”সব সময় নয়, মাঝে-মাঝে যেতেন। মা’র সঙ্গে রান্নাঘরেও গল্প করতেন, দু-একটা রান্নাও শিখে নিয়েছিলেন। মা পরে বলেছিল, ‘হিসেবি মেয়ে মেপে চলতে জানে।’ ওরা দুজন সারা বিকেল গ্রামটা ঘুরে খালের ধারে গিয়ে বসেছিল; আমিও সঙ্গে ছিলাম।”
”কী কথা বলছিল ওরা?”
”তেমনি কিছু নয়, তা ছাড়া সব কথা শুনতেও পাইনি। আমি কাছে থাকলে ওরা আজেবাজে কথা বলত। শুধু একবার কানে আসে সুনীতকাকাকে উনি বলছেন, ‘পদ্য টদ্য লেখার পক্ষে জায়গাটা ভালোই… এখানেই পড়ে থাকবে নাকি’?”
”কী বললেন তাইতে?”
”বললেন পদ্য আর লিখি না।”
”এবার যখন ওকে দেখলে কীরকম মনে হল?”
”কেমন যেন গম্ভীর অন্যমনস্ক। আমায় দেখে শুধু বললেন, ‘অনেক বড়ো হয়ে গেছ।’ তাকালেন আমার দিকে কিন্তু মনে হল কিছুই দেখছেন না। কী যেন সব সময়ই ভাবছিলেন। মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, অর্ধেকই পাকা, চোখ দুটো লাল, মনে হচ্ছিল রাতে ঘুমোননি। মা বললেন, আগের থেকে পেটটা একটু বেড়েছে। সব মিলিয়ে বুড়োটে বুড়োটে লাগছিল। দু’বার বলেছিলেন ‘বড্ড টায়ার্ড’। আমিই লেপ তোশক বার করে বাইরের ঘরে বিছানা করে দি।”
”আর কিছু?”
”ওর জামা আর প্যান্টে কাদা লেগেছিল। বললেন কেচে দিতে। আমিই সাবান দিয়ে কেচে দি। সেদিন স্কুলে আর যাওয়া হয়নি।”
সুনীত অস্বস্তি বোধ করল এইভাবে এক উদ্ভিন্ন যৌবনার দ্বারা নিজেকে পরীক্ষা করিয়ে। কথোপকথন যে ঠিক এইভাবেই হবে তার কোনো সঠিকতা নেই বটে কিন্তু এ ছাড়া আর কী বলবে! ন’বছর কতটা বুড়ো হয়েছি নাকি সেদিন ন’ঘণ্টাতেই বয়স বেড়ে গেছে। দাড়িতে হাত বুলিয়ে সে দেয়ালে তাকাল। শেয়ালদা থেকে একটা আয়না কিনে এনে ওখানে সে রেখেছিল। আয়নাটার তলার দিকে তাকালে মুখটা ফজলি আমের আঁটির মতো লম্বা হয়ে যেত।
দাড়ি যদি রাখা যায় তাহলে নিজেকে অনেকখানি আড়াল করা যাবে। ওরা নিশ্চয় আমার ছবি জোগাড় করে ফেলেছে। ড্রেসিং টেবিলের উপর যেটা আছে সেটাই নেবে। খুব বড়ো একটা গোটা মুখ, মিলিয়ে চিনে নিতে সুবিধাই পাবে। অ্যালবামেও আছে গ্রুপ ফোটোর মধ্যে। দু’বছর আগে অফিসের পিকনিক হয়েছিল উলুবেড়িয়ার ফুলেশ্বরে। জনা সাত-আটের একধারে সে দাঁড়িয়ে। তার পাশে রুবি। তারপর চিন্ময় ঘোষ আর তার বউ। অনেকেই বউ-ছেলেমেয়ে নিয়ে গেছল, সুনীত বাদে। ছবিটায় তাকে অনেক তাজা, তরুণ মনে হয়। উমা অনেকক্ষণ খুঁটিয়ে দেখে বলেছিল, ”তোমাদের এই রুবি দেখতে স্মার্ট বটে কিন্তু বয়সও অনেক হয়েছে।”
দাড়িটা রাখা দরকার। সুনীত লুঙ্গি ছেড়ে প্যান্ট পরল। পকেটে যা আছে বার করল। পাঁচদিন সে প্যান্ট পরেনি। বাদলবাবুর লুঙ্গি আর আলোয়ানেই কাজ চালিয়েছে। পার্স, ট্রেনের টিকিট, দেশলাই, চশমা, গুণেন ভবনের গেটের চাবি, আর মেরুন জমিতে ছাই রঙের চৌকো ঘরকাটা একটা রুমাল।
