”কী দরকার ছিল!”
”বলেন কী? অ্যাতো বছর পর পায়ের ধুলো দিলেন। একটু যত্ন করে শান্তি পাব, নাকি তা-ও পেতে দেবেন না।… তুই কী কত্তে, ছেলের চাকরির জন্য? আর সময় পেলি না।” মঞ্জিল মাথা চুলকোতে লাগল। বাড়ি ফেরার পথে বাদল নস্কর বকবক করে চলল। ”জোষ্টি আষাঢ়ে আসবেন। আম, লিচু, কাঁটাল যত খেতে পারেন খাওয়াব, ওনাকেও আনবেন নেমন্তন্ন করে রাখলাম। আর খাওয়াব ওল। কী আপনারা সাঁত্রাগাছির ওলের কথা বলেন, খাবেন বকরিহাটির ওল, মনে হবে ছানার ডালনা খাচ্ছি। আপনি তো খেয়ে গেছেন, সে-কথা কালই শুভ্রার মা বলল, আপনাকে রেঁধে দিয়েছিল খেয়ে বুঝতেই পারেননি। তারপর যেই শুনলেন ওল খেয়েছেন অমনি গলা কুটকুট করার বাতিকে পেয়ে বসল। হয়, ওরকম হয়।”
শেখ মঞ্জিল সংকোচভাবে বলল, ”আমি বরং ও-বেলা একটা মুরগি দিয়ে যাব।”
”আজ নয়, বরং কাল সকালে এনো। আমি রাতে মাংস খাই না।”
”সেই ভালো আজ শুধু মাছ দিয়েই হোক। তুই এবার কেটে পড় তো। বিশ্রাম করতে এয়েছেন উনি, চাকরি-বাকরির কথা কলকাতায় গিয়ে বলিস।”
শেখ মঞ্জিল রাস্তা থেকেই বিদায় নিল।
বাড়িতে ঢুকে বাদল নস্কর রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন। সুনীত ঘরে ঢুকে তক্তপোশে বসল। চোখ বন্ধ করে সে ভাবল, বকরিহাটি এবার অসহ্য এবং বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। ক্রমশই তার অবস্থিতি জানাজানি হয়ে যাচ্ছে। অবাঞ্ছিত কাজ ঘাড়ে চেপে বসেছে।
গতরাত্রে ভূগোলের মাস্টারমশাই শরৎবাবু আবার এসেছিলেন।
”আচ্ছা সুনীতবাবু আপনি বাওবাব গাছ দেখেছেন কি? শুনেছি বালিগঞ্জের লেকের উত্তর-পশ্চিম দিকে একটা নাকি আছে, খুবই ছোটো আকারে এই সজনেগাছের মতো।”
সুনীত অবাক হয়ে শরৎবাবুর চশমার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ে। বাওবাব শব্দটাই সে এই প্রথম শুনল।
”কী গাছ ওটা?”
‘গীতার সেই ঊর্ধ্বমূলমধঃশাখমশ্বত্থং’, সাগর মন্থনে উঠেছিল যে কল্পতরু, বাওবাব হচ্ছে সেই। বছরে ছ’মাস বাওবাবের পাতা থাকে না তখন এর ডালগুলোকে ঠিক শেকড়ের মতো দেখায়, মনে হয় যেন শেকড়গুলো আকাশের দিকে উঠেছে আর গাছটা নীচের দিকে বেড়েছে। আসলে এ-গাছ পূর্ব আফ্রিকার। এর গুঁড়ির বেড় তিরিশ মিটার পর্যন্ত নাকি হয়, কল্পনা করতে পারেন তি-রি-শ-মি-টা-র।”
”এত মোটা গুঁড়ি ভাবতেই পারি না। হয় নাকি?”
”আছে আছে প্রয়াগের কাছে গঙ্গার পুব তীরে শুনেছি একটা আছে। ভাবছি একবার দেখে আসব। তার আগে ওটাকে দেখতে হবে। আপনি একটু খোঁজ নিয়ে জানাবেন সত্যিই ওটা বাওবাব কি না।”
”দেখে কী হবে, কল্পতরুর কাছে কি কিছু চাইবেন?”
