বন্ধ গেটের সামনে দাঁড়িয়ে, পকেটে হাত ঢুকিয়ে চাবিটা খুঁজে পাচ্ছিল না। টিপটিপ বৃষ্টিটা তখন হঠাৎ জোরে নামল। সে এদিক ওদিক তাকাচ্ছিল অসহায়ভাবে। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো শীতল সূচ ঢোকাচ্ছে শরীরে, চটের পর্দাটা তুলে কে যেন দেখছে তাকে। সুনীত এগিয়ে গেল সেদিকে। কেন? বৃষ্টি থেকে নিজেকে বাঁচাবার জন্যই কি?
সে জানে না। এখনও সে বুঝতে পারছে না কেন হাবার ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। অন্ধকার কিছুটা চোখে সয়ে এসেছিল। দূরে গোলাপবাগান রোডের বাতি থেকে আলো চুঁইয়ে আসছে বৃষ্টিধারা ভেদ করে অতি স্তিমিতভাবে। সেই আলোয় গুণেন ভবনকে অতিকায় আবছা একটা প্রাগৈতিহাসিক জন্তুর মতো দেখাচ্ছিল।
সুনীতের আবার গোলমাল ঘটতে শুরু করে। ঝড়ের বেগে একটা দমকলের গাড়ি ঘণ্টা বাজাতে বাজাতে মাথার মধ্যে ছুটে আসছে। সে দেখতে পাচ্ছে শুধু দুটো হেডলাইট, সাদা দুটো বিন্দুর মতো।
আর একটু ঝুঁকে সে ভালো করে তাকাল। মুখে ভাতের গন্ধ, সর্ষের তেলের গন্ধ, চ্যাপটা নাক, পুরু ঠোঁট এইসব নিয়ে চৌকো মুখের মাঝখানে বড়ো বড়ো গোল চোখ দুটোর সাদা অংশ স্থির হয়ে আছে। কালো মণি দুটো এক একবার ছড়িয়ে গিয়ে সাদাকে ঢেকে দিয়েই আবার গুটিয়ে আসছে। সুনীত হুমড়ি খেয়ে পড়ল দু’হাতে হাবার বউকে মেঝেয় ফেলে দিয়ে।
আঁকড়ে ধরেছিল হাবার বউ তার দুটি কাঁধ। ওর দ্রুত নিশ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে ওঠানামা করছে বুক। ও যখন কামড়ে ধরে সুনীতের ঠোঁট চুষছিল তখন সে মা’র বুকে হামলাকরা কুকুরছানার কুঁইকুঁই শব্দের মতো কিছু একটা শুনতে পাচ্ছিল। তখন সে ধীরে ধীরে ওর নিটোল স্তনে দুটি হাত রাখে।
সেই সময়ই হাবা তার পিঠের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে…।
”কে, কে, কে ওখানে?”
সুনীত ধড়মড়িয়ে উঠে বসল। ঘুম ভাঙার পর চেতনায় ছড়ানো কুয়াশার মতো তন্দ্রায় স্নায়ুকোষগুলি তখনও স্তিমিত। তার মনে হচ্ছিল, ড্যাবড্যাবে দুটো চোখ তার দিকে এগিয়ে আসছে। কার চোখ সে বুঝতে পারছিল না।
”কাকাবাবু আমি, চা এনেছি।”
সুনীত অপ্রতিভ বোধ করল। শুভ্রার হাত থেকে চায়ের কাপ নেবার সময় তার মনে হল মেয়েটি তাকে নিবিষ্টভাবে লক্ষ করছে।
”স্বপ্ন দেখছিলাম… বাবা উঠেছে?… সেই ডান দিকের শিংভাঙা গোরুটা আছে?”
কথাগুলো বলেই সুনীত বুঝতে পারল বোকার মতো সে অপ্রতিভতা কাটাতে চাইছে। স্বপ্ন দেখাটা, চেঁচিয়ে ওঠার কারণ হতে পারে না; গ্রামের মানুষ ভোরেই বিছানা ত্যাগ করে সুতরাং জিজ্ঞাসা করাটা অহেতুক; গোরু সম্পর্কে আগ্রহ প্রকাশ ঘুম থেকে উঠেই! শুভ্রার জন্য লক্ষ করার টোপ তো সে নিজেই দিয়েছে।
”বছর দুই হল মরে গেছে, এখন যেটা দেখছেন সেটা ওর মেয়ে। বাবা জাল ফেলাচ্ছে বড়ো পুকুরে দেখে আসুন না।”
সুনীত বালিশের তলা থেকে হাতঘড়ি বার করল।
”সাড়ে ছ’টা বেজে গেছে!”
