ঘুমের জন্য প্রবল সেই ইচ্ছাটা গত পাঁচ দিন তাকে ফেউয়ের মতো তাড়া করে আছে। এই ঘরের বাইরে সে কদাচিৎ বেরিয়েছে। বাড়ির বাইরে গেছে তিন-চারবার। তার পুরনো সহকর্মীদের মধ্যে শরৎ মুখুজ্জে এক সন্ধ্যায় দেখা করতে এসেছিল। টিপটিপ বৃষ্টি আর ঠান্ডা লাগার ভয়ের ভান করে সে ঘরের মধ্যেই রয়ে গেছে।
ন’বছর আগে বকরিহাটি হাই স্কুলে পাঁচ মাসের জন্য সুনীত শিক্ষকতা করেছিল। তখন থাকত বাদল নস্করের এই ঘরটিতেই। তেইশ বছর মাস্টারি করে বাদলবাবু এখন অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টার। বেঁটে চেহারাটা গোলগাল হয়েছে, টাক পড়েছে পিছন দিকে, চুল পেকেছে। সুনীতের প্রথমে অসুবিধা হয়েছিল ওকে চিনতে।
মিষ্টির দোকানের বাইরে ঝাঁপটার নীচে দাঁড়িয়ে সে ছাত্রদের দেখছিল। একজনকেও সে চিনতে পারল না। তিনজন শিক্ষককে চিনল। একজন দোকানে এসে একটা টাকা ভাঙিয়ে নিয়ে গেল। তখন একবার সুনীতের দিকে তাকিয়েছিল। সে তখন অস্বস্তি বোধ করেছিল প্যান্ট ও শার্টে লেগে থাকা কাদার জন্য।
নিশ্চয় ওরা জানতে পারবে একদা এই স্কুলে পড়াতাম। খোঁজ নিতে আসবে। তখন লংক্লথের পাঞ্জাবি পরা, বোধহয় বিপুলবাবু এর নাম… এই বিপুলবাবু বলবে, ”সোমবার সকালে গোপালের দোকানের সামনে একজনকে দেখেছিলুম বটে। হ্যাঁ, অনেকটা যেন সুনীতবাবুর মতোই লেগেছিল। তবে যেরকম ফিটফাট থাকতেন সেরকম তো লোকটা ছিল না। কেমন যেন উসকোখুসকো, মুখটা শুকনো, প্যান্ট-জামায় কাদা, চোখে চশমাটাও ছিল না। তাই বুঝতে পারিনি যে উনিই… ন’বছর আগের দেখা তো। তা ছাড়া উনি তো আমাদের সঙ্গে খুব একটা কথাবার্তা বলা কি মেলামেশা করতেন না। ক্লাস না থাকলে টিচার্স রুমের এককোণে বই মুখে দিয়ে বসে থাকতেন। ঘণ্টা পড়লেই ক্লাসে যেতে এক মিনিটও দেরি করতেন না। না…, ছাত্রদের কখনও মারতে বা বকতেও দেখিনি। হি ওয়াজ এ গুড টিচার, আইডিয়াল টিচার, একটু আত্মম্ভরী হলেও, এ গুডম্যান।”
সুনীত ঠিক করে বকরিহাটে এসে পড়ে ভুল করেছে, এখুনি ফিরে যাওয়াই ভালো। এবং কোথায় সে যেতে পারে, এই ভাবনাটা যখন তার মাথার মধ্যে কুরে-কুরে গর্ত তৈরি করছে তখনই পাশ থেকে শুনল, ”কী আশ্চর্য সুনীতবাবুই তো!”
