ঘরের মধ্যে কয়েকটা ছেলে হুটোপাটি শুরু করেছে। কে যেন চীৎকার করে খিস্তি করল। মেয়েরা নড়েচড়ে নিজেদের মধ্যেই একটা কথা বলার ছুতোয় অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে দেখল, প্রফেসার আসছে কিনা।
মিথ্যে বলতে হবে কেন। গোলাপী শাড়িকে লক্ষ্য করতে লাগল চিনু। কতকগুলো ক্ষেত্রে সত্যিকথা বলাটা বোকামী। তাতে ক্ষতি বই লাভ হয় না। এক্ষেত্রে লাভ কি হবে? যদি কাবেরী বলে, চলুন কোথাও গিয়ে বসা যাক, এখানে বড্ড গোলমাল। তাহলে রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসতে হয়, কেননা কলকাতা শহরে বসবার জায়গা বলতে কিছু নেই। রেস্টুরেন্টে বসলে কম করে চার আনা খরচ। খরচটা নিশ্চয় কাবেরী দেবে না। চার আনার বদলে কি পাওয়া যাবে। কিছু না। শুধু একটা উঠতি বয়সী মেয়ের সঙ্গে কয়েক মিনিট কথা বলা। এর জন্যে চার আনা! তাও পকেটে চার আনা পয়সা নেই। চিনুর মেজাজ চড়তে শুরু করল। কি জন্যে এখানে এলুম!
প্রফেসার আসছে। মেয়েরা ক্লাশে ঢুকল। নিচে নামবার আগে চিনু আর একবার তাকাল। গোলাপী শাড়ির বাহারটা বেশ।
রাস্তায় নেমে চিনু ভাবল কোথায় যাওয়া যায় এ সময়টা। সন্ধ্যে হলে বরং সোনাগাছির গলি দিয়ে যেতে যেতে সব দেখতে দেখতে সময় কাটান যেত। সন্ধ্যের এখনো অনেক দেরী। তার চেয়ে কফি হাউসে যাওয়া যেতে পারে।
.-ক’দিন আসনি কেন, সময় হয়নি? খুব কাজ ছিল?
চুপ করে রইল রমা। এক কথায় উত্তর দেওয়া যায় না। আসতে তার ভাল লাগছিল না। কিন্তু তা’হলেই প্রশ্ন উঠবে, কেন ভাল লাগছিল না। মুশকিল এই ‘কেন’ টাকে নিয়ে, ক’দিন ধরেই সে তন্নতন্ন করে বুঝতে চেষ্টা করেছে ঠিক আগের মত তার মনটা কাজ করছে না কেন? মাথামুণ্ডু কিছু খুঁজে পায়নি। শুধু একটু বুঝেছে, সে বদলে যাচ্ছে। কাউকে আর তার ভাল লাগছে না। বিশ্বকেও।
মুশকিলটাও আবার সেইখানে। কাউকে ভাল না লাগার জন্য আশপাশের যা কিছু দেখছে তাই বিচ্ছিরি লাগছে। আর সবকিছুর ওপর ঘেন্না নিয়ে একদণ্ডও তিষ্ঠোন যায় না। হাঁপ ছাড়ার একটা ছুতো চাই।
বিশ্ব সময় কাটাবার একটা ছুতোই! এ কথাটা রমা এই মুহূর্তে ভাবল। শুধু এই সময়টুকু তো নয়, সারা দিনরাতই ওর কথা ভাবতে ভাবতে হুশ করে কেটে যায়। কোন কিছুর আঁচ গায়ে লাগল কিনা বোঝাই যায় না। তাছাড়া শুধু মনটাই তো নয়, শরীরটাও আছে। বিশ্বর কাছে এলে বা ওর কথা ভাবলেই ঝিমঝিম করে ওঠে শরীর। নেশা নেশা লাগে। বিজয়ার দিন যমুনা সিদ্ধি করে। তাই খেয়ে একবার হৈ হৈ করে হেসেছিল। বেশ লেগেছিল তখন। অমনি বেশ লাগে বিশ্বর নেশা। এই নেশাটা কদিন যেন ফিকে লাগছে।
