শেষের অংশটি এড়িয়ে সুনীত বলে, ”কাকে কোট করছিস?”
”কালিদাস, রঘুবংশ… কমনীয় ভুজলতাদ্বয় তার মৃণাল, মুখ তার পদ্ম, লাবণ্যের তরঙ্গ-লীলা সেই সরসীর জল, নিয়তচঞ্চল সশঙ্ক নয়ন সরোবরের শফর-মৎস্য, ঘনকৃষ্ণ কেশকলাপ তার শৈবাল পীনপয়োধর যুগল সরোবরের চক্রবাক মিথুন আর নিতম্বতট সেই জলে অবতরণের সোপান… বৎস সুনীত মনে হচ্ছে মদনের শরানলে দগ্ধ হয়ে তুমি সরসীতে অবতরণ করে জুড়োতে চাও।”
”এতটা মুখস্থ করে রেখেছিস?”
”ক্ল্যাসিক জিনিস মনে গেঁথে থাকে রে। এই বয়সেও ব্রেসিয়ার দরকার হয় না, ওটাও ক্ল্যাসিকাল ব্যাপার।”
”তোর মুখ থেকে শোনার আগে পর্যন্ত কালিদাসকে এমন ভালগার মনে হয়নি।”
চিন্ময় উঠে এসে সুনীতের টেবিলে রাখা প্যকেটটা থেকে সিগারেট বার করে ধরাল। ওর মুখে আর হাসি নেই।
”মানুষের শরীর ব্যাপারটা খুবই সুখের, তাই দরকারি। তোর কি সুখ দরকার নেই?”
”নিশ্চয় আছে।”
”একই মেয়েমানুষের সঙ্গে রাতের পর রাত… একই শব্দ, একই ভঙ্গি, একই কথা, একই গন্ধ, একই স্বাদ, একই বিরক্তি, একই… যদি সুখ বলা যায়, তাহলে ওই সুখ তোর ভালো লাগে?”
সুনীত উত্তর দেয়নি। হাত বাড়িয়ে প্যাকেট থেকে সিগারেট নিয়ে ধরাতে ব্যস্ত হয়। চিন্ময় কি খুব বাজে কথা বলছে? মনের মধ্যে উমার ছবিটা বিবর্ণ হয়ে এসেছে পাঁচ বছরেই, তার উপর নতুন একটা ঝকমকে ছায়া পড়েছে, রুবি। রসিকা, বুদ্ধিমতী এবং কামনা জাগাবার মতো শরীর। এর বেশি আর কী চাই। ইদানীং রুবির সঙ্গে প্রায়ই সে উমার তুলনা করতে শুরু করেছে। তার ফলে উমা ক্রমশই আবছা হয়ে যাচ্ছে।
”কীসের অন্যায় যদি আমি মেয়েমানুষের পিছনে ছুটি, যদি কাউকে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে একঘেঁয়েমি ভাঙাই, তাজা হই শরীরটাকে সুখ দিয়ে। আমার তো আঁতেল মার্কা চেহারা নয়, পদ্যও লিখি না যে রুবি এসে টেবিল ঝুঁকে বুক দেখাবে, সাদা ভাল্লুকের মতো ক্ষমতাবানও নই, বছরে সওয়া লাখ মাইনেও পাই না যে রুবিকে বেঁধে রাখব।”
চিন্ময়ের চোখে মুখে কর্কশ তিক্ত আবেগ ফুটে উঠেছিল। ওর ভিতরে প্রচণ্ড একটা রাগ, বোধহয় স্ত্রীর বা সারা পৃথিবীর বিরুদ্ধেই, ফেঁপে উঠে ফেটে পড়তে চাইছে। জীবনে ওর কি কিছু আকাঙ্ক্ষা ছিল? বোধহয় নিজেও তা জানে না।
”যদি পারিস তো লুটে নে, তবে সাদা ভাল্লুকটা যেন টের না পায়। তাহলেই পাটনা কি গৌহাটিতে বদলি করে দেবে… যারা মেয়েমানুষ পোষে তারা ভীষণ ঈর্ষাপরায়ণ হয়, বিশেষ করে বুড়োরা।”
”সাদা ভাল্লুক” পঙ্কজ আচার্য। সাড়ে ছ’ফুট লম্বা, অন্তত একশো কেজি, দেহভার। গায়ের চামড়া সাদা। ভারী জমাট ঘাড়ের উপর বড়ো মাথাটায় ঝাঁকড়া কাঁচাপাকা চুল কান ঢেকে কাঁধ পর্যন্ত নামানো। বক্সারদের মতো চাপা নাক। বিরাট দেহটি সামনে ঝুঁকিয়ে দু’বাহু দোলাতে দোলাতে হাঁটে। তালুতে মানানসই মোটা আঙুল। রুক্ষ মেজাজি পঙ্কজ আচার্য সুপুরুষ না হলেও প্রবলভাবে পুরুষ, ছাপ্পান্ন বছরেও। ”সাদা ভাল্লুক” নামটি চিন্ময়েরই দেওয়া, অফিসের দু-তিনজন তা জানে, রুবিও জানে এবং শুনে হো হো করে হেসে বলেছিল, ”নামটা ঠিকই দিয়েছে চিন্ময় ঘোষ, কিন্তু ওকেও একটা নাম দেওয়া দরকার… বাদামি ছুঁচো, ঠিক দিলাম কি সুনীত?”
