”এদিকটায় নতুন করে আবার অ্যাকটিভিটিজ শুরু হয়েছে।”
ইনস্পেকটার চলে যাবার পর সুবল তোয়ালেটা উমার হাতে দিয়ে বলল, ”মাথাটা মুছে নাও।”
উমার মনে হচ্ছে সচরাচর যেভাবে কাজ করে থাকে মস্তিষ্কটা সেইরকমভাবে আর কাজ করছে না। গত পঁয়তাল্লিশ মিনিটে এমন একটা পরিবেশ তার চারধারে গজিয়ে উঠেছে যেখানে যুক্তির পারম্পর্য নেই, কথাবার্তাগুলোও আগের মতো অর্থ বহন করছে না বা জিনিসপত্রের চেহারাও যেন বদলে গেছে। সে দুঃখিত বা অভিভূত নয়, ক্রুদ্ধও নয়। বরং নিজের পরিচয় হারিয়ে ফেলার মতো অনুভূতিটাই বেশি। এখন সে নিজের গায়ে চিমটি কেটে নিশ্চিত হবার জন্য দেখতে পারে সত্যিই সে উমা মুখার্জি কি না।
বৃষ্টি হঠাৎ আবার জোরে নামল। সুবল ব্যস্ত হয়ে ঘরে এসে জানলা বন্ধ করতে করতে তোয়ালে হাতে দাঁড়িয়ে থাকা উমাকে বলল, ”তোমাদের ছেলেপুলে থাকলে ভালো হত।”
অন্যমনস্কের মতো মাথা নেড়ে কথাটার অর্থ বোঝার জন্য উমা ধীরে ধীরে আবার খাটের উপর বসল।
দুই
সুনীত স্বপ্ন দেখছিল-এবং সে তা জানে-কিন্তু জানে না কীসের স্বপ্ন।
এমনভাবে মনের উপর দিয়ে পিছলে যাচ্ছিল বিভ্রান্তিকর বিশৃঙ্খল ছবিগুলো, এত দ্রুত চলে যাচ্ছিল যে কোনোভাবেই সে একটিকে ধরে রাখতে পারছিল না। একটিরও পরিচ্ছন্ন স্পষ্ট রূপ সে মনে রাখতে পারেনি।
তার আবার এইরকম ঘটল। ঘুম ভাঙার পর সে বলতে অক্ষম কী নিয়ে স্বপ্ন দেখছিল। আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল ছবিগুলোকে স্পষ্টভাবে দেখার জন্য এবং তাই করতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠে নিজেকে প্রায় নিঃশেষ করে তুলেছিল ঘুমের মধ্যে। ছবিগুলোর মধ্যে এমন কিছু তাৎপর্য নিশ্চয়ই প্রচ্ছন্ন আছে যেটা তাকে মূল্যবান সূত্র ধরিয়ে দিতে পারত এবং তাই ভেবে ধীরে-ধীরে সে মনমরা হয়ে যাচ্ছে।
স্বপ্নের একমাত্র যে ব্যাপারটি সে মনে করতে পারছে… কিন্তু সে কীভাবে যে কথাগুলোকে সাজিয়ে প্রকাশ করবে তা ঠিক করতে পারছে না। একটাকেও সঠিক মনে হচ্ছে না। মনের মধ্যে যতই নাড়াচাড়া করছে, শব্দ ও বাক্যগুলো ততই পরস্পরের বিরোধিতা করতে করতে গুটিয়ে যাওয়া ছিটিয়ে পড়া এক ধরনের ঝাঁঝালো রাগ তৈরি করছে। এমন ধরনের রাগ যাতে আক্রমণের মেজাজ নেই, যেটা মানুষের জগতের থেকেও বেশি করে নির্গত হয় জড়বস্তুর এবং বহু দূরে দেখতে পাওয়া ঝাপসা দৃশ্যাবলির অচেতন জগৎ থেকে।
তার স্বপ্নের মধ্যে কোনো মানুষ ছিল কি? হয়তো ছিল। থাকলে নিশ্চয় তাদের মুখ ছিল না। তার আরও চেষ্টা করা উচিত ছিল। তাহলে ভাসা-ভাসা ছবিগুলোর মধ্যে থেকে জমাট স্পষ্ট কিছু একটা বার করতে পারত। এই অক্ষমতাটা বুঝে ওঠার পর থেকেই সে মনমরা হতে শুরু করে।
