”গত এক মাসে তিনটে খুন হয়েছে, তার একটার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের স্কুলেরই একটা ছেলে, অমিয়… গা-ঢাকা দিয়েছে। হয়তো ওর সম্পর্কেই… আপনার জ্বর এসেছে নাকি!”
”না না, ভালোই আছি। কাকে খুন করেছে?”
”আর বলবেন না, বুড়ি বিধবা পিসিকে হামানদিস্তে দিয়ে থেঁতলে মেরেছে মাত্তর আটটা টাকার জন্য। বুড়ির সোনাদানা ছিল তাতে হাত দেয়নি… এখনকার ছেলেরা কী যে হয়েছে, কত অল্পেই যে প্রাণ নিয়ে বসে। আমি তো ইসকুলে কারুর গায়ে আর হাত দিই না, মাস্টারমশাইদেরও বলে দিয়েছি ঝামেলার মধ্যে যাবেন না, দিনকাল আর আগের মতো নেই। …তাহলে টকই করুক আর দু-চারটে ভেজে দিক।”
বাদল নস্করকে তার সম্পূর্ণ অপরিচিত মনে হচ্ছিল যতক্ষণ কথা বলে যাচ্ছিল। সে জানে লোকটি কথা বলে যাচ্ছে কিন্তু ওর একটি কথাও কানে ঢুকছিল না কিংবা কোনো অর্থ তৈরি করছিল না। তার কেমন যেন মনে হচ্ছিল জীবন থেকে সে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, একটা কৃত্রিম পৃথিবীতে সে আটকে পড়ে স্থির হয়ে রয়েছে। ভয়ে দিশাহারা হয়ে সে বেরিয়ে আসতে চায় এবার। এই লোকটা সম্পর্কে কিছুই সে জানে না। এই গ্রামটা সম্পর্কেও। এদের আছে নিজস্ব সমস্যা, নিজস্ব জীবন, নিজস্ব ছোটোখাটো পৃথিবী যাকে ঘিরে এরা আবর্তিত হচ্ছে খুবই সিরিয়াস ভঙ্গিতে। এটা তার জায়গা নয়। এখান থেকে তাকে চলে যেতে হবে। স্থানান্তর ঘটাতে হবে।
কোথায় যাব? চোখের মধ্যে শিরা উপশিরাগুলো দপদপ করছে। সুনীল জানলা দিয়ে আকাশে তাকাল। চশমাটা পরতে গিয়েও পরল না। হলুদ রেখাটা বিস্তৃত হয়েছে আকাশে। হলুদটা উজ্জ্বল হয়েছে। বৃষ্টি থেমে গেছে। কালো একটা বিন্দু ভেসে যাচ্ছে অলস মন্থর গতিতে।
শুভ্রা একটা গামলা হাতে টিউবওয়েলের দিকে যাচ্ছে। মুখ ফিরিয়ে তাকাল। গামলাটা তুলে সুনীতকে দেখাল।
”মাছগুলো কাটতে বসিয়ে দিল।… স্কুল থেকে এসে দেখাব’খন।”
সুনীত শান্তভাবে মাথা হেলাল। তার মাথার মধ্যে শৃঙ্খলা ফিরে এসেছে। এখন সে জানে বাদল নস্কর ও শুভ্রা বাড়ি থেকে বেরোলে কিছু সময় অপেক্ষা করে সে-ও বেরিয়ে পড়বে।
এখন যদি সে কল্পতরুর দেখা পেত! তাহলে বলত, ”পৃথিবীটা ঝিরঝিরে গুমোট ভ্যাপসা আর অচেনা কিন্তু তবু একটা পৃথিবী তো বটে। এখানে এই শরীরটাকে ভয় থেকে মুক্তি দেবার মতো একটা জায়গা দিতে পারো… বাওবাব, বাওবাব!”