শুভ্রা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। সে জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল। ধীরভাবে গ্রামটি সক্রিয় হয়ে উঠছে কিন্তু তার সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। জামগাছের পাতাগুলো বৃষ্টিতে ধুয়ে গাঢ় সবুজ, আকাশ মেঘলা। বৃষ্টি থেমে গেছে। একটা কাঠবেড়ালি পাঁচিলের উপর দিয়ে লাফাতে লাফাতে চলে গেল। এসবই সে বিনা চশমায় ঝাপসাভাবে বুঝল। কলকাতায় সে এইসময় চা এবং খবরের কাগজের অপেক্ষায়। সাতটার আগে খবরের কাগজ এই গ্রামে পৌঁছয় না।
হয়তো আজকের কাগজে খবরটা বেরিয়েছে। কিংবা না-ও বেরোতে পারে। অতি তুচ্ছই ঘটনা, এমন ব্যাপার প্রতিদিন কলকাতায় আট-দশটা ঘটছে। সবই কি বেরোয়?
কী ভাবল শুভ্রা, কিছু কি অনুমান করল? সন্দেহ? যদি ওরা জিজ্ঞাসা করে, কী সাক্ষী তাহলে দেবে?
”সাড়ে ছ’টায় চা দিতে যাই।”
”অস্বাভাবিক কিছু দেখেছিলে?”
”কেমনভাবে যেন ‘কে কে ওখানে’ বলে চেঁচিয়ে ওঠেন।”
”তাতে কী মনে হল?”
”স্বাভাবিক মানুষ ওরকমভাবে চেচিয়ে ওঠে না।”
”কী মনে হল?”
”কেউ যেন ওকে তাড়া করছে তাই লুকোবার জন্য জায়গা খুঁজছেন আর বারবার পিছনে তাকাচ্ছেন। প্রথম থেকেই দেখেছি উনি মানুষ এড়িয়ে যাচ্ছিলেন, ঘর থেকে বেরোতেনই না। বলতেন, চশমা নেই, সর্দিকাশির ধাত।”
”কে কে ওখানে বলে চেঁচালেন কেন?”
”স্বপ্ন দেখেছিলেন বললেন।”
”কী স্বপ্ন?”
”বলেননি, তবে মনে হল লজ্জা পেয়েছিলেন চেঁচিয়ে।”
”ওকে প্রথম দেখে কেমন লেগেছিল? ন’বছর আগে যেমন দেখেছিলে, সেই লোকটিই কি?”
”তখন আমার বয়স সাত-আট বছর ছিল। শুধু মনে আছে এখনকার থেকে আরও ফরসা, আরও ছিপছিপে ছিলেন, মাথায় অনেক চুল ছিল। অনেকটা… অনেকটা সিনেমায় নামবার মতো চেহারা ছিল। মজার মজার গল্প বলে আমাকে বাবাকে হাসাতেন। মা কখনও ওর সামনে আসত না। পোস্ত আর ট্যাংরামাছ ভালোবাসতেন। হাসিখুশিই ছিলেন, স্কুলের স্পোর্টসে দৌড়তে দেখেছি, গানের সুন্দর গম্ভীর গলা, মাঝে মাঝে গাইতেনও। আমাকে ‘মন মোর মেঘের সঙ্গী’ গানটা শেখাবেন বলেছিলেন কিন্তু শেখাননি, তারপরই চলে যান। হ্যাঁ, প্রতি শনিবারই কলকাতায় যেতেন। একবার একজন মেয়ে… মহিলা, শুনেছিলাম অফিসে চাকরি করেন, সুনীতকাকুর সঙ্গে বিয়ে হবে, তিনি এখানে এসে দু’দিন ছিলেন, নাম উমা।”
”কোথায়, ওর ঘরে?”
”না না, আমাদের ঘরেই রাতে ছিলেন, আমি, মা আর তিনি একসঙ্গে খাটে শুয়েছিলাম।”
”আর অন্য সময় তিনি কি ওর ঘরেই কাটাতেন!”
