ইনস্পেকটার নিজেই জানলাটা খুলল। কপালটা গরাদে চেপে মাথাটা কাত করে কত দূর পর্যন্ত দেখা যায় সেটা পরিমাপ করতে লাগল। উমার মনে পড়ল ঠিক এইভাবেই সুনীতকে সে বহুদিন দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছে জায়গাটায়। পুরুষরা বহু ব্যাপারে একই ভঙ্গি নেয়।
”এখান থেকে দেখছি সারা মাঠটাই দেখা যায়…আপনার স্বামী কি মদ খান?”
”না তো।”
”কখনও খাননি? ঘরে বসে একটু আধটু বা বাইরে থেকে খেয়ে কখনও আসেননি।”
”না।”
ইনস্পেকটার র্যাক থেকে দু’খানা মোটা বই বার করে ফাঁকা জায়গাটার দিকে আঙুল তুলল। ফ্যাকাশে হয়ে গেল উমার মুখ।
ইনস্পেকটার সন্তর্পণে বোতলটা বার করল।
”হোয়াইট হর্স, প্রায় অর্ধেক খালি।” ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখে, বোতলটা যথাস্থানে রেখে সন্তর্পণে ফাঁকা জায়গাটা ভরাট করে দিল বই দুটি দিয়ে।
”আপনি খান?”
”না।”
”আপনাদের দুজনের মধ্যে সম্পর্কের কি কোনো রকমের হেরফের ঘটেছে, মানে প্রাইভেট লাইফ এখনও কি আগের মতোই আছে?”
উমা ধাক্কাটা কাটিয়ে উঠতে পারছে না। এই লোকটি নিঃশব্দে তাকে মিথ্যাবাদী প্রমাণ করে দিয়েছে। বুকের ভিতর হঠাৎ শূন্য বোধ করায় বা মাথার মধ্যে অসাড় হয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা সে এমন করে কখনও পায়নি। তার যাবতীয় ব্যক্তিত্ব এখন চুরমার। সুনীতের চরিত্র সম্পর্কে ভালো একটা ধারণা লোকটাকে দেওয়া ছাড়া তার আর কোনো উদ্দেশ্য ছিল না। ধীরে ধীরে সে খাটের উপর বসল।
”বোতলটা যে ওখানে আছে, বিশ্বাস করুন আমি তা জানতাম না। হ্যাঁ প্রায়ই খান, বাড়িতেও বাইরেও!”
ইনস্পেকটারের চোখ দুটো ঠান্ডা স্থির। গলার স্বরও বদলে গেছে।
”কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সক্রিয় সম্পর্ক আছে কি না, কোনো মতবাদ সমর্থন করেন কি না, এবার কি সত্যি কথাটা বলবেন?”
উমা মাথা নাড়ল।
”নেই। যতদূর জানি নেই। এত বছর তো দেখছি, ও সত্যিই ঘেন্না করে, ডান-বাম অহিংসা-হিংসা সব রাজনীতিকেই। জীবন থেকে ও সরে গেছে গত পাঁচ-ছ’বছর, নিছক যান্ত্রিক ওর প্রাইভেট লাইফ, আমাদের দুজনের সম্পর্কও।”
দুজনে কয়েক সেকেন্ড চোখে চোখ রাখল। বিভ্রান্ত ও কঠিন দু’জোড়া চাহনির মাঝখান দিয়ে ঠান্ডা একঝলক বাতাস বয়ে গেল।
”ছবিটা আপনার স্বামীর?”
ড্রেসিং টেবিলে স্টিল ফ্রেমে বাঁধানো মুখোমুখি দুটি ছবি। সুনীত ও উমার।
”হ্যান্ডসাম… কত বছর আগে তোলা?”
উমার ছবিটি এবং তার এখনকার চেহারার সঙ্গে মিলিয়ে দেখে যে-কেউই প্রশ্নটা করতে পারে।
”বিয়ের পরেই তোলা, প্রায় ন’বছর আগে।”
”চশমার পাওয়ার কত, প্লাস না মাইনাস?”
