যদি সেটা পুরনো, বেশ কয়েক বছরের পুরনো চেহারার ফোটো হয়?
তাহলে চিনে নেওয়া শক্ত হবে।
ও কি জানে পরনে কী কী আছে?
নিশ্চয় জানে, সে-সব খোঁজ ওরা অবশ্যই নিয়ে রাখে। জামা প্যান্ট জুতো ঘড়ি চশমা…।
কিন্তু পলাতক তো ওর ইউনিফর্ম দূর থেকে দেখলেই সটকে পড়বে। এসব কাজ তো সাদা পোশাকের গোয়েন্দারাই করে।
তা করে। হয়তো এই বিস্কুটওলাটাই।
সুনীত স্থির করল এখুনি জামাটা বদলাতে হবে। চশমাটা পরা চলবে না, জুতোর বদলে চটি, ঘড়িটা পকেটে রাখা দরকার। প্যান্টটাও চিনিয়ে দিতে পারে। কিন্তু যত টাকা কাছে রয়েছে তাই দিয়ে কি এত বদল সম্ভব?
দক্ষিণে কয়েক পা হাঁটলেই ফুটপাথে সার দেওয়া দোকান। সুনীত চোখ ফেলতেই দোকানি হা-হা করে উঠল।
”কী চাই দাদা, প্যান্ট বুশ-শার্ট? এদিকে আসুন দেখে পছন্দ করুন।”
খুব তাড়াতাড়ি কাজ সারতে হবে। দরাদরি নয়, বাড়তি কথা নয়।
”শার্ট আছে?”
”আছে, টেরিকট, আপনার?”
”হ্যাঁ, কত পড়বে?”
”আগে দেখুন না, পছন্দ করুন, দামের কথা পরে।”
”দামটা আগে জেনে নিই।”
”চল্লিশ, সত্তর, তিরিশ…।”
”ওর কমে, টাকা তিরিশের মধ্যে, সুতির?”
”হবে।”
হলুদ জমিতে কালো ডোরা তার মাঝে লাল ফুটি ফুটি শার্টটা পছন্দ করল সুনীত। একটু ছেলেমানুষি ভাব থাকা দরকার। ওরা যা-সব শুনে তার রুচি সম্পর্কে ধারণা তৈরি করবে, শার্টটা তাই থেকে কিছুটা আড়াল হয়তো করবে।
তিরিশ টাকা দাম। কাগজে মুড়ে দিতে যাচ্ছিল সুনীত ইতস্তত করে বলল, ”পরে দেখি ফিট করল কি না।”
বুশ-শার্টটা খুলে জামাটা পরল। একটু আঁটো লাগছে। কাচলে আরও ছোটো হবে নিশ্চয়, কাচার দরকার কী?
”পরাই থাক বরং এই জামাটা মুড়ে দিন।”
এইবার একটা চটি। ফুটপাথে তক্তার উপর দু-তিনটি দোকান। দূর থেকে দেখে সে ঠিক করল জামা কেনার মতো প্রথম দোকানটা থেকেই চটি কিনবে। দোকান ঘুরে ঘুরে নিজেকে চিনিয়ে রাখাটা বোকামি হবে।
কুড়ি টাকা চটি পায়ে দিয়ে দুটি কাগজের মোড়ক হাতে সুনীত বউবাজারের মোড়ে এক ঘিঞ্জি অপরিচ্ছন্ন চায়ের দোকানে ঢুকল। কেউই তাকাল না বা তার উপস্থিতি লক্ষ করল না। আশ্বস্ত বোধ করার সঙ্গে সঙ্গে সে প্রবল ক্ষুধায় আক্রান্ত হল।
চা, টোস্ট, অমলেট দ্বারা আধঘণ্টা সময় অতিক্রম করে আবার যখন সে রাস্তায় নামল তখন স্রোতের মতো ঘরমুখো মানুষ স্টেশনে চলেছে। এর মধ্যে একজনও কি চেনা লোক তাকে দেখতে পাবে না!