অথচ বাদল নস্কর তার সামনে দিয়েই স্কুলের দিকে হেঁটে গেছে। তারপর ফিরে এসে কথাটা বলেছিল।
”ভেবেছিলাম চিনতে পারবেন না। স্টেশন থেকে বেরিয়েই রাস্তায় পিছলে পড়ে দেখেছেন কী অবস্থা হয়েছে, চশমাটাও ভেঙেছে। যাক তাহলে চিনতে পেরেছেন।”
”না পারার কী আছে, আপনাকে যে দেখবে সেই মনে রাখবে।”
শুনেই সিঁটিয়ে গেছল সুনীত। কেউ মনে রাখুক এখন সে তা চায় না।
”এখানে দাঁড়িয়ে কেন, স্কুলের ভিতরে আসুন। দেখবেন কত বদলে গেছে, সে-স্কুল আর নেই। দেখছেন তো দোতলা হয়েছে, ও-ধারটায় ল্যাবরেটরি। আসুন আসুন।”
”না না বাদলবাবু এভাবে এই কাদামাখা অবস্থায়… পরে দেখব। স্ত্রীকে বারাসাতে বাপের বাড়ি পৌঁছে দিয়ে ভোরের ট্রেনেই শেয়ালদায় নেমে ভাবলাম সাত দিন তো ছুটি নিলাম, ঘরেও কেউ নেই তাহলে এখন কী করা যায়! স্টেশনে দাঁড়িয়ে ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মনে পড়ল বকরিহাটিকে, আপনাকে। অনেকদিন প্রায় ন’বছর আপনাকে দেখিনি।”
বাদলবাবু ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে।
”য়্যাঁ, আমায় মনে পড়ল! কী আশ্চর্য। থেকে যান তাহলে ছুটির ক’টা দিন আমার বাড়িতে। না না, কোনো কথা শুনব না, দাঁড়ান স্কুল থেকে চট করে ঘুরে আসি, দু’মিনিট।”
সুনীত আবার তখন ভেবেছিল, এই ফাঁকে চলে যাই। কিন্তু কোথায় যাব? স্টেশন থেকে বেরিয়েই পিছলে পড়ায় কাদা লেগেছে বলাটা বোধহয় বোকামি হল। স্টেশন থেকে স্কুল পর্যন্ত পিচের রাস্তায় কোথাও কাদা নেই।
অপ্রত্যাশিত আচমকাই ঘটেছিল। সেজন্য কোনো প্রস্তুতি বা পরিকল্পনা ছিল না। নিয়তি বা দৈবের হাত ছিল কি না তা সে জানে না। কখনও সে কোষ্ঠীঠিকুজি, তাবিজ মাদুলিতে বিশ্বাস করেনি। ঈশ্বর সম্পর্কে তার কোনো মতামত নেই।
গুণেন ভবনের গেটের আলোটা নেভানো। রাত তখন অন্তত দেড়টা। গেটে তালা দেওয়া, তার একটা করে চাবি সব ফ্ল্যাটেই আছে। সুনীত কিছুক্ষণ আগেই ট্যাক্সিওয়ালার সঙ্গে ঝগড়া করেছে। এত রাতে গোলাপবাগান রোডে ট্যাক্সি নিয়ে সে ঢুকবে না। ঢুকতেই হবে। পয়সা দোব যখন যাবে না কেন?
বৃষ্টি আর ঠান্ডার জন্য পথে একটি লোকও ছিল না। পানের দোকানটারও ঝাঁপ বন্ধ। সুনীত ঠিক করে ফেলে ট্যাক্সি থেকে নামবে না। ”থানায় চলো”, সম্ভবত এই কথাটাই বলেছিল।
ট্যাক্সিওলার সঙ্গীটি তখন, ”নিকুচি করেছে মাতালের,” এই বলে দরজা খুলে গলার কাছে জামাটা ধরে হিঁচড়ে তাকে নামায়। লোকটা চড় মেরেছিল। তখন সুনীতের ছড়ানো ঝাপসা দৃষ্টি ধীরে-ধীরে সংকুচিত হয়ে জমাট এবং তীক্ষ্নতা লাভ করে। টলুনি থেমে যায়।
ট্যাক্সিটা চলে গেল। ঘুম হয়ে সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। অপমানের জ্বালাটা আবার সে অনুভব করতে শুরু করে। গত ছ’ঘণ্টার মধ্যে দু’বার ঘটল। এবারের অপমানটা চড় খাওয়ার জন্য নয়। ভাড়া না নিয়েই ট্যাক্সিটা চলে গেল। অন্তত দশ টাকা পাওয়া হয়েছিল। ট্যাক্সিওয়ালারা গরিবই হয় তবু টাকাটা ছেড়ে দিল। এটা কি অনুগ্রহ, দান, তাচ্ছিল্য, অবহেলা… সুনীতের মাথার মধ্যে বাষ্পের মতো ঝাঁঝালো একটা রাগ কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠল। রাগটা তাকে ঠেলতে ঠেলতে এগিয়ে আনল গুণেন ভবনের কাছে।