”দু’বছর আগে আরশুলা রঙের মোটা ফ্রেম করায়, কাচও বদলায়, নতুন পাওয়ার কত জানি না, আগে ছিল মাইনাস ফোর পয়েন্ট টু ফাইভ।”
ফ্রেম থেকে সুনীতের ছবিটা খুলে নিল ইনস্পেকটার।
”এটা আমি নিচ্ছি।”
হঠাৎ উমা ফিসফিসিয়ে বলল, ”অসম্ভব, অবাস্তব… সুনীত খুন করেছে ওই হাবাকে তাও কিনা পলিটিক্যাল মোটিভে, হাস্যকর।”
ইনস্পেকটারের ভ্রূ জোড়া কুঁচকে উঠেই ছড়িয়ে পড়ল পাতলা হাসিতে। সুবল চা নিয়ে এসেছে। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে চুমুক দিল। জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আপন মনে বলল, ”শীতটা তাড়াতাড়িই এল তাহলে।” দাঁড়িয়ে থাকা সুবলের দিকে ভ্রূকুটি করল। পায়ে পায়ে সুবল ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
”নানান দিক থেকে সন্দেহ আমরা করবই। পলিটিক্যাল মার্ডার যে এটা নয় তা আমরা বুঝি। তাহলে কীজন্য লোকটা খুন হল? ওর সম্পত্তি বা টাকাকড়ি নেই, টি-বিতে ভুগছিল, থাকার মধ্যে একটা বউ…।”
”সুনীতকে কেন সন্দেহ?”
”মাঠের চা-ওয়ালাটা দোকানেই রাতে ঘুমোয়। রোববার রাতে ওর ঘুম ভেঙে যায় শব্দ শুনে। কেউ যেন হাঁসফাঁস করছে, ঝটাপটি হচ্ছে বলে ওর মনে হয়, এরপর শক্ত জায়গায় লাঠি ঠোকার মতো দু-তিনটে শব্দ আর চাপা চিৎকার। ছ্যাঁচা বেড়ার দেয়ালের ফাঁক দিয়ে চা-ওয়ালাটা তখন দেখে একটা লোক মাঠের মধ্যে, নিচু হয়ে কী একটা কুড়োল তারপর মাঠ থেকে ছুটে এসে ওর দোকানের গা ঘেঁষে দাঁড়াল। বৃষ্টি পড়ছিল, রাস্তার আলোটা টিমটিমে আরও দূরেও তাই চিনতে পারল না। তখন ও ”কে কে” বলে চেঁচিয়ে ওঠে। লোকটা চ্যাঁচানি শুনেই এধার ওধার তাকিয়ে গোলাপবাগান রোড ধরে দক্ষিণ দিকে ছুটতে শুরু করে। ওদিকটা অন্ধকার, বাড়িও কম। চোখে চশমা ছিল কি না, চা-ওয়ালা তা বলতে পারেনি তবে ডেডবডির কাছে চশমার একটা লেন্সের টুকরো পাওয়া গেছে, পাওয়ার টেস্ট করতে পাঠানো হয়েছে।”
একচুমুকে চাটুকু শেষ করে ইনস্পেকটার আর একবার ঘরের আসবাবে চোখ বোলায়। হাতের নোটবইটায় চোখ বোলাল।
”আপনার স্বামী কত টাকা সঙ্গে নিয়ে বেরিয়েছিলেন?”
”বলতে পারব না, তবে সাধারণত পঞ্চাশ-ষাট টাকা সঙ্গে রাখে।”
”ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট আছে?”
”এই মোড়েই স্টেট ব্যাঙ্কে, আমাদের জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট।”
”ওটা কীসের দরজা?”
”একটা ছোটো ঘরের মতো, মালপত্র রাখার জায়গা।”
”একবার দেখব।”
ইনস্পেকটার আলনাটা টেনে সরিয়ে ছিটকিনি নামাল। পাল্লা দুটো ধাক্কা দিয়ে খুলতে হল। ঘরের যতটুকু আলো পড়েছে তাতে দেখা গেল ভাঙা বেতের চেয়ার, পুরনো ট্রাঙ্ক, পাকিয়ে দড়ি বেঁধে রাখা লেপ, নারকেল দড়ির বান্ডিল, ছেঁড়া শতরঞ্চি, খালি বোতল। দেশলাই জ্বেলে জায়গাটা দেখে ইনস্পেকটার নিজেই দরজাটা বন্ধ করল।
