পাশের লোকটির মুখ থেকে দুর্গন্ধ আসছে, সম্ভবত পাইওরিয়ার। সুনীত মুখ ফিরিয়ে দেখার চেষ্টা করতে গিয়েও করল না। চোখের কোণ দিয়ে দেখল, গোলাকার একটা তামাটে মুখ, কপাল থেকে মাথার মাঝ বরাবর চুল ওঠা। সুনীতের চোখে চোখ পড়তেই লোকটি মুখ নামিয়ে নিল।
আর একটা ঘামের বিন্দু নামছে। বিরক্তিটা এবার চাপা রাগ হয়ে সুনীতকে ঝাঁঝাতে শুরু করল। হাঁটুর কাছে একটা শক্ত থলির কোনা চেপে রয়েছে। অবস্থান বদলাবার জন্য পা সরাতে চেষ্টা করল। পিছনের লোকটি কিছু যেন বলল। পাশের লোকের শ্বাসপ্রশ্বাসে কানে গরম হাওয়া লাগছে। অনেকেই কথা বলছে কিন্তু কারুরই ঠোঁট নড়ছে না। সবাই একই ছন্দে দুলছে। কান্তিকে মনে পড়ল তার।… ”মেরে ফেলা উচিত…।”
প্রেসিডেন্সি বা আলিপুর জেল কি এর থেকেও জঘন্য? তিন ঘণ্টা কি আড়াই ঘণ্টা এই চোয়াল, এই ঘায়ের তুলো, এই পাইওরিয়া, এই ভ্যাপসানি, পায়ে থলির খোঁচা সহ্য করার থেকে কি একটি সেলে দশ বছর বাস করা বেশি অসহনীয়? সুনীতের চোখ ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে আসছে। ট্রেনের দুলুনি, চিটচিটে ঘাম, ভিড়ের চাপ এবং গরম, অদ্ভুত একটা ঘোর তৈরি করছে তার মধ্যে। স্টেশনে ট্রেন থামছে এবং ছাড়ছে এইটুকুমাত্র সে বুঝতে পারছে। চারদিক থেকে যে জমাট রক্তমাংসের চাপটা তাকে পিষে আছে, সেটা হালকা হচ্ছে না। তবে সে জানে, ট্রেন যত এগোবে কামরাটা ক্রমশ হাঁফ ছাড়বে।
কিন্তু আপাতত, এই ঘোরটা তার রাগটাকে দমিয়ে রাখছে। রাগ যে কার উপর সে বুঝতে পারছে না। সম্ভবত নিজের উপর। কেন? ট্রেনে ওঠার জন্য… নাকি যে কাজটা করে ফেলে পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে, তার জন্য? যদি বাস-ড্রাইভারটা মরে যায়, তাহলে কান্তি এবং অন্যান্যরা কি ফেরার হবে?
দেশলাই কাঠি দিয়ে হলদে দাঁতের ফাঁক থেকে আবর্জনা খোঁটা বন্ধ রেখে কান্তি দু’হাতে জড়িয়ে বউকে চুমু খাচ্ছে, এমন একটা ছবি সুনীতের মনে ভেসে উঠেই মিলিয়ে গেল। ”….ভাবে সবাই গোরু ভেড়া?… মারুন মারুন।”
সুনীত চোখ খুলল। চোখের পাতা চটচট করছে। পাতলা বাষ্প চোখের সামনে। এখন আর কোনো গন্ধ পাচ্ছে না সে। জামাটা গায়ে আছে কি না বুঝতে পারছে না। চামড়ায় চিটচিটে একটা আবরণ। ইন্দ্রিয়গুলো বোধশক্তি হারিয়েছে। সকলের মাথার উপর দিয়ে সে কিছু একটা দেখার চেষ্টা করল।
হাতগুলো উপর দিকে তোলা। রড থেকে ঝোলানো আংটাগুলোকে আঁকড়ে রয়েছে। অনেকগুলো হাত… ঊর্ধ্বমূলধঃশাখমশ্বত্থং? মূল ঊর্ধ্বদিকে শাখা অধোদিকে কিন্তু বকরিহাটির ভূগোলের মাস্টারের মতে এটা অশ্বত্থগাছ নয়, বাওবাব। এই গাছ নাকি ঢাকুরিয়া লেকের উত্তর-পশ্চিম কোণে আছে, অথচ কেউ জানে না।
