”নিশ্চয় খিদে পেয়েছে? আমি অবশ্য আটটার মধ্যেই খেয়ে নিই।”
উত্তরের জন্য অপেক্ষা না করেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। সুনীত লক্ষ করছে যা কিছু কথাবার্তার উদ্যোগটা ওনারই, সে শুধু উত্তরদাতা। বহুদিন পর একমাত্র ছেলেকে দেখে কোনো ভাবান্তর বা আচরণে কোনো বিহ্বলতা নেই। আওতার মধ্যে পেয়ে ব্যক্তিত্বের দাপট দেখাচ্ছেন তা-ও নয়। এসবই ওঁর স্বাভাবিক ভঙ্গি। শুধু একবার…সুনীত সেই ঘটনাটা ভেবে একটু স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করল।
মা মারা যাবার পর সে আর বাবা এই খাটেই শুত। এর আগে পাশের ছোটো ঘরটা, যেখানে একটি চৌকি এবং টেবিল ছাড়া কিছু নেই, বাবা সেখানেই শুতেন। তখন রান্না, বাসন মাজা, ঘর মোছা ইত্যাদি সাংসারিক কাজ করত ভোলার মা। বুড়ি নিখুঁতভাবে পেরে উঠত না সব কাজ। একদিন সে নিজেই অবসর নিয়ে পনেরো মাইল দূরে তিতলেপোতায় ছেলের কাছে ফিরে যায় এবং পাঠিয়ে দেয় নাতনি কমলাকে।
সুনীতের ভালো লেগেছিল ওকে। বছর বাইশ বয়স। গ্রামের মেয়েরা যেমন হয়, ভীরু, শান্ত ঠান্ডা স্বভাবের। সুনীত তখন ক্লাস সেভেনের ছাত্র। ভীরু ভাবটা কেটে যাবার পর প্রচুর কথা বলত তার সঙ্গে। বয়সের ব্যবধানটা ঘুচে গেছল কমলার মানসিক অপরিণতি এবং সারাক্ষণ প্রায় একাকী জীবনযাপনের জন্য। দিনরাতের অধিকাংশ সময়ই বাবা থাকতেন একতলায় বা বাড়ির বাইরে। সুনীত এবং কমলা ছাড়া দোতলায় আর কেউ ছিল না। দুজনের মধ্যে ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে।
সুনীত ওকে অক্ষর পরিচয় করাবার দায়িত্ব নিয়েছিল। বর্ণপরিচয় কিনে পড়াতেও শুরু করে। সন্ধ্যায় যখন সে টেবিলে পড়ত কমলা মেঝেয় বসে শ্লেটে দাগা বুলোত। সুনীত জীবনে সেই প্রথম নিজের ব্যক্তিত্ব ঘনিয়ে ওঠার অনুভব পায়। কমলা তার অনুগত বাধ্য ছাত্রী ছিল। দু’মাসের মধ্যে সে প্রথমভাগের মাঝামাঝি পৌঁছে যায়।
একদিন সন্ধ্যায় কমলা টেবিলের ধারে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে সুনীতকে হাতের লেখার খাতা দেখাচ্ছিল। কী একটা বলার জন্য সুনীত মুখ তুলতেই দেরাজের পাল্লায় বসানো আয়নায় দেখতে পায়, ঘরের দরজায় বাবা দাঁড়িয়ে। একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন।
সুনীত সঙ্গে সঙ্গে আড়ষ্ট হয়ে খাতাটা ঠেলে সরিয়ে দেয়। কমলা সচকিতে পিছনে তাকায় এবং খাতাটা তুলে নিয়ে আঁচলে ঢাকে। বাবা ভিতরে ঢুকতেই সে বেরিয়ে যায়।
দেরাজ থেকে একটা চওড়া খাম বার করে নিয়ে ঘর থেকে বেরোতে গিয়ে বাবা থমকে দাঁড়ান।
”কী করছিল ও?”
”আমার কাছে পড়ে।”
”তোমার নিজের পড়া নেই? সময় নষ্ট করো কেন?”
রাত্রে দালানে সুনীত একা যখন খাচ্ছে, কমলা হঠাৎ বলে, ”বাবাকে তুমি ভয় পাও, না?”