কথাটা বলেই সুনীতের মনে হয়েছিল, এরকম একটা গাছ থাকলে ভালো হত। তাহলে সে চাইত হাবাটা বেঁচে উঠুক। যথারীতি গোলাপবাগান রোডে বসে চিনেবাদাম বেচুক আর তার খকখক কাশি সন্ধ্যা থেকে গুণেন ভবনের মানুষদের জ্বালাক।
কিন্তু এই মুহূর্তে তক্তপোশে একা চোখ বন্ধ করে বসে তার মনে হচ্ছে, কল্পতরুর কাছে সে চাইবে চিরকালের জন্য গা-ঢাকা দিয়ে থাকার এমন একটা জায়গা যেখানে চেষ্টা করলেও মানুষের সঙ্গ পাওয়া সম্ভব নয়। যেখান থেকে ওরা তাকে খুঁজে বার করে কোমরে দড়ি বা হাতে হাতকড়া দিয়ে কোর্টে নিয়ে যেতে পারবে না। ফাঁসি না হলেও অন্তত সাত কি দশ বছরের জন্য জেল তো বটেই।
সুনীত ঢোক গিলতেই গলা ব্যথা বোধ করল। কপালে হাত দিয়ে তাপ বোঝার চেষ্টা করল। চোখ জ্বালা করছে, শরীর শ্রান্ত লাগছে। প্রতি বছরই তাকে শীতকালে সর্দিজ্বরে ভুগতে হয়। ধীরে ধীরে সে বিছানাটায় নিজেকে এলিয়ে দিল। এইরকম সময়ে উমা ট্যাবলেট আর জলের গ্লাস এগিয়ে দেয়। উমা…।
”কাকাবাবু।”
শুভ্রার হাতে অমলেট আর হালুয়ার প্লেট। সুনীত উঠে বসল। কালকের মতো চিঁড়েভাজা দিলে ভালো লাগত।
”তোমার তো পরীক্ষা এসে গেল, কেমন তৈরি হয়েছে।”
মেয়েটি রুগণ। বাড়িতে ফ্রক পরে। হাত-পা দেখলেই বোঝা যায় যত রকমের ভিটামিন লভ্য সবই ওর শরীরে দরকার। ওকে দেখে মায়া হয়।
”এক রকম হয়েছে।”
”আমি যখন ছিলাম তখন কোন ক্লাসে পড়তে?”
সুনীত চামচ দিয়ে অমলেট কাটতে কাটতে ওকে লক্ষ করল।
”তখন স্কুলে ভরতি হইনি।”
”ওহ, হ্যাঁ, মনে ছিল না। তুমি কলকাতায় যাও?”
”খুব কম! এ-বছর কালীপুজোর আলোর সাজ দেখতে গেছলুম।”
”এবার যখন যাবে, আমার ওখানে যেয়ো, কেমন।”
ঘাড় নেড়ে শুভ্রা দাঁড়িয়ে রইল। কী যেন বলব বলব করছে। তারপরই খাপছাড়া প্রশ্ন করল : ”আপনি তো পদ্য দেখেন, কাল রাতে মা বলছিল একটা বইও আছে।”
মুখে অমলেট রেখে সুনীত তাকিয়ে রইল। কী ব্যাপার! এই পরিবারটি ক’দিন ধরেই ন’বছর আগের স্মৃতিগুলোকে খোঁড়াখুঁড়ি করে যাচ্ছে। ন’বছর আগে কুমারী উমা এক মধ্য রাতে শুভ্রাদের ঘর থেকে চুপিসারে এই ঘরে এসে ঘণ্টা দুয়েক কাটিয়ে গেছল। ফিরে গিয়ে কিছু পরেই সে টের পেয়েছিল শুভ্রার মা জেগে রয়েছে। এই তথ্যটি কি আলোচিত হয়েছে, অবশ্যই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে!
অস্বস্তি এবং বিরক্তিতে ভরে উঠল সে। এই জায়গাটায় কেন যে এলাম।
”সব মানুষই ভুল করে, আমিও করেছিলাম। আর করি না… আর পদ্য লিখি না।”
”আমি একটা-দুটো লিখেছি। দেখবেন?”…
সুনীত এর থেকে বেশি আশ্চর্য হত না যদি এখুনি চারটে পুলিশ ঘরে ঢুকে পড়ত। গ্রামের এই এগারো ক্লাসের মেয়ে পদ্য লেখে!
