চাষি-বউটির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার চোখের উপর ঝলসে উঠল ঘটনাটা!
হাবাকে পিঠ থেকে ঝেড়ে ফেলে, কিছু না ভেবেই সে পালাবার জন্য অন্ধকার মাঠের দিকে ছুটে গেছল এবং দশ-বারো গজ গিয়েই পিছলে পড়ে যায়। তখন তার মাথার মধ্যে বিকট একটা লজ্জা পাগলাঘণ্টি বাজিয়ে যাচ্ছিল, ”ধরা পড়েছ… এবার বাঁচার চেষ্টা করো।”
বাঁশের খোঁটাটা সেই সময় তার মাথা ঘেঁষে মাটিতে আঘাত করে। অন্ধকারে হাবা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে, না হলে খুলিটা কয়েক টুকরো হত। তখন সে আত্মরক্ষার তাগিদে লাথি ছোড়ে, সেটা হাবার হাঁটুতে লাগে, ও পড়ে যায়। লাফিয়ে উঠে সুনীত ওর হাত থেকে খোঁটাটা যখন কেড়ে নিচ্ছিল তখন হাবা, গর্জনের চাপা ভারী একটা শব্দ করে।
তাই শুনে সুনীতের স্নায়ুগুলো কুঁকড়ে স্প্রিংয়ের মতো তার ভয়কে টেনে রাখে। অপ্রত্যাশিত অপ্রতিভতায় সে ছেয়ে যায়। শব্দটার মধ্যে বীরত্বের একপ্রকার ধরন ছিল, যা সে আশা করেনি এই অকিঞ্চিৎকর লোকটির কাছ থেকে, যা সে নিজেও প্রকাশ করতে পারেনি ট্যাক্সিওয়ালার সাগরেদের কাছে চড় খেয়ে বা তারও কয়েক ঘণ্টা আগে সাদা ভাল্লুকের থাবার আঘাতে ছিটকে পড়ে।
এইখানেই তার ঘাটতি, তার কাপুরুষত্ব। পুলুকে ঘিরে ধরে ক্ষুর দিয়ে যখন ওর নালিটা কেটে দেয় তখন সে জানলার একটা পাল্লা বন্ধ করে তার আড়ালে দাঁড়িয়ে, হাবার বউ তখন উবু হয়ে বসে গোবর চটকাচ্ছিল ঘুঁটে দেবার জন্য। সুনীত সেইদিকেই তাকিয়েছিল। কিন্তু ঘটনাটা সে আগাগোড়া এবং স্পষ্ট দেখেছিল। জানলার অপর পাল্লা বন্ধ করে, বিছানায় এসে খবরের কাগজটা তুলে নেয়। শুনেছিল হাবা একটা খোঁটা নিয়ে পুলুকে বাঁচাতে বা আততায়ীদের আক্রমণ করতে ছুটে গেছল।
মাটি থেকে হাবার উঠে দাঁড়ানোর প্রয়াস দেখতে দেখতে তার গোটানো স্নায়ুর স্প্রিং তাকে কাঁপিয়ে দিয়ে ছাড়া পায়। হাবা চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। উপহাস করতে? বীরত্বের জন্য? তার মেয়েমানুষকে দখল করার বিরুদ্ধে?
মাথার মধ্যে দপ করে আগুন জ্বলে উঠেছিল। তারপর সে জানে না কী করেছিল। গত পাঁচ দিনে অন্তত চল্লিশবার সুনীত মনে করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে।
সম্ভবত আধ মিনিট সে অন্ধকারের গর্ভে ডুবে ছিল। তারপর চশমাটা কুড়িয়ে নেয় অভ্যাসবশেই। পিছনে পায়ের শব্দের মতো কিছু একটা শুনে সে দ্রুত এগিয়ে চায়ের দোকান ঘেঁষে দাঁড়ায়। দোকানের মধ্যে থেকে তখন একজন চেঁচিয়ে উঠেছিল-”কে, কে ওখানে?”