রোজ রোজ এইরকমভাবে আসা, জানলায় দাঁড়িয়ে কথা বলা, আর একই কথা বলা। কদ্দিন ভাল লাগে! সারা জীবন ধরে এমন করে চলে না, চলবেও না। এ ক’দিন ভাবতে ভাবতে রমা এইটেই বুঝেছে পুরুষদের থেকে মেয়েদের জীবনটা আলাদা ধরনের। মাধবী, বড়বৌ যমুনাদের দেখেই এই ধারণাটা হয়েছে। ওদের থেকে সে কোন অংশে আলাদা নয়। সম্বন্ধ দেখা হচ্ছে। বিয়ে হবে। নতুন সংসারে যেতে হবে, ছেলেপুলে হবে। সমাজের নিয়ম কানুনগুলোকে মানতে হবে। এতগুলো ‘হবে’ পুরুষরা ইচ্ছে করলে নাও স্বীকার করতে পারে। সুবিধেটা ওদের বেশি। কিন্তু সুবিধে যদি কোন মেয়ে পায় তাহলে ছেড়ে দেওয়াটা বোকামি। বুলাদের মত কোন সংসারে যদি বিয়ে হয়, তাহলে বিশ্বর না করতে তার মোটেই ইচ্ছে নেই। হয়তো বুলাদের সংসারে যাওয়া হবে। কিন্তু এমনও হতে পারে, ওদের থেকেও বড়লোকের ঘরে বিয়ে হ’ল। সবকিছুই তো সম্ভব হয়। তাহলে বিশ্বর ওপর ভরসা করেই বা কি লাভ!
-কি, কথা বলছ না যে। আসনি কেন?
-এমনি।
-শুধু এমনি?
রমা তাকাল বিশ্বর মুখে। জ্বলছে মুখটা। আকাশে মুখ তুলল রমা। সূর্যটা বাতাস ঝলসাচ্ছে। তিরতির করে দূরের বাড়িগুলো কাঁপছে। শরীরে নেশা লাগছে। এতক্ষণ ধরে যা ভাবছিল রমা, গুলিয়ে যেতে শুরু করল।
-কি ভাবছ?
-কই?
-কই! তোমার ভাবনা কি আমি জানব?
-না কিছু ভাবিনি তো।
গলা কেঁপে উঠল রমার। আহা এমন নেশা সারা জীবন কেন থাকে না। কি হবে দিনরাত সংসারের কথা ভেবে। এই মুহূর্তে শরীর আর মন যে অবস্থায় আছে, সেইটেই এখনকার মত বড় কথা। এখন সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে এই ভাললাগাটুকুকে নষ্ট করা বোকামি।
-আমি আসিনি বলে তুমিও তো খোঁজ নাওনি। মরলুম কি বাঁচলুম তাতে তো তোমার বয়েই গেল।
রমার ভাল লাগছে অপ্রস্তুত বিশ্বর মুখটাকে। কথা হাতড়াচ্ছে লাগসই গোছের কিছু একটা বলার জন্য। বলুক এমন কিছু একটা, যার কোন মানে হয় না। ভাল লাগবে।
-আমার না তোমার, বয়ে গেল? আমি তো কতবার ওপর-নীচ করেছি।
এবড়ো-খেবড়ো হয়ে গেছে বিশ্বর মনটা। হোক। সাজানো গোছানো কথা ভাল লাগে না এ সময়। তৈরি করা কথায় সময় কাটে না। এখন সময় কাটাতে হবে। তার জন্য আগোছাল কথা দেদার খরচ করতে হবে।
-কি করছিলে?
-কিচ্ছু না।
-রাগ করেছ?
-না।
বিশ্বর স্বরটা ভারি। জ্বরো রুগীর মত টসটস করছে চোখ দুটো। অধৈর্য হয়ে জানলার গরাদগুলো যেন বেঁকিয়ে ফেলবে।
-ভাবছি তোমায় বলব বাইরে আর কদ্দিন দাঁড়াবে? ভেতরে আসবে না?
-ভেতরে যাব কি, ওরা সব রয়েছে না!
-থাকলেই বা।
-বাঃ কি ভাববে না!
-ভাবলেই বা।
বেশ লাগছে রমার। বিশ্ব কি বলতে চায় তা সে অনেকক্ষণ বুঝেছে। সে কথাটা জানলেই তো কথা বলা ফুরিয়ে যাবে। তার চেয়ে না বোঝার ভান করলে, কথা গড়াবে অনেকক্ষণ ধরে। তবু সাবধান হওয়া দরকার। এ সময় এ ভান খসাতেই হবে। বরং অন্য কিছু নিয়ে কথা শুরু করা ভাল।