সুনীতের মুখে একচিলতে হাসি ফুটে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই ট্রেনটা ছাড়ল। চোখ বন্ধ করে সে মাথাটা পিছনের কাঠে চেপে ধরল। বাদল নস্করের বাড়িতে নিশ্চয়ই এখন হুলুস্থুলু। অত রান্না খাবে কে! পদ্য দেখাতে পারল না শুভ্রা, বেচারা।
”এবার কোথায় যাব।”
শিয়ালদায় প্ল্যাটফর্মের গেটে কালো কোট পরা লোকটির হাতে টিকিট জমা দিতে সুনীত ব্যস্ত স্টেশনের একধারে দাঁড়াল। যে বেঞ্চটায় বসে গত রবিবার রাতটা কাটিয়েছিল এখন সেটায় ঘেঁষাঘেঁষি সাতজন বসে। গুটিসুটি হয়ে ঘুমিয়ে থাকা লোকটার পা সরিয়ে সে ঘণ্টা তিনেক ওই বেঞ্চে বসেছিল। একবার লোকটা পা দিয়ে তাকে ধাক্কা দেয়, বোধহয় দুঃস্বপ্ন দেখছিল। বুকে জড়িয়ে ধরা থলিটা দেখে সুনীতের মনে হয়েছিল ও কোনো ফেরিওয়ালা, শেষ ট্রেন ফেরি করার পর আর বাড়ি ফেরেনি। ওর তীক্ষ্ন কণ্ঠা, প্রকট হওয়া চোয়ালের হাড়, শিরাভরতি পুরোবাহু দেখতে দেখতে তার মনে পড়েছিল ন’বছর আগে ট্রেনে ঠিক এইরকম চেহারার এক কলম ফেরিওয়ালার কাছ থেকে সে ডটপেন কিনে বাদল নস্করের ছোট্ট মেয়েটিকে দিয়েছিল। তখন সে বকরিহাটি স্কুলের শিক্ষক, সপ্তাহান্তে কলকাতায় আসত।
লোকটিই তাকে মনে পড়িয়ে দেয় তাই সে বকরিহাটি গেছল। এখন কি কেউ তাকে এমন কারুর কথা মনে পড়িয়ে দিতে পারে যার কাছে সে যেতে পারে।
সুনীত এলোপাথাড়ি দেখতে শুরু করল মানুষের মুখ। কোনোদিন সে এভাবে অজানা অচেনা মুখের দিকে তাকায়নি। সবাই যেন একটি মুখোশই লাগিয়ে রেখেছে-ক্লান্ত, অনিশ্চিত, উদ্বিগ্ন দুটি চোখকে ঘিরে নানা রঙের নানা আকৃতির এক-একটি মুখ তার বুকের মধ্যে একটা হিমবাহ ভেঙে গিয়ে শিরাগুলোর মধ্য দিয়ে কনকনে স্রোত সারা দেহে ছড়াল।
ড্যাবড্যাবে দুটি চোখ, চৌকো মুখ, পুরু ঠোঁট এবং কালো চামড়ার একটি বউ দুটি খালি আনাজের ঝুড়ি বগলে চেপে উবু হয়ে বসে। ওর একটি স্তন দেখা যাচ্ছে এবং তাইতেই সুনীতের মন পড়ল…। কিন্তু যাকে মনে পড়াল এখন তার কাছে যাবে কী করে?