সুনীত এবার সচেতন হল সময় সম্পর্কে। আধা-ঘুমে আধা-জাগরণের মধ্যে সে ঘরের বাইরে মাটির উঠোনে ঝাঁট দেওয়ার শব্দ পাচ্ছে। দরজার কাছে এসে কেউ ফিরে গেল। সম্ভবত বাদলবাবুর বড়োমেয়ে শুভ্রা। জানলার বাইরে বাছুর ডাকল। সুনীত অপেক্ষা করল আর একটা ডাক শোনার জন্য। বাড়ির ভিতর দিকের গোয়াল থেকে সেটা ভেসে এল। সে হাসল। কাত হয়ে দরজা দিয়ে তাকাল। সামনেই পলেস্তরা খসা জীর্ণ ইটের পাঁচিল। বাড়িটা পাঁচিলে ঘেরা।
পাঁচিলের মাথায় ছোট্ট ঝোপ। সুনীত বুঝতে পারছে না ওটা কীসের ঝোপ। চশমাটা প্যান্টের পকেটে রয়েছে। ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে ঝুলছে তার প্যান্ট-শার্ট। চশমার একটা কাচ নেই, ওটা চোখে পড়লে লোকেরা মুখের দিকে তাকাবে, অবাক হবে এবং মনে করে রেখে দেবে।
ওরা যদি জিজ্ঞাসা করে? ধরা যাক স্টেশনের টিকিট কালেক্টার যে অত সকালেও প্ল্যাটফর্মের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে টিকিট সংগ্রহ করছিল। মুখের দিকে তাকায়নি বললেই চলে। কিন্তু এককাচ-ভাঙা চশমা দেখলে নিশ্চয় কৌতূহলী হত। সাক্ষীর কাঠগড়ায় লোকটা কী বলত?
”ফার্স্ট ট্রেনে উইকডেজে বিশেষ করে সোমবারে খুব কম লোকই কলকাতা থেকে আসে। রোববারে একটু ভিড় হয়, মাছটাছ মারতে অনেকেই আসে। …না আমি সচরাচর মুখটুখ অত লক্ষ করি না কিন্তু অচেনা অপরিচিত লোকের চশমার একটা কাচ ভাঙা দেখে একটু যেন কেমন লাগল।”
”কেমন লাগল?”
”এককাচ-ভাঙা চশমা তো কেউ পরে না, তাই। তা ছাড়া চোখ ফুলোফুলো, লালও হয়েছিল, যেন সারারাত ঘুমোয়নি। প্যান্টের তলার দিকে কাদা, জামার কাঁধে, বুকের কাছেও কাদা।”
চোখ দুটো ফুলো-ফুলো এবং লাল হাওয়াটা বাদলবাবু প্রথমেই লক্ষ করেছিলেন, জামা-প্যান্টের কাদাও।
সুনীত স্টেশনের বেঞ্চে সময় কাটিয়ে বকরিহাটি হাই স্কুলের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল। টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছিল। শীত করছিল খুব। স্কুল ফটকের পাশেই গোপালের মিষ্টির দোকান। বাঁশের ঠেকনোয় তুলে রাখা ঝাঁপটার নীচে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে সে কাঁপছিল। দোকানের মধ্যে উনুনে বড়ো একটা কড়াই চাপানো, সেটাকে বেড় দিয়ে লাল আগুনের গনগনানি। লোভীর মতো সুনীত দোকানে ঢুকে উনুনের কাছের বেঞ্চটায় বসে। গায়ে ময়লা গেঞ্জি, রুগণ একটি ছেলে কাছে এসে দাঁড়ায়।
কতগুলো শিঙাড়া নিমকি আর কাঁচাগোল্লা সে খেয়েছিল মনে নেই। পকেটে সাতাত্তর টাকা আর কিছু খুচরো ছিল। উনুনের ওমে শরীরে সাড় ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে খিদেও ফিরে আসে। তখন ক্লান্তিতে তার চোখ জুড়ে আসছিল। ঘুমোতে চেয়েছিল সে, দিনের পর দিন ঘুমিয়ে থাকতে ইচ্ছে করছিল।
