”একটা নয়, সব ক’টা বাসের ড্রাইভারকে ধরে ধরে পেটানো উচিত।”
মাঝবয়সি একজন ধীরগম্ভীর স্বরে সুনীতের পাশেই বলল।
”যত বাস এখান দিয়ে যাচ্ছে থামিয়ে, এক একটাকে টেনে…”
কে একজন ফিসফিস করল : ”পুলিশের গাড়ি।”
সুনীত চমকে তাকিয়ে দেখল একটা কালো ভ্যান।
মাথা নিচু করে হনহনিয়ে সে জগদীশ বোস রোড ধরে হাঁটতে শুরু করল। এবার বাস ধর্মঘট শুরু হবে হয়তো।
এখন কোথায় যাব!
মৌলালির মোড়ে দাঁড়িয়ে সে ইতস্তত তাকাল। কোথায় যেতে পারি? রাশি রাশি সময় এখন হাতে। কিন্তু একটা আশ্রয় চাই। নিজের পরিচয় মুছে দিয়ে… ধ্বংস করে এবার বাঁচতে হবে, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত পরিচয়হীন কাটাতে হবে। কতগুলো বছর! আরও পঁচিশ, তিরিশ। বংশে দীর্ঘজীবীদের সংখ্যা কম নয়। ঠাকুর্দা বিরাশি পর্যন্ত বেঁচেছিলেন। এলাহাবাদে মেজোজ্যাঠা এখনও বেঁচে, আশি চলছে বোধহয়। বাবা কৃষ্ণনগরে সত্তর-বাহাত্তর।
সুনীত আকাশে তাকাল। বৃষ্টি হবার সম্ভবনা নেই। বাতাসটা বন্ধ হয়ে গেছে। কনকনানি ব্যাপারটাও বন্ধ বরং গুমোটে একটা অস্বস্তি সে বোধ করল। হয়তো আঁটো জামাটার জন্যই। আবছা মেঘের আড়ালে অস্পষ্ট নীল দেখা যাচ্ছে কি? চশমাটা বার করে সে পরল। একচোখ বন্ধ করে অন্য চোখে কাচের মধ্য দিয়ে তাকাল। কাচের সঙ্গে চোখটাকে মানিয়ে নিতে এখন অসুবিধা হচ্ছে। চশমাটা সে পকেটে রেখেছিল। কয়েকদিনেই চোখজোড়া অভ্যস্ত হয়ে গেছে চশমা ছাড়াই পরিবেশকে দেখার পক্ষে। হালকা ধূসর একটা আলো মেঘ থেকে চুঁইয়ে স্যাঁতস্যাঁতে আবহাওয়া তৈরি করেছে।
এখন তাকে ঘিরে ত্রিশ লক্ষেরও বেশি মানুষ, দোকান, অফিস, সিনেমা, থিয়েটার, বাজার; তার অফিসের সহকর্মীরা, কলেজের সহ-পড়ুয়ারা, বিস্মৃত কবিবন্ধুরা, ওরা সবাই তারই মতো এই মুহূর্তে কোনো-না-কোনো সমস্যায় পীড়িত, অন্তত ওদের কোনো একজন হয়তো তারই মতো ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থার মধ্য দিয়ে এখন সময় কাটাচ্ছে। এই মুহূর্তে কোথাও হয়তো কেউ ওত পেতে রয়েছে, অনেকেই হয়তো খুঁজে বেড়াচ্ছে, এই অবিশ্রান্ত উদ্দেশ্যপূর্ণ চলমানতার মধ্য থেকে তাকে সরিয়ে একটা বন্দিশালার মধ্যে আটকে রাখার জন্য। সারা পৃথিবীটাই পড়ে রয়েছে আর এখানে প্রায় উনচল্লিশ বছরের একটা লোক দাঁড়িয়ে, যার হাতে অফুরন্ত সময় এবং যার কোনো যাবার জায়গা নেই।
সুনীত স্থির করল যে কৃষ্ণনগর যাবে, বহু বছর বাবাকে দেখেনি।
গত দশ বছরে সে এমন চাপা ঠাসা দমবন্ধ করা পরিবেশের মধ্যে পড়েনি। তার ধারণা ছিল না অফিস ছুটির পর ট্রেনগুলির কী অবস্থা হয়।
