”স্কুলের ম্যাগাজিনে লিখেছি, ছাপা ম্যাগাজিন। আর বকরিহাটি লাইব্রেরির যখন থিয়েটার হল, তার বইয়েও একটা বেরিয়েছে। দেখবেন?”
”পরে দেখব।”
লাজুক মুখটা হতাশ হলো। সুনীত আন্দাজ করছে, নিশ্চয় প্রকৃতি বিষয়ক নয়তো স্বাদেশিক ব্যাপার নিয়ে।
”আপনি লেখেন না কেন?”
কী বলা যায়। এই সামান্য কৌতূহলের জবাব দিতে হলে তাকে গত ন-দশ বছরের মধ্যে সেঁধিয়ে উত্তর সংগ্রহ করতে হবে। সময়সাপেক্ষ ব্যাপার।
”সময় পাই না আর… অফিসে খাটুনি, বাড়ি ফিরে এত টায়ার্ড লাগে।”
পদ্য লেখা ছেড়ে দেবার এটা এক-চতুর্থ কারণ। বাকিটা, একে বললেও বুঝতে পারবে না। আদতে আমি কবি নই, যা লিখেছি সেগুলো কুঁতিয়ে কুঁতিয়ে শব্দের পর শব্দ বসিয়ে যাওয়ায় যা হোক একটা কিছু হয়ে যাওয়া। নতুন শব্দ, অভিজ্ঞতা, অনুভূতি বা রূপকও নয়। শব্দ জড়ো করে যাওয়ার মজুর মাত্র। এসব কথা ওকে বলে লাভ কী!
”দেখবেন আমার লেখা?”
”ছাপা লেখা?”
”খাতাও আছে। আমি আনছি।”
কী নিস্তব্ধ এই গ্রামটা। বাদলবাবু বোধহয় স্কুলে যাওয়ার জন্য তোড়জোড়ে ব্যস্ত। এক সময় কিছু লিখেছিলাম বটে, তখন উমার সঙ্গে প্রণয় চলছে। প্রেমই বিষয় হয়ে উঠত। বছর বারো আগে সাতাশ জন তরুণ কবির কবিতা সংকলনে তারও একটা কবিতা স্থান পেয়েছিল। কাব্যগুণে নয়, বইটি প্রকাশের খরচ বাবদ পঞ্চাশ টাকা চাঁদা দিয়েছিল। বইটা সে শুভ্রার বাবাকে দেখিয়েছিল।
এই ঘরে বাস করার সময় প্রথম মাসেই সে গুটিচারেক কবিতার খসড়া করেছিল। যতদূর মনে পড়ে প্রকৃতিই যেন প্রাধান্য পেয়েছিল। তারপরই কেমন যেন ক্লান্ত বোধ করতে শুরু করে। কাগজগুলো ফেলে দিয়েছিল।
বিয়ের পর লেখার কথা আর সে ভাবেনি। কবিত্বের আবহাওয়া থেকে একটু একটু করে ভেসে চলে যায়। সে আর উমা, নিম্নমধ্যবিত্ততার স্তর থেকে ওঠার জন্য, সুখ সংগ্রহের অভিলাষে তখন থেকে শুধু বৈষয়িক উন্নতির কথাই ভেবেছে, খেটেছে আর ক্লান্ত হয়েছে। পরস্পরের কাছে তারা বিবর্ণ, অপ্রফুল্ল, বিস্ময়সৃষ্টিতে অসমর্থ দুটি আয়নার মতো বসবাস করছে।
সঠিকভাবে সে মনে করতে পারবে না কবে, কখন, কে তাদের মধ্যেকার যোগসূত্রটা ছিঁড়ে দেবার কারণ হয়েছে। বছর চারেক আগে হয়তো রুবির সঙ্গে পরিচয় হওয়া থেকেই সে বুঝতে পারছিল উমা আর তার মধ্যে কোনো যোগ নেই। এখন হয়তো তাদের দুজনের কল্পনায়ই শুধু যোগসূত্রটা টিকে আছে।
কিন্তু কারুর সঙ্গে কোনো প্রকারের একটা যোগ চাই, যার মারফত নিজেকে বার করে দেওয়া যায়, ভরিয়ে নেবার মতো কিছু পাওয়া যায়। ধর্মে নয়, রাজনীতিতে নয়, প্রতিষ্ঠানে নয়, কবিতায় সে যোগসূত্র পেতে চেয়েছিল। সেটাও গেছে। জগদীশ আধ-মাতাল অবস্থায় কিছুদিন আগে হো হো অট্টহাসিতে শরাবখানার লোকেদের চমকে দিয়ে বলেছিল, ”আমি যে কবি নই, এটা বুঝতে বুঝতেই কুড়ি বছর কেটে গেল। তুই ব্যাটা চালাক আগেই বুঝে ফেলেছিস।… মুশকিল কী জানিস আমার পক্ষে লেখা ছাড়া এখন আর সম্ভব নয়… বিখ্যাত হয়ে গেছি যে। অসমালোচিত জীবন কোনোক্রমেই যাপনযোগ্য নয় এটা কি জেনেছিস?”