রুমালটা কী করে এল পকেটে। রুবি হাতে দিয়ে বলেছিল মুখটা মুছে নাও। কিন্তু তারপর কি ফিরিয়ে দেওয়া হয়নি? তখনই কলিংবেলটা বেজে ওঠে আর রুমির মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছল। তাদের দুজনের চোখাচোখি হতেই রুবি বলেছিল, বম্বে থেকে তো ওর সোমবারের ইভনিং ফ্লাইটে ফেরার কথা।
ও অর্থাৎ পঙ্কজ আচার্য, যিনি জনসন, ফোকস অ্যান্ড হাজরার পাবলিক রিলেশনস অ্যান্ড পাবলিসিটি ম্যানেজার, রুবি কাঞ্জি যার একান্ত সচিব, সুনীত যার তিনধাপ নীচের কর্মচারী, রুমির এই ফ্ল্যাটের ভাড়া যিনি দেন এবং সপ্তাহে দু-তিনদিন মধ্যরাত পর্যন্ত এখানে থাকেন।
রুমালটা যদি ওরা পায়? ওরা নিশ্চয় অফিসে যাবে, পঙ্কজ আচার্য, রুবি, চিন্ময়কে জিজ্ঞাসাবাদ করবে। রুবির রুমাল পকেটে পাওয়া গেছে সুতরাং একটু বেশি করেই ওকে জিজ্ঞাসা করবে। কী প্রশ্ন করবে?
”আপনার সঙ্গে কতদিনের আলাপ?”
”বছর চারেকের। অফিসেই হয়।”
”আপনি একা থাকেন?”
”হ্যাঁ, ঝি আছে।”
”আপনার ফ্ল্যাটে উনি কি যেতেন?”
”মাঝেমাঝে।”
”রাতে থাকতেন?”
”কোনোদিন নয়।”
”ওর সম্পর্কে আপনার কী ধারণা?”
”ভালো ছাত্র ছিল, উচ্চচাকাঙ্ক্ষা ছিল বড়ো কিছু একটা হবে। ইদানীং অসুখী অতৃপ্ত মনে হচ্ছিল ওকে। উলটোপালটা কথা বলত, অস্থির হয়ে উঠত। প্রায়ই বলত চারদিকটা কেমন একঘেঁয়ে হয়ে যাচ্ছে, শরীরে তেমন করে আর রক্ত চলাচল করছে না।”
”কখনও কি খুন করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন?”
”না।”
”খুব কি ভিতু ছিলেন?”
”পরীক্ষা করে দেখিনি। তবে প্রাণের ভয় করত না।”
”কীভাবে জানলেন?”
”আমার বাবা-মা, ভাই-বোনরা থাকে মানিকতলায়। মাসে একবার যাই টাকা দিয়ে আসতে। বোমা, গুলি ছুরির আমলের কথা। রাতে আমি যেতে ভয় পাচ্ছিলাম। সুনীত আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যায়। যখন আমরা পাড়ায় ঢুকছি ঠিক তখনই বোমা পড়তে শুরু করে। আমি পিছিয়ে আসি। সুনীত আমার হাত ধরে টানতে টানতে গলিতে ঢোকে। অচঞ্চলভাবে হেঁটে যায়। পরে বলেছিল, বিপদের মধ্যে ঢুকলে রক্ত চলাচল হয়। একঘেঁয়েমিটা কিছুটা কাটে।”
”আপনার রুমালটা কী করে উনি পেলেন?”
”বলতে পারব না, হয়তো আমি ওর টেবিলে ফেলে গেছলাম।”
এটা অবশ্যই মিথ্যা কথা। রুবি কখনও কিছু টেবিলে ফেলে যায় না, নিজের টেবিলেও নয়। তা ছাড়া আর যা বলেছে সেগুলো সত্যি। কোনো-না-কোনো সময় সুনীতকে সে কথাগুলো বলেছে। অসুখী, অতৃপ্ত, অস্থির এগুলো রুবি নিজের সম্পর্কেও তো বলত।
