সদর দরজা ভেজানো। ফাঁক দিয়ে ভিতরে আলো দেখা যাচ্ছে। দরজার পাশের জানলায়ও আলো। ঘরের ভিতর রেডিয়োয় সম্ভবত নাটক হচ্ছে, নীচের পাল্লা দুটো বন্ধ থাকায় ভিতরটা সে দেখতে পেল না। এক বুড়ি এবং বাচ্চচা একটা মেয়ে সুনীতের পাশ দিয়ে হেঁটে গেল। সে চেনার চেষ্টা করল বুড়িটাকে এবং চিনতে না পেরে আশ্বস্ত হল।
নিঃশব্দে লোকটি যে কখন দরজা খুলেছে সে টের পায়নি। কী যে বলবে, এই মুহূর্তে ভেবে উঠতে পারল না। বাবাকে চাই? নিজের কানে কথাটা হাস্যকর শোনাবে। এত রাতে নিজের বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে যদি কেউ বলে ”বাবাকে চাই”, তাহলে সেটা মনে রাখার মতো একটা ব্যাপার হবে। তার মানে আর একজন সাক্ষী তৈরি করা।
”ডাক্তারবাবুকে চাই।”
অন্ধকারে মুখ দেখা না গেলেও লোকটির চুপ করে থাকা দেখে সুনীত বুঝতে পারল অবাক হয়েছে। বছর পাঁচেক আগে বাবা লিখেছিলেন, একতলাটা ভাড়া দিয়েছেন। লোকটি হয়তো ভাড়াটেদেরই কেউ।
”ওপরে থাকেন যে বুড়ো ভদ্রলোক? অদিতিবাবু?”
”হ্যাঁ।”
”দাঁড়ান।”
লোকটি ভিতরে চলে গেল অন্তর্পণে দরজা ভেজিয়ে। ফিরে এল মিনিট তিনেক পর।
”আপনার নাম?”
”বলুন কলকাতা থেকে…”
অনুভূতি সুনীতকে নির্দেশ দিল নাম না বলার জন্য।
…”গাবলু এসেছে।”
লোকটি আবার দরজা ভেজিয়ে ফিরে গেল।
গাবলু। সুনীত অবাক হয়ে ভাবল, নামটা কী করে তার মনে পড়ল। শেষবার এই নাম ধরে, বছর সাত-আট আগে বাস থেকে চেঁচিয়ে ডেকেছিল প্রিয়ব্রত। কৃষ্ণনগরে তারা একসঙ্গে স্কুলে পড়েছে।
তাকাতেই, প্রিয়ব্রত বাসের জানলার রডে থুতনি চেপে দ্রুত বলেছিল, ”তোকে খুব দরকার, কোথায় পাব? কোন অফিসে আছিস?”
সুনীত তার অফিসের নামটি বলেছিল, তবে চেঁচিয়ে নয়। বাস স্টপে তখন অনেক লোক এবং তাদের শুনিয়ে চিৎকার করে অফিসের নাম বলতে সে আড়ষ্ট বোধ করেছিল।
”কী নাম…জোরে বল।”
বাসটা তখনই ছেড়ে দেয়। প্রিয়ব্রতর দরকারটা আর জানা হয়নি। পাড়ার অনেকেই এবং বন্ধুরা তাকে ‘গাবলু’ নামে ডাকত, আর এই বাড়িতে একমাত্র মা। বাবা ‘সুনীত’ ডেকে গেছেন বরাবর। তার এগারো বছর বয়সে ক্যানসারে যখন মা মারা যায় তখন বাবা মধ্য-চল্লিশ, কঠিন পেশিতে মোড়া দীর্ঘদেহী পুরুষ। যুবকরা ম্লান হয়ে যেত তার কান্তি ও সমুন্নত ভঙ্গির পাশে।
”আপনার নাম কি সুনীত?”
”হ্যাঁ।”
”ওপরে যান…ডান দিকে সিঁড়ি।”
সদর দরজার পাশের ঘরটা ছিল রোগীদের বসার এবং ডিসপেনসারি। তার পিছনের ঘরটায় বাবা বসতেন, দরজায় পর্দা ঝুলত। সকাল-সন্ধে ভিড় লেগেই থাকত। সিঁড়ির বালবটা আগের মতোই কম পাওয়ারের এবং বিষাদময়, যেজন্য সন্ধ্যার পর থেকেই বাড়িটাকে তার বিষণ্ণ মনে হত।
সিঁড়িটা ঘুরে উঠে দোতলার দালানে পৌঁছেছে। দালানের মাঝখানে বাবা দাঁড়িয়ে। সিলিং থেকে ঝোলানো আলো মাথা এবং ঘাড় বেয়ে ঝরে পড়ছে। সুনীল মুখের কয়েকটা জায়গায় অন্ধকার দেখতে পেল।
”কী ব্যাপার, হঠাৎ এত রাত্রে?”
