সুনীত বড়ো পুকুরের দিকে যাবার সোজা পথটা ছেড়ে ঘুরপথে এগোল। এদিকটায় বাড়ি কম, লোকজনও কম। প্রায়ই সে স্কুল থেকে ফেরার সময় এই পথটা দিয়ে ঘুরে আসত। তখন ভাবত, এখানেই থেকে যাবে। স্টেশনের ধারে কয়েকটা দোতলা বাড়ি উঠেছিল, উমাকে বিয়ে করে ওই বাড়িগুলোরই কোনো একটায় ঘর ভাড়া নিয়ে থাকবে। এক একদিন সকালে খালি পায়ে গেঞ্জি আর পাজামা পরে সে গ্রামের প্রান্তে এসে দাঁড়াত। ‘ছিন্নপত্রের’ নানা অংশ তখন তার মনে পড়ত। সেই সঙ্গে মাটির সোঁদা গন্ধ, হঠাৎ কোনো পাখির ডাক, দূরে জমিতে হাল দেওয়ায় ব্যস্ত চাষি আর জগৎজোড়া শান্ততা তাকে আপ্লুত করত।
কিন্তু ধীরে ধীরে টানাপোড়েন শুরু হল তার মনে। মাস দুয়েকের পরই সে দূরের খড়ের চালাবাড়ি, গাছ, সবুজ চারাধান, ভিজে বাতাসে মাটির গন্ধ আর নৈঃশব্দ্যের মধ্যে অস্থির বোধ করতে শুরু করে। তার মনে হয়, এই তুষ্ট, জড় ভূপ্রকৃতির সঙ্গে ওতপ্রোত হয়ে পড়লে নিথর অপরিবর্তনীয় এক ক্লান্তির গর্ভে সে নিক্ষিপ্ত হবে। মারমুখো, বিচ্ছিন্ন দ্বন্দ্বময় কলকাতার কাছ থেকেও সে ক্লান্তি পায়। কিন্তু তার মধ্যে ঝাঁঝালো একটা আমেজ আছে, দ্রুত পরিবর্তনীয় এবং তাতে সংকীর্ণতা নেই। পছন্দ বা বাছাই করার সুযোগ আছে। সে বুঝতে পারে এখানে রয়ে গেলে তার অপমৃত্যু ঘটবে, উমারও তীব্র অনিচ্ছা ছিল। সে তার বিছানা ও সুটকেস নিয়ে গ্রীষ্মের ছুটি পড়তেই কলকাতায় চলে আসে। ট্রেনে তুলে দিতে এসে বাদল নস্কর তার দুটি হাত ধরে বলেছিল, ”সত্যি সত্যিই ফিরে আসবেন তো? কলকাতার মানুষ পাড়াগাঁয়ের স্কুলে থাকতে চায় না। দুজন এসেছিলেন, দু-তিন মাস থেকেই চলে গেলেন। আপনি কিন্তু আসবেন।”
সুনীত ঘাড় নেড়েছিল এবং তার ন’বছর পর ফিরে এল। কীজন্য? অন্য কোথাও তো যেতে পারত সে! বাদল নস্করের সহৃদয় সরল এই আবাসটি অবচেতনে ন’বছর ধরে কী অপেক্ষা করছিল ভয়ংকর কোনো উৎক্ষেপের জন্য। স্নেহ মমতা যত্নের আকাঙ্ক্ষায় তার ভিতরে অতৃপ্তি তিলতিল করে জমে উঠেছিল কি? পকেট থেকে চশমাটা বার করল। একটা কাচ না থাকলেও দেখতে অসুবিধা হচ্ছে না। কিন্তু কাচবিহীন চোখে চাপ পড়ছে ফলে অন্য চোখের দৃষ্টি প্রকৃতির কোনো বিষয়ের উপরই সঠিক মাত্রায় বসতে পারছে না। পিছলে যাচ্ছে। একটা চোখ বন্ধ করে সে বলল, ”আমার জীবন?”
বড়ো পুকুরের দিকে যাবার পথে একটা নির্জন এবং খেজুরগাছের আড়াল পাওয়া জায়গায় দেশলাই জ্বেলে রুমালটা পুড়িয়ে দিল। পায়ের চাপে ছাইগুলো গুঁড়িয়ে দিতে দিতে মুখ তুলেই অবশ হয়ে গেল তার বুকের মধ্যেটা। একটা লোক!
