”উনি কি কোনো রাজনৈতিক দলে আছেন, মানে কোনো রাজনৈতিক মতবাদে…”
উমা একটু জোরেই মাথা নাড়ল।
”কোনোদিন নয়। রাজনীতি ওর কাছে ভীষণ বিরক্তকর ব্যাপার। ইলেকশনের সময় সামনের মাঠে মিটিং হবে শুনলেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতেন। প্রায়ই বলতেন এত অশিক্ষিত এত দরিদ্র দেশে পার্লামেন্টারি ডিমোক্রেসি একটা ঢলঢলে জামার মতো আমাদের গায়ে ঝুলছে। আমাদের প্রয়োজন অনুসারে আমাদের পলিটিক্যাল সিস্টেমটা মাপজোক করে বানানো হয়নি।”
”তার মানে উনি কি এখনকার এই সিস্টেমটা বদলাবার পক্ষপাতী?”
”আমি ঠিক বলতে পারব না। হয়তো বদলাবার পক্ষেই।”
”কীভাবে, ভায়োলেন্স দিয়ে? খুন করে… শ্রেণি শত্রুদের উৎখাত করে?”
উমা সচেতন হয়ে উঠল প্রশ্নের ধরনে। এসব কথা কেন? তার সঙ্গে রাজনীতির আলোচনা করতে কি এই কনকনে ঠান্ডায় লালবাজার ইনস্পেকটার পাঠিয়েছে।
”পাশের ফ্ল্যাটের পুলক দত্ত ছেলেটিকে কারা খুন করে যায় শুনেছেন কি কিছু সে সম্পর্কে?”
”না।”
”ওর সঙ্গে আলাপ ছিল আপনাদের?”
”সামান্যই।”
”আপনার স্বামী ওর সঙ্গে কি রাজনীতি নিয়ে কথা বলতেন?”
”কখনও শুনিনি বা দেখিনি, তা ছাড়া ছেলেটা নেহাতই বাচ্চচা।”
”আপনার বয়স কত?”
”তেত্রিশ।”
”আপনার স্বামীর?”
”সাঁইত্রিশ-আটত্রিশ।”
”ক’বছর বিয়ে হয়েছে?”
”নয়।”
”লাভ ম্যারেজ?”
”হ্যাঁ।”
”সন্তান?”
”নেই।” একটু থেমে, ”আমরা চাই না।”
ভ্রূ কোঁচকাল। উত্তরটা যেন মনঃপূত হয়নি।
”আপনাদের পড়াশুনো?”
”আমি এম এ ফিলজফিতে, ও ইকনমিক্সে পড়তে পড়তে ছেড়ে দেয় ফিফথ ইয়ারেই, হাই সেকেন্ড ক্লাস ছিল অনার্সে।”
”কেন ছাড়েন?”
”অর্থনৈতিক কারণে। স্কুলে চাকরি নিয়ে চলে যান জয়নগরের দিকে একটা গ্রামে। মাস চার-পাঁচ পড়িয়েছিলেন?”
”তারপর।”
”এখন যে অফিসে। জনসন ফোকস অ্যান্ড হাজরা লিমিটেড, ইলেকট্রনিক্স আর ইলেকট্রিক্যাল জিনিসপত্র তৈরির কোম্পানি। পাবলিক রিলেশনসে আছেন।”
”চৌরঙ্গির হেড অফিসে?”
উমা মাথাটা কাত করল।
”আপনাদের আলাপ, বিয়ের কতদিন আগে?”
”চার বছর আগে, টাইপ স্কুলে।”
ইনস্পেকটার নোটবই থেকে চোখ তুলে আর কী প্রশ্ন করবে ভাবার জন্য দালানে রাখা ফ্রিজটার দিকে তাকিয়ে রইল।
”আপনারা দুজনে রোজগার করেন, সচ্ছলই।”
উমা শুকনো হাসল।
”কিন্তু আপনি কেন এসেছেন বুঝতে পারিছ না।”
”মার্ডারটা সম্পর্কে খোঁজখবর করতে।”
”ওই হাবাটার খুনের…।”
উমা বিস্ময়ে কথা শেষ করতে পারল না।
”পুলককে যারা মার্ডার করে তাদের বাধা দিতে গেছল এই হাবা একটা বাঁশ নিয়ে।”
”কিন্তু সে তো দু’বছর আগে! এতদিন পরে রিভেঞ্জ নেওয়া? কী লাভ তাতে, লোকটা রুগণ দুর্বল নিরীহ, ভীষণ গরিব।”
ইনস্পেকটারকে স্পষ্টতই বিব্রত দেখাল।
”হয়তো ওর পলিটিক্যাল কানেকশনস ছিল। সবই অনুমান। হয়তো আপনার স্বামীরও পলিটিক্যাল কানেকশনস আছে। আপনি তা জানেন না বা জেনেও চেপে যাচ্ছেন। দুটো ঘটনাই একই সময়ের-হাবার খুন আর সুনীত মুখার্জির নিরুদ্দেশ।”
”তার মানে! ও খুন করেছে হাবাকে। কেন, কী উদ্দেশ্যে? ভিখিরি বললেই হয়, ওকে খুন করে লাভ?”