দু’হাত তুলে জানলার গরাদ ধরে সে অপেক্ষা করতে লাগল।
তিন
বারুইপুর স্টেশনে ট্রেন প্রায় পাঁচ মিনিট দাঁড়িয়ে। কামরায় ভিড় নেই। এই সময় কলকাতার দিকে যাওয়ার লোক কমই থাকে। চাপদাড়িওয়ালা বৃদ্ধটি এখানে নেমে যেতেই সুনীত জানলার ধারে সরে এসেছে।
লোকটির দাড়িই শুধু নয়, চওড়া চৌকো কপাল আর টিকোলো নাকের সঙ্গেও মিহিরের অদ্ভুত একটা সাদৃশ্য আছে। ফোটোগ্রাফার মিহির অফিসে মাঝে মাঝে আসত রুবির কাছে। দু-চারটে কথা বলেই চলে যেত। কাচের প্যানেলের ওধারে দুজনের ভাবভঙ্গি, চাহনি, ঠোঁট নাড়া থেকে ওদের সম্পর্কটা বুঝে নেবার জন্য সুনীত ইন্দ্রিয়গুলোকে যথাসাধ্য সজাগ করে তুলত। রুবি সেটা লক্ষ করেছিল।
একদিন মিহির চলে যেতেই রুবি ভ্রু কুঞ্চিত করে কাচের ওধার থেকে সুনীতের দিকে তাকায়। তারপর সুনীতদের ঘরে আসে।
”মুখার্জি, অমন প্যাটপ্যাট করে কী দেখছিলে?”
রুবি তখন সুনীতকে ‘মুখার্জি’ বলত।
সামনের টেবিলে চিন্ময় মুখটা একবার তুলেই নামিয়ে নেয়। সুনীত না তাকিয়েই টের পায় চিন্ময় মুচকি হাসছে। রুবি চলে গেলেই ও আদিরসাত্মক টিপ্পুনি কাটবে।
টেবিলে দু’হাতে ভর দিয়ে রুবি ঝুঁকে দাঁড়িয়েছিল। হাতাবিহীন ব্লাউজের বড়ো ফাঁদের গলা এবং নাভির নীচে শাড়ির কষি সুনীতকে সন্ত্রস্ত করছিল। কোথায় চোখ রাখবে ভেবে পাচ্ছিল না। ওর শরীর কিছুই অবহেলায় নয়, উদ্বৃত্ত নয়।
”ঈর্ষা বোধ করছিলাম।”
দুজনের সম্পর্কটা তখন হাস্যপরিহাসের থেকে অন্তরঙ্গতায় নেমেছে।
”বেল পাকলে কাকের কী? তোমার ঈর্ষায় তুমিই শুধু জ্বলে মরবে।”
”বেলটা তো একদিন খসে মাটিতে পড়ে ফাটবে, সেজন্যই কাক অপেক্ষা করে।”
”আপাতত খসছে না, আর যখন পড়ে ফাটবে দেখবে ভেতরটা একদম পচা।”
খইয়ের মতো সাদা সাজানো দাঁতের উপর হালকা গোলাপি ঠোঁটদুটি রুবি টেনেছিল তখন। উপরের পাটি সামান্য এগিয়ে নীচেরটির থেকে। এজন্য ওর মুখমণ্ডলে গা শিরশির করা শ্বাপদ তীক্ষ্নতা ফুটে ওঠে যখন হাসে, মুখের হনু চওড়া, চোখ দুটি জ্বলজ্বলে এবং ক্ষুদ্র। হাসলে পাতায় চোখ ঢেকে যায়। কফি রঙের গায়ের চামড়ার নীচে পাতলা চর্বির স্তর ঔজ্জ্বল্য এবং নিটোলত্ব দিয়েছে অবয়বে।
রুবি একটু চাপা স্বরে বলেছিল, ”হয়েছে হয়েছে, তোমার সঙ্গে মিহিরের পরিচয় করিয়ে দেবো’খন; ছেলেটি ভালো, সাদাসিধে তবে একটু খ্যাপাটে। ভালো লাগবে।”
সুনীত জানলা দিয়ে স্টেশন মাস্টারের ঘরের দিকে তাকাল। বিনা চশমায় ঝাপসা লাগছে। চশমার জন্য বুক পকেটে হাত দিয়েই, নামিয়ে নিল। হঠাৎ ভাঙা চশমা পরতে দেখলে লোকে তাকাবে। সন্তর্পণে সে সামনের বেঞ্চে বসা তিনজনের মুখ লক্ষ করল। উদাস, বিরক্ত, উদ্বিগ্ন তিনটি মুখ। ট্রেনের হল কী! তার কেটেছে? কারেন্ট বন্ধ? ফিশপ্লেট খুলে নিয়েছে? অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে? যে-কোনো একটা হতে পারে, ভেবে লাভ নেই। রুবির হাইহিলের টকটক শব্দ ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার পর চিন্ময় বলেছিল, ”অবগাহনের নিমিত্তই বিধাতা কর্তৃক রমণী-রূপ সরোবর নির্মিত হইয়াছে… ব্রেসিয়ার পরেনি নিশ্চয় লক্ষ করেছিস।”