শেয়ালদা সাউথ স্টেশন থেকে বেরিয়ে সুনীত পথে দাঁড়াল। এখন তার মনে হচ্ছে, অত্যন্ত গরিব, সরল বোকা অকালবৃদ্ধ লোকটার পৃথিবীতে একমাত্র সম্পত্তি ছিল ওর বউ। ওর পৌরুষে, অধিকারে বা ব্যক্তিত্বে হয়তো এগুলো ছিল এবং সুনীত সেগুলোকে আঘাত দিয়ে ওকে আহত করে। রাস্তায় বসে চিনেবাদাম বিক্রি করে রোগগ্রস্ত ফুসফুস সম্বল করা অতি তুচ্ছ জীবনকে সে হয়তো এই একবারই উচ্চচতা দেবার চেষ্টা করেছিল।
সুনীত বিমর্ষ বোধ করতে লাগল। নানাবিধ যানবাহনের শব্দ, ব্যস্ত চলাফেরা এবং ম্লান বিকেলের কিনারে দাঁড়িয়ে সে হাবাকে স্মরণ করল। হাঁটু পর্যন্ত তোলা ময়লা লুঙ্গি, জিরজিরে বুক, রুক্ষ চুল হাত নেড়ে জানোয়ারের মতো শব্দ করে ভাবপ্রকাশ, এ-ছাড়া আর কিছু তার মনে পড়ছে না। ওর থাকা-না-থাকায় কারুরই কিছু এসে যায় না। ওর বউয়ের এজন্য কোনো অভাববোধ হবে না। এটা নিছকই অনুমান কেননা জীবনধারণের ব্যাপারে বউটি স্বাবলম্বী।
তবু হাবার একটা প্রাণ ছিল এবং সেটি হরণ করে সে এখন খুনি। এই মুহূর্তে যত লোককে সে দেখতে পাচ্ছে, এদের মধ্যে কেউ কি তার মতো ত্রস্ত ভীত! কিন্তু যে লোকটির জীবনের কোনো অর্থ হয় না তার জন্য জেলে ঢোকার কী মানে হয়? উমাকে হেয় বা করুণার পাত্রী করারও অধিকার তার নেই।
কতজন জেনেছে ইতিমধ্যে? কেউই তো দেখেনি। কেউ নিরুদ্দেশ হলেই তো আর খুনি প্রমাণ হয় না। তবে জড়িয়ে ফেলে ওরা দীর্ঘকাল মামলা চালাবে। হাবার বউ অন্ধকারে না দেখতে পেলেও সেই প্রধান ও একমাত্র সাক্ষী। কী বলবে ও?
”খোঁটাটা কোথায় থাকত?”
”আমার ঘরে।”
”তুমি দেখলে এটা তুলে নিয়ে তোমার স্বামী ওর পিছনে দৌড়ল?”
”হ্যাঁ।”
”তুমি তখন কী করলে?”
”আমিও দৌড়লুম।”
”তারপর?”
”শব্দ হল। কে যেন খোঁটাটা দিয়ে মারছে।”
”ক’টা শব্দ?”
”দুটো।”
”গিয়ে কী দেখলে?”
”হাবা পড়ে আছে, সাড় নেই।”
”তখন কী করলে তুমি?”
সুনীত জানে না তারপর কী হয়েছিল। সে জানে না হাবার বউ কী বলবে।
মাঝবয়সি এক পুলিশ সাব-ইনস্পেকার স্টেশনের ফটকে দাঁড়িয়ে। ওর পাশ দিয়ে বেরিয়ে আসার সময় সুনীত একবার তার মুখের দিকে তাকাল। কোনো কৌতূহল বা তীক্ষ্নতা চাহনিতে নেই। তবু অস্বস্তি থেকে সে নিজেকে ছাড়াতে পারল না। সে ইতস্তত করেনি। ডেইলি প্যাসেঞ্জারের মতো একটা ব্যস্ততা চলনে এনে সামনে দিয়ে হেঁটে এল। প্রতিদিন লাখদশেক লোক এই ফটক দিয়ে এইভাবেই তো ঢোকে এবং বেরোয়।
কিন্তু এই ভিড়ের ধাক্কাধাক্কির মধ্যে কেন দাঁড়িয়ে? হয়তো ডিউটি এখানেই কিংবা বাড়ির কেউ ট্রেনে উঠবে তাই তুলে দিতে কিংবা খবর আছে কোনো পলাতক ট্রেন ধরতে আসবে বা ট্রেন থেকে নামবে।
ও কি জানে তার চেহারাটা কেমন?
হয়তো কোনো ফোটো দেখানো হয়েছে ওকে। একটা কপিও হয়তো পকেটে আছে।