”খুনটা আপনার স্বামীরই কাজ এমন কথা বলিনি। শুধু বলেছি কোয়েন্সিডেন্সটা অদ্ভুত-খুন আর নিরুদ্দেশের। আচ্ছা, ওর প্রাইভেট লাইফ সম্পর্কে কিছু জানেন?”
”কার, হাবার?”
”আপনার স্বামীর।”
”ওর প্রাইভেট লাইফ, তা তো আমার সঙ্গেই…”
”না না, বাইরের জীবন সম্পর্কে…”
ইনস্পেকটার অপ্রতিভ হয়ে একটা বিস্কুট তুলে নিল।
”কিছুই জানি না। খুবই কম কথা বলেন ঘরে কিংবা বাইরে। এক সময় কবিতা লিখতেন, আট-ন’বছর আগে একদমই ছেড়ে দেন। একটা বই নিজের টাকায় বার করেছিলেন তার একটা কপিও নিজের জন্য রাখেননি।”
”কেন লেখা ছাড়লেন?”
”বহুদিন আগে কথাপ্রসঙ্গে একবার বলেছিলেন, ছন্দটন্দ মেলাতে পারলেই তো আর কবি হওয়া যায় না। যা নই তার পিছনে সময় নষ্ট করে লাভ?”
”অনেস্ট ম্যান। বন্ধু-বান্ধব কারা?”
”বোধহয় কেউ নেই, অন্তত আমি দেখিনি। শুধু ওর অফিসের চিন্ময় ঘোষ মাঝে মাঝে আসে।”
”আত্মীয়স্বজন?”
”আছে কিন্তু কারুর সঙ্গেই সম্পর্ক নেই। বাবা থাকেন কৃষ্ণনগরে, হোমিওপ্যাথ ডাক্তার, নাম অদিতিকুমার মুখার্জি, বয়স এখন প্রায় সত্তর। ‘বিজয়ায় একটা পোস্টকার্ড’ পাঠানো ছাড়া ছেলের সঙ্গে সম্পর্ক নেই বললেই চলে।”
”আপনার শ্বশুরের ঠিকানা?”
”বলতে পারব না, শুনেছি গোয়াড়ি না কোথায় যেন থাকেন।”
ইনস্পেকটার লিখে নিল।
”আর এক কাপ চা?”
রান্নাঘরের দরজায় উৎকর্ণ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সুবলের দিকে তাকিয়ে উমা মাথা নাড়ল। সুবল ব্যস্ত হল চায়ের জল বসাতে।
”শোবার ঘরটা একবার দেখব।”
ঘরটা যথেষ্ট প্রশস্ত। ডবল বেড খাট, ড্রেসিং টেবিল, স্টিল আলমারি, বইয়ের র্যাক, ছোটো একটা টেবিল, আলনা প্রভৃতি সত্ত্বেও চলাফেরার কিছুটা জায়গা আছে। খুঁটিয়ে ঘরের প্রতিটি বস্তু দেখতে দেখতে ইনস্পেকটার র্যাক থেকে বই তুলে নিল। সেই সময় উমা মেঝে থেকে ভিজে কাপড় তুলে নিয়ে ঘরের বাইরে এসে দালানে খাটানো দড়িতে মেলে দিতে দিতে ঘরের ভিতরে তাকাল।
ইনস্পেকটারের হাতের বইটা মাঝামাঝি জায়গায় খোলা। মুখে পাতলা হাসি। সুনীতও অনেকটা এইভাবেই বই পড়তে পড়তে হাসে।
উমা ঘরে ঢুকতেই বইটা বন্ধ করে র্যাকে রেখে দিল।
”পথের পাঁচালি যতবারই পড়বেন… এই জানলাটা দিয়ে…।”