গজ পঞ্চাশ দূরে ব্রেক কষার কর্কশ শব্দে সুনীত তাকাল। কিছু লোকের মতো সে-ও চমকে উঠে এবং কৌতূহলী হয়ে এগিয়ে গেল। নীল শাড়ির কিছুটা সে দেখতে পাচ্ছে বাসটার ওপাশে রাস্তায় লুটিয়ে। ঊরু পর্যন্ত অনাবৃত। মনে হল কিশোরী। দেহের উপর চাকা ওঠেনি, হয়তো বেঁচে যাবে। ভিড়ের একটা চাক বাসটাকে ঘিরে ফেলেছে। কিন্তু ওই লোকটা! গুণেন ভবনের ‘বি’ ব্লকে, সুনীতের ফ্ল্যাটের উলটোদিকেই থাকে, কান্তি নামের লোকটিকে দেখে সে আর এগোল না। বছর পঁয়তাল্লিশ বয়স, বেঁটে, রুগণ, বউবাজারে আয়নার দোকান আছে কান্তির। সাদা শার্ট আর ধুতি পরে কিন্তু সুনীত কখনোই সেগুলো পরিচ্ছন্ন অবস্থায় দেখেনি। দাঁতগুলো হলুদ, দেশলাই কাঠি দিয়ে সর্বদাই খোঁটে। ওর থেকে অন্তত পঁচিশ বছরের ছোটো দ্বিতীয় পক্ষের বউ। বহুবার কান্তিকে সে দেখেছে কটমটিয়ে সুনীতের উপরের ফ্ল্যাটের দিকে তাকাতে। ওখানে এক যুবক আছে। খাবার টেবিলে বসে সুনীত বহুদিন লক্ষ করেছে, শান্ত নিরীহ বউটি সর্বদাই কিছু-না-কিছু গেরস্থালির কাজ করে যাচ্ছে।
উমা প্রশংসা করে বলেছিল, ”ছেলেমেয়ে তিনটে যে ওর নিজের পেটের নয়, বোঝায় যায় না। কী যত্নটাই না করে। আদর্শ মা।”
এবং আদর্শ বউ, মনে মনে সুনীত তখন বলেছিল। বলদের মতো সারাদিন মুখ বুজে কাজ করে, যা দেবে খাবে, যা দেবে পরবে। এইসব বলদ এদেশেই পাওয়া যায় এবং কান্তিদেরও।
কয়েকটা লোক বাসের ড্রাইভারকে হিঁচড়ে টেনে নামাচ্ছে, তার মধ্যে কান্তিও। ড্রাইভার দরজা আঁকড়ে ধরে ঝুলছে। কান্তি চিৎকার করছে, কানের নীচে মোটা দড়ির মতো পেশি, চিৎকারের দমকের সঙ্গে সেটা ফুলে ফুটে উঠছে। ঘুসি পাকানো সরু পুরোবাহুর শিরাগুলো বা দুই কণ্ঠার মাঝের গর্তটার থেকেও সুনীতের কাছে আকর্ষণীয় মনে হল চোখ দুটো। যে-কোনো মুহূর্তে গর্ত থেকে চোখ দুটো ঠিকরে বেরিয়ে আসতে পারে। সাদা ফেনা ঠোঁটের কোণে। ও যেন কিছু একটা বার করে দিতে চায়, যেটা দীর্ঘকাল ধরে মনে জমে আছে। কান্তি স্বাভাবিক হতে চাইছে।
”শালাকে মেরে ফেলুন…গাড়ি চালায় এমনভাবে যেন মনেই করে না রাস্তায় মানুষ আছে, ভাবে সবাই গোরু ভেড়া। মারুন, মারুন মেরেই ফেলুন। গোরু ভেড়া…।”
কান্তি কাউকে উদ্দেশ করে বলছে না। সুনীতের সঙ্গে চোখাচোখি হল। সাদা ম্যাপে আঁকা নদীর মতো লাল শিরা কান্তির চোখে।
”মেরে ফেলা উচিত এদের, শিক্ষা পাওয়া উচিত। তাহলে অন্য ড্রাইভাররাও…।”
তাকে চিনতে পারেনি।
সুনীত পিছিয়ে এল। এখন এমন এক মানসিক অবস্থায়, চেনা লোককেও কান্তি চিনতে পারবে না। লোকটা খেপে গেছে। হয়তো এইরকম খেপে উঠেই হাবাকে… কিন্তু সুনীত মুখার্জি আর এই লোকটার মধ্যে কি একই বোধ, একই অনুভূতি, একই প্রবৃত্তি কাজ করছে? দুজনে কি একই স্তরে? সুনীত অস্বস্তিতে পড়ল।
