টিপ ছিল, এখন নেই। সে ভাবল,ছবিটা নিয়ে গিয়ে কোনো লাভ আছে কি? বাবার জীবনে এবং তার জীবনেও এই মহিলার কোনো অবদান নেই।
সে টেবিলের কাছে ঝুঁকে দেখল অদিতিকুমার যা লিখছিলেন।
চিঠিই, কেউ বোধহয় টাকা চেয়েছে, তাকে জবাব দিচ্ছেন। ”বীরু, গতমাসে তোমাকে পঞ্চাশ টাকা পাঠাইয়াছিলাম এবং সেইসঙ্গে জানাইয়াছি আগামী দুইমাস কিছু পাঠাইতে পারিব না, কিন্তু…।”
”তুমি কি প্যান্টটা ছেড়ে একটা ধুতি পরবে?”
সুনীত চমকে পিছন ফিরেই চিঠিটাকে হাত দিয়ে প্রায় ঠেলে সরিয়ে দিতে যাচ্ছিল। পরের চিঠি পড়ার অন্যায় কাজটা ধরা পড়ত না যদি কৌতূহলটাকে সে সামলে নিতে পারত। একটার পর একটা অপ্রতিভ ব্যাপার বাবার প্রতি তার মানসিক বিরোধিতাগুলোকে যে ধসিয়ে দিচ্ছে এটা সে এবার বুঝে পারছে। অবশ্য এত বছর পর এখানে আসাই তো তার দুর্বলতাকে বাবার কাছে ধরিয়ে দিয়েছে।