”এমনি। বহরমপুর গেছলাম অফিসের এক কলিগের বাড়িতে। ফেরার পথে ভাবলাম…।”
কণ্ঠস্বরে একটুও তারতম্য ঘটেনি। গম্ভীর, স্পষ্ট এবং জুয়ারি। মিথ্যা বলতে বুক কাঁপে।
”আমি ভাবলাম কিছু একটা…বউমা ভালো আছে?”
”হ্যাঁ।”
উমাকে উনি এখনও পর্যন্ত দেখেননি।
”ঠান্ডা পড়েছে, গরম জামা গায়ে দাওনি কেন?”
”কোট ছিল। কাল কাদার উপর পিছলে পড়ে এমন অবস্থা হল যে কোটটা কাচার জন্য বহরমপুরেই রেখে এলাম। বন্ধুর শার্ট পরে এসেছি, জুতোটাও কাদায় গেছে।”
”ঘরে বোসো।”
সুনীত বড়ো শোবার ঘরটায় সন্তর্পণে ঢুকল। চটিটা সিঁড়ির শেষ ধাপে খুলে রেখে এসেছে। কেমন যেন তার মনে হচ্ছে নিজের বাড়িতে সে আসেনি; শৈশব, বাল্য, কৈশোর এবং প্রথম যৌবন যেন এখানে সে কাটায়নি। কীসের একটা কুণ্ঠা তাকে চেপে ধরেছে।
দীর্ঘকাল বাবার সঙ্গে সম্পর্ক না রাখার জন্যই কি! বছরে একটা দুটো চিঠি লেখালেখি তো হয়ই। স্বাভাবিক সৌজন্য, কুশল কামনা, টুকিটাকি দু-চারটে খবর ছাড়া বাবার চিঠিতে কোনো কৌতূহল, দুঃখ, হতাশা বা বিরাগ কখনও প্রকাশ পায়নি। কখনও বাড়িতে আসার আমন্ত্রণও জানাননি।
কাঠের দেরাজ খুলে উনি জামা-কাপড়ের স্তূপের মধ্যে বাছাবাছি করছেন। কাঠে হেলান দিয়ে সুনীত দেয়ালে ঝোলানো মায়ের ছবিটার দিকে তাকিয়ে। বহুদিন আগে তার একবার মনে হয়েছিল, ছবিটা সে চাইবে। রক্তের সম্পর্ক আছে এমন কারুর ছবি চোখের সামনে থাকলে একটা ভরসা পাওয়া যাবে, মনে হবে খুঁটি আছে, শিকড় আছে, শ্যাওলার মতো ভাসছি না। কিন্তু বাবার কাছে চাইতে সাহস হয়নি। এখন যদি চাওয়া যায় দেবেন? নাকি বলবেন, ”তেজ দেখিয়ে বলেছিলে এ-বাড়ির কুটোটি পর্যন্ত ছোঁব না, এ-বাড়ির উপর সব দাবি ত্যাগ করলাম, তাহলে কেন…।”
”ওটা চাই?”
সুনীত চমকে উঠল। নস্যি রঙের গরম পাঞ্জাবিটা খাটের উপর রেখে অদিতিকুমার বললেন, ”দ্যাখো তো এটা গায়ে হয় কি না। সিজন চেঞ্জের সময় সাবধানে থাকা উচিত।”
”আমার খুব একটা শীত লাগছে না।”
”না লাগলেও পরা উচিত, চোরা ঠান্ডা ঠিক বোঝা যায় না। তোমার তো সর্দির ধাত।”
মনে রেখেছেন! সুনীত অস্বস্তি ভরে ওধার-এধার তাকাল। ঘরটা মিউজিয়মের মতো সাজিয়ে রাখা। জ্ঞান হওয়া থেকে সে এই ঘরের যে জিনিসটা যেখানে দেখেছে, আজও সেটি সেখানে। ঘরের কোণে রঙিন খদ্দরের ঘেরাটোপে সেলাইয়ের মেশিন, তার পাশে গ্রামোফোন। দেওয়ালে ফ্রেমে বাঁধানো পশমেবোনা ফুলের সাজি, আয়নার সামনে কাঠের ব্র্যাকেটে ধূপদানি এমনকী জলচৌকিতে কাঁসার পানের বাটাটিও। প্রত্যেকটি ধাতু, কাঠ, কাচ ও কাপড় ঝকঝকে পরিচ্ছন্ন। বোঝা যায় নিয়মিত যত্ন নেওয়া হয়। ঘরের আর এক কোণে টেবিলে অর্ধসমাপ্ত চিঠি, ফাউন্টেন পেন, মোটা ফ্রেমের চশমা এবং টেবিল ল্যাম্প। এগুলো আগে ছিল না। টেবিলটা ছিল ডিসপেনসারিতে। চশমাটা সুনীত এই প্রথম দেখল।