সুনীত জবাব দেয়নি।
”আমারও ভয় করত… এখন আর করি না।”
ওর কণ্ঠস্বরে কী একটা যেন ছিল… চপল তাচ্ছিল্য, যেজন্য সুনীত মুখ তুলে তাকিয়ে ছিল। বাবার প্রতি এমন হালকা ভঙ্গি কোথা থেকে সংগ্রহ করল জানার জন্য কমলার চোখের দিকে তাকিয়ে সেদিন কিছুই বুঝতে পারেনি।
এর মাস ছয়েক পরেই কমলা মারা যায়। রাতে ঘুমিয়ে থাকার জন্য সুনীত জানতেই পারেনি পাশের ছোটো ঘরে কমলা রক্তস্রাব করতে করতে মারা যাচ্ছে। সকালে ঘুম থেকে উঠে ঘরের বাইরে যাবার জন্য দরজার কাছে আসতেই সে শুনতে পায় : ”কী ব্যবস্থা করবে?… হাসপাতালে?… বরং পুলিশে আগে…।”
বাবার কণ্ঠস্বরে, উত্তেজনা ছাপিয়েও ফুটে উঠেছিল ত্রাস যা কখনও সে শোনেনি।… ”জানাজানি হবেই, আমি মুখ দেখাতে পারব না… সুনীতও জানবে।” একটা অস্ফুট ক্রোধ হঠাৎ আর্তনাদে পরিণত হয়ে কাতরে উঠল। ”… আমাকে সুইসাইড করতে হবে।”
বাবা দালানে পায়চারি করছিলেন, মুখ ফ্যাকাশে। চোখ বসে গেছে। সেই প্রথম তার চোখে পড়ে, বাবা যেন একটু কুঁজো হয়েছেন। সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়েছিল সুকুমারবাবু, বাবার কম্পাউন্ডার। সুনীতকে দেখেই বাবার চোখে ভয় ফুটে উঠেছিল। অসহায়ভাবে সুকুমারবাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন।
”সুনীত ক’টা দিন নয় আমার বাড়িতেই থাকবে।”
বৃদ্ধ সুকুমারবাবুর স্বর ছিল অনুত্তেজিত। সুনীত কৌতূহলী চোখে তাকায়।
”কমলা অসুস্থ, রোগটা ছোঁয়াচে তাই তোমাকে আমার বাড়িতে নিয়ে যাব।”
ছোটো ঘরের পাশ দিয়ে কলঘরে যাবার সময় সে তাকায়। কমলা মেঝেয় শুয়ে। চোখ বন্ধ। বাবার একটা ধুতি তার দেহের উপর গলা পর্যন্ত বিছানো। কলঘরের একধারে সে দেখে রক্তমাখা কমলার শাড়ি।
সুকুমারবাবুর বাড়িতে তিন দিন থেকে সুনীত ফিরেছিল এবং তিন মাস পরে অ্যানুয়াল পরীক্ষার ফল বেরোতেই তাকে হাওড়ার সেন্ট পিটার্স স্কুলের বোর্ডিংয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু ওই তিন মাসের মধ্যেই সুনীত জানতে পেরে যায় কেন কমলা মারা গেল।
অদিতিকুমার ডিসপেনসারি বন্ধ করে দিয়েছিলেন, বাড়ি থেকেও বেরোতেন না। সদর দরজাটা সারাদিনে কদাচিৎ খোলা থাকত। একতলার যে-ঘরে রোগী দেখতেন সেখানেই ক্যাম্পখাট পেতে রাতে শুতেন আর সেগুন কাঠের ভারী ইজিচেয়ারে সারাদিন হেলান দিয়ে থাকতেন ঘরের জানলা বন্ধ করে।
ছেলের কাছ থেকে নিজেকে আড়াল করে নিয়েছিলেন একতলার ঘরে নিজেকে বন্দি করে, কিন্তু বাইরের জগৎ থেকে ছেলেকে আড়াল করতে পারেননি। জানতেন, পারা সম্ভবও নয়। কানাঘুষোগুলো চুঁইয়ে চুঁইয়ে সুনীতের কানে আসছিল। সে লক্ষ করে, পাড়ার বয়স্ক লোকেরা তাকে দেখলেই তাকায় এবং সঙ্গে সঙ্গে চোখ সরিয়ে নেয়। জানলায় বা বারান্দায় মেয়েদের কথা বন্ধ হয়ে যায় তাকে দেখে এবং মুখ টিপে নিজেদের মধ্যে চোখাচোখি করে। ক্লাসে তার বিশেষ এক বন্ধু ছিল না প্রিয়ব্রত ছাড়া।