ফতুয়া, রঙিন লুঙ্গি, থুতনিতে নুর, পায়ে চটি। ঢ্যাঙা লোকটি আদাব জানাল।
”মাস্টারমশায়ের কাছে শুনলাম আপনি এয়েছেন। বললেন, এখন খুব বড়ো কোম্পানির ম্যানেজার হয়েছেন তাই দেখা কত্তি যাচ্ছিলাম। আমারে অবিশ্যি মনে থাকার কথা নয়… কাগজ পোড়ালেন নাকি?”
”হ্যাঁ।”
আর একজন সাক্ষী ওরা পেল। রুমালটাকে ইটে জড়িয়ে পানাপুকুরটায় ফেলে দিলেই তো হত। বোকামি করছে সে।
”ঠিক চিনতে পাচ্ছি না তো তোমায়।”
”আপনি যখন এখানে পড়াতেন তখন আমার ছেলে ইদ্রিস কেলাস সেভেনে। ফেল করল চারটে বিষয়ে।”
সুনীতের মনে পড়ল লোকটিকে। শেখ মঞ্জিল এর নাম। এক সময় নাকি ডাকাত দলে ছিল, জমিজমা যথেষ্টই আছে। অ্যানুয়েল পরীক্ষার ফল বেরোবার পরদিনই ছেলেটাকে মারতে মারতে টিচার্স-রুমে ঢুকেছিল। ‘ধিক তোরে ধিক। মাস্টারমশায়রা অ্যাতো কষ্ট করে যত্ন নিয়ে পড়ান আর তুই ব্যাটা ভক্তিভরে তা মগজে নিলি না? বেশ হয়েছে ফেল করেছিস,… যা পরণাম কর সকলকে, বল এবার থেকে ছদ্ধাভরে পড়ালেখা করব… যা যা পায়ে ধরে…’ মঞ্জিল ছেলের পাছায় দারুণ এক লাথি কষায়। ইদ্রিস নতমস্তকে প্রস্তুতই ছিল যেন। গোলকিপারের মতো ডাইভ দিয়ে সামনেই যে দুটি পা পেয়েছিল আঁকড়ে ধরে এবং তা সুনীতেরই। হাঁ হাঁ করে উঠেছিল সে। ‘না না, ধরতে দ্যান। বলুক কেলাস এইটে মন দিয়ে পড়বে আর ফেল করবে না।’ মাস্টার মশাইদের একজন তখন বলেন, ‘ক্লাসে তুলে দেবার ক্ষমতা আমাদের নেই। কমিটির মিটিং হবে তারপর যা হয়। তুমি পাঁচ-ছ’দিন পরে এসো।’
”ইদ্রিস কী করছে এখন।”
”সে আর বলবেন না। এইট কেলাসে তো আপনারা তুলে দিলেন, তারপর ছোঁড়া মাতল ফুটবল নিয়ে। কলকাতার কেলাবে দু’বছর খেলে হাঁটু জখম করে খেলা ছাড়ল।”
”গোলে খেলত?”
”আজ্ঞে না, হাফে খ্যালত, ভালোই খ্যালত… তারপর শাদি দিলাম, এখন দুটো ব্যাটার বাপ, বসে আছে আমার ঘাড়ে কাজকম্মো নাই, বেকার। আপনে তো বড়ো কাজ করেন শুনলাম, একটা পিয়োন-বেয়ারার চাকরি করে ওরে দ্যান বাবু।”
শেখ মঞ্জিল ঝপ করে বসে সুনীতের পা চেপে ধরল। সুনীত ‘একী একী’, বলে তিন-পা পিছিয়ে গেল।
এসব ব্যাপার খুব তাড়াতাড়ি চুকিয়ে দেওয়া যায় রাজি হয়ে গিয়ে। তাড়াতাড়ি সে বলল, ”আচ্ছা দেখব’খন, তুমি বরং আমার অফিসে সামনের হপ্তায় যে-কোনোদিন ছেলেকে পাঠিয়ে দিয়ো। ঠিকানাটা মাস্টারমশায়ের কাছে রেখে যাব!”
বাদল নস্কর আসছে পিছনে জাল হাতে দুটি লোক। মঞ্জিলকে দেখে ভ্রূ কুঁচকে উঠল। তারপরেই কাঁচুমাচু মুখে বললেন, ”কিছুই পেলাম না, পুজোর সময় সব বিক্রি করলাম তো। তবে দুটো হাফ কেজি মিরগেল, কই আর গলদার বাচা…”