ভদ্রলোক ঘণ্টাখানেক বকবক করছিলেন। সুনীত চোখ বন্ধ করে মনে করতে চেষ্টা করল : ”ভুল বলেছেন কৃষ্ণ।” মাস্টার বুঝিয়েছিল, ”উনি এমন এক গাছের কথা বলেছেন যা পথেঘাটেই দেখা যায়। অশ্বত্থ কি অব্যয়? শ’খানেক বছর তো মাত্র বাঁচে, বাওবাব বাঁচে দু-তিন হাজার বছর। তা ছাড়া কৃষ্ণ কেনই যা বললেন, না রূপমস্যেহ তথোপলভ্যতে… এই গাছের স্থিতি, রূপ, আদি অন্ত মধ্য কিছুই বোঝা যায় না। অশ্বত্থের কি কিছুই বোঝা যায় না? গোলমালটা কোথায় জানেন, কেউ আর মিলিয়ে দেখেনি কৃষ্ণ যা বলেছেন সেরকম গাছ এদেশে আছে কি না। তা ছাড়া বাওবাব তো ভারতে দু-পাঁচটার বেশি নেই যে চট করে মিলিয়ে নেওয়া যায়। বুঝলেন এই বাওবাবই হচ্ছে কল্পতরু যা সাগরমন্থনে উঠেছিল, ইলোরা গুহায় নাকি পাথরে খোদাই কল্পতরুর চেহারা আছে, সত্যি? আপনি জানেন?”…সুনীত মাথা নেড়েছিল। সে কিছুই জানে না। কিন্তু সে বাল্যকাল থেকে জানে কল্পতরুর কাছে যা চাওয়া যায় তাই নাকি পাওয়া যায়।
সুনীত আবার চোখ খুলল। পাতাঝরা গাঁটওলা শুকনো ডালের মতো কনুই, শিরা, হাড় আঙুল নিয়ে এক একটা হাত উঁচু হয়ে রয়েছে। শূন্যে ছড়ানো শিকড়! কৃষ্ণও জানে না, ভূগোলের মাস্টারও জানে না কল্পবৃক্ষের স্বরূপ।
”জীবন্ত বোধ করার জিনিসগুলো এখুনি আমার শরীরে ফিরিয়ে দাও,” বাষ্পাচ্ছন্ন দৃষ্টি নিয়ে সে হাতগুলির দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল, ”শুধু এইটুকুই…বাওবাব।”
চার
কালো কাঠের বোর্ডে বাংলায় সাদা অক্ষরে লেখা ছিল নামটা : ডা. অদিতিকুমার মুখার্জি (হোমিও)।
রাস্তার ইলেকট্রিক আলো যথেষ্ট দূরে এবং দেয়ালটা শ্যাওলায় কালো হয়ে আছে। সুনীত দরজার একবিঘত কাছে মুখটা এনে তন্ন তন্ন খুঁজল। তারপর হাত বুলিয়ে দেয়ালে পোঁতা দুটো হুকের মাথা পেল। বোর্ডটা আর নেই।
সে উপরে তাকাল। বড়ো ঘরটা অন্ধকার। তার পাশে ছোট্ট ছাদটাও অন্ধকার। রাস্তা থেকে এর বেশি দোতলার কিছু দেখা যায় না। বাবা কি বাড়িতে নেই? এই সময় কোথায় যেতে পারেন, কোনো মন্দিরে বা কোনো আড্ডায়? কখনও সে বাবাকে ধর্মপ্রাণ হতে দেখেনি, আড্ডা একটা ছিল বটে সত্যসখাবাবুদের বাড়িতে, কিন্তু সে শুনেছে, লোকজনের সঙ্গে বাবা আর মেলামেশা করেন না। তাহলে কি ঘুমিয়ে পড়লেন?
সুনীত ঘড়ি দেখার চেষ্টা করল। সামান্য আলোয় কালো ডায়ালে সে কাঁটার অবস্থান বুঝতে পারল না। রিকশা থেকে নামার সময় একটা ওষুধের দোকানের দেয়ালঘড়িতে দেখেছিল আটটা-পঞ্চান্ন। দু’ঘণ্টার কিছু বেশি সময় ট্রেনে ছিল। রিকশা নিয়ে গলিতে ঢুকতে চায়নি। অনেকেই আছে যারা এত বছর পরও হয়তো তাকে চিনে ফেলতে পারে। কৌতূহলী দৃষ্টি সে এড়াতে চায়। তা ছাড়া এখানকার থানায়ও নিশ্চয় খবর এসেছে, রিকশাওয়ালাটা ইনফর্মার কি না কে জানে। এই বাড়িতে নতুন কোনো লোক এলেই হয়তো থানায় খবর দেওয়ার নির্দেশ আছে।