হালুয়াটা সুনীত খেতে পারল না। তেতো লাগছে, অত্যন্ত গুড় দেওয়া। শুভ্রা একটু যেন বেশি সময় নিচ্ছে অর্থাৎ কবিতা জড়ো করছে। স্তূপ হাতে আসবে।
কী অবশিষ্ট রইল তার জন্য? দুজনের সংসার, চাকরি, বিছানা, চারপাশের বোকামি আর রুবি কাঞ্জি? প্রথমে সে তাই-ই আশা করেছিল। তবে উমার জায়গাটা রুবি নিয়েছে এমন দাবি করলে সেটা ভুল করা হবে। রুবি কারুরই জায়গা নেয়নি। সে একটা শূন্যতা ভরিয়েছে, এই শূন্যতার কারণ…।
ওদের মাথায় এই কারণাটা একবারের জন্যও আসেনি যে, ওরাই তাকে ডুবিয়েছে। ওদের দুজনের কেউ-ই তাকে কিছু দেবার জন্য ব্যস্ত হয়নি। …কী দেবার জন্য? শব্দটা কী খুঁজতে শুরু করল। এবং বুঝতে পারল খোঁজাখুঁজির দরকার নেই। ”দেওয়া” শুধু এইটুকুই তো… ব্যস, যথেষ্ট। কিছু একটা তাকে দেবে সেটাই তো দেওয়া।
খুবই ব্যস্ত হয়ে বাদল নস্কর ঘরে ঢুকল। সারা গায়ে সর্ষের তেল। বাহুর উপর থেকে নীচ দ্রুত তালু ঘষতে ঘষতে বলল,
”আড়াইশো-টাক মৌরলা মাছ পেয়েছে শুভ্রার মা, বাড়িতেই বেচতে এসেছিল… কী করবে, ভাজা না টক? টকই করুক, তাই বলেছি। মঞ্জিলকে আপনার অফিসের ঠিকানা দেব কি? গিয়ে তো ভ্যাজর ভ্যাজর করে জ্বালিয়ে মারবে… আজ একটু তাড়াতাড়িই ইসকুলে যেতে হবে, হেডমাস্টারমশাই এইমাত্র খবর পাঠালেন, দারোগা নাকি আসবে…।”
সুনীতের উঠে বসার ভঙ্গিতে বাদল নস্করের কথা থমকে গেল। দারোগা! ওরা কি জেনে গেছে সে বকরিহাটিতে রয়েছে। বাদলবাবু অমন অবাক চোখে তাকিয়ে কেন! মাথার মধ্যে তালগোল পাকানো ভয়টাকে দমিয়ে রাখার প্রাণপণ চেষ্টাটা যেন কিছুতেই মুখের উপর ভেসে উঠতে না পারে। জিভটা অসাড় লাগছে, একটা সিগারেট পেলে ভালো হয়।
”কেন?”
সুনীত তীক্ষ্ন চোখে তাকাল। বাদল নস্করের মুখের একটি পেশিরও নড়াচড়া সে দৃষ্টি থেকে হারাতে রাজি নয়। কোনোরকম সন্দিগ্ধতা, কিছু চেপে যাওয়ার চেষ্টা করছে কি না, জানতে হবে।
”কে জানে কেন, এই অঞ্চলে নিত্যই তো কত ঘটনা ঘটছে…।”
কী ঘটছে? খুন, ডাকাতি, ধর্ষণ… ওরা কি আমার জন্য ডেকে পাঠিয়েছে? গ্রামে নতুন লোক এসে রয়েছে সোমবার থেকে, এ খবর নিশ্চয় পেয়ে গেছে।