কয়েক হাজার উত্তেজিত, উদ্বিগ্ন ও শ্রান্ত মানুষের সঙ্গে তিন ঘণ্টা প্ল্যাটফর্মে অপেক্ষা করার পর সে ট্রেনে ওঠে। অ্যামপ্লিফায়ারের নির্দেশ শুনে দু’বার তারা ছুটে গেল অন্য প্ল্যাটফর্মে। কোনো স্টেশনের জনতা নাকি ট্রেনের সামনে বসে আছে, সময় ধরে ট্রেন চলাচলের দাবিতে। তাই শুনে সুনীতের পাশে দাঁড়ানো দীর্ঘ ঝুলফি, ঝোলানো গোঁফ এবং নিখুঁত গ্রন্থিতে টাই পরা সুশ্রী তরুণটি যার হাতের ভারী ব্যাগটা দেখে মনে হয় ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধি, তিক্তস্বরে বলেছিল, ”তিনদিন আগেও এই অবস্থা হয়েছিল… চালের চোরাচালানিদের সঙ্গে পুলিশের ক্ল্যাশ, গুলিও চলে।”
”আমিও একবার রাত দু’টায় বাড়ি পৌঁছেছিলাম।” মুখ ঘুরিয়ে স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়েই বলল সুনীতের সামনে দাঁড়ানো স্ত্রীলোকটি। অবিবাহিত, যৌবনের রেশ মুখে লেগে আছে, পিঠটা একটু কুঁজো। হয়তো রাইটার্সে চাকরি করে।
সুনীত শিউরে উঠল, এভাবে যদি তাকে রোজ অফিসে যাতায়াত করতে হত। বহুদিন সে আধমাইল হেঁটে টার্মিনাসে গিয়ে বাসে উঠে অপেক্ষা করেছে। এজন্য তাকে বেরোতেও হয় আধ ঘণ্টা বা তারও আগে যখন উমা স্নানে ব্যস্ত থাকে। ভিড়ে উমা অসুবিধা বোধ করে না। শুধু মানসিকতারই নয়, শরীরের সহনশীলতার ধরনটাও তাদের আলাদা। ঘাম, দুর্গন্ধ, ময়লা কাপড়, চাপাচাপি, অপরিচ্ছন্ন শরীর প্রভৃতিতে উমা বাল্য থেকেই অভ্যস্ত। বিয়ের আগে সুনীত কুমারটুলিতে ওদের কাকা-জ্যাঠার যৌথ পরিবারে একখানি ঘরের সংসারে তিন-চারবার গেছল।
ধাক্কাধাকি, ঝগড়া, গালাগালি, হাতাহাতি এবং নির্বিকারতা ভেদ করে সুনীত কামরাটায় উঠতে পেরেছে। ট্রেনের দুলুনির সঙ্গে কামরার মানুষগুলোর মতো সে-ও দুলছে আর ঘামছে। নভেম্বরকে আর অনুভব করা যাচ্ছে না।
একটা জলবিন্দু সুনীতের রগ থেকে চোখের কোণে চুঁয়ে চিবুকের দিকে নামছে। অসহ্য একটা শিরশিরনিতে মুখটা কুঁকড়ে উঠল। প্যাকেট দুটো একহাতে, অন্য হাত ধরে রডে ঝোলানো আংটা। বাহুর জামায় সে মুখ ঘষল। কয়েক সেকেন্ড পরই আর একটা বিন্দু রগ থেকে নামতে শুরু করল।
সামনে, পিছনে, দু’পাশ থেকে মানুষের চাপ, শক্ত হয়ে দাঁড়াবার জন্য মধ্যিখানের সবাই হাত তুলে রডটা ধরে আছে। পাশে যারা কামরার দেয়াল বা সিটের পিঠ ধরেছে। অনেকে কিছুই পায়নি হাত দিয়ে ধরার মতো। শ্বাসপ্রশ্বাস, ঘাম ও নোংরা কাপড়ের গন্ধে সুনীত বার দুই দীর্ঘক্ষণ নিশ্বাস বন্ধ করে হাঁফিয়ে পড়ল।
ঘামের বিন্দুটা চিবুকের কাছে আসতেই সে আবার বাহুতে মুখ ঘষল। সামনের লোকটির মুখ দেখার চেষ্টা করল। মুখটা ফেরানো। মাংসহীন গাল, তীক্ষ্ন চোয়ালের হাড়। মাঝে মাঝে ঢোক গিলছে, নলিটা ফুলে উঠছে। কনুইয়ে সাঁটা ময়লা তুলোর কিনারে শুকিয়ে আসা ঘা।
