কলিংবেলের বোতামে চাপ দেওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলে দিল সুবল। যেন দরজার পাশেই অপেক্ষা করছিল।
”নিচে একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে কি?”
”হ্যাঁ।”
”পুলিশ। প্রথমে দত্তবাবুদের ঘরে এসেছিল, তারপর এখানে।”
”এখানে!”
উমার মনে হল সে শুনতে বোধহয় ভুল করছে। সুবলের কথা মাঝে মাঝে জড়িয়ে যায় বিশেষত যখন উত্তেজিত হয়। বয়স ওর প্রায় তিন কুড়ি।
”কেন?”
”দাদার খোঁজ করল। ক’দিন বাড়ি নেই, ইতিমধ্যে কেউ এসেছিল কি না, আমি কদ্দিন কাজ করছি, কারা কারা এখানে আসে…”
কলিংবেল বেজে উঠল।
”কাপড় ছাড়ো, সদ্দিজ্বর লেগে যাবে।”
দরজার খিলে হাত দিয়ে সুবল অপেক্ষা করছে যতক্ষণ না উমা শোবার ঘরে ঢুকে দরজা ভেজায়।
কলিংবেলে দু’বার সংকেত বেজে উঠল। জরুরি, অধৈর্য, কর্তৃত্বব্যঞ্জক। আলনা থেকে শুকনো শাড়ি টেনে নেবার সময় উমার কানে এল সুবলের বিনীত স্বর, ”বসুন, বউদি এখন কাপড় পালটাচ্ছেন।”
দালানে খাবার টেবিলের চেয়ার সরানোর শব্দ হল। বাইরের লোক এলে সাধারণত এখানে বসে। শুকনো ব্লাউজের পিঠের হুক লাগাতে লাগাতে দু’হাত পিছনমোড়া অবস্থাতেই উমা মেঝেয় পড়ে থাকা ভিজে কাপড় পা দিয়ে সরিয়ে দেয়াল ঘেঁষে রাখল। মাঝের হুকটা কিছুতেই গর্তে লাগানো যাচ্ছে না। চেষ্টা ছেড়ে দিয়ে উমা ঘর থেকে বেরোল।
বৃষ্টির জন্য ফ্ল্যাটের সব জানলাই বন্ধ। গুমোট এবং ভ্যাপসা গন্ধ। লোকটি তাকে দেখেই উঠে দাঁড়িয়েছে।
”বসুন।”
যথাসাধ্য মিষ্টি করে উমা হাসার চেষ্টা করল। ”বৃষ্টি বোধহয় ধরে গেছে, জানলাগুলো খুলে দি।”
অনুমতি দেবার ভঙ্গিতে লোকটি মাথা হেলাল। উমা অস্বস্তি বোধ করল। পুলিশ, ইনকাম ট্যাক্স, হাসপাতাল, কোর্ট ইত্যাদি সম্পর্কে সুনীতের মতো তারও অস্বস্তি মেশানো ভয় আছে। তবে এই লোকটা জাঁদরেল ধরনের নয়। বয়স বোধহয় সুনীতেরই কাছাকাছি। গাল দুটো ভারী হতে শুরু করেছে, থুতনি ও ঘাড়ে ভাঁজ পড়েছে। আঙুলে দুটি আংটির মধ্যে একটি পলার। নিস্পৃহ চাহনির আড়ালে গেরস্ত সহৃদয়তা উঁকি দিচ্ছে। কালো প্যান্টে যেখানে সাদা শার্টটা গোঁজা সেখানে ফেঁপে উঠছে চর্বির সামান্য উচ্ছ্বাস।
জানলা খুলতে খুলতে উমা আবার টের পেল লোকটির চাহনি এখন তার দিকেই। মাঝের হুকটি লাগানো নেই, পিঠ অনেকটা খোলা। লোকটির চোখের পরই আঁচল টেনে ঢেকে দেবার ভরসা সে পেল না। সেকশান ইনচার্জ বিনয় মৈত্র কথা বলতে বলতে যখন বুকের দিকে বারবার তাকায় তখন ওকে দেখিয়ে আপনা থেকেই হাতটা উঠে এসে বিন্যস্ত কাপড়টাকে অনাবশ্যকই বুকের উপর টেনে দেয় এবং মধ্যবয়সি লোকটির মুখ মুহূর্তের জন্য পাংশু হয় আর হালকা একটা বেদনা মুখের উপর দিয়ে ভেসে যায়। তারপর বিনয় মৈত্র সারাদিনের জন্য খিটখিটে হয়ে যায়, নানা ছুতোয় কাজের ভুল ধরে। উমার মনে হল, এই লোকটিকে অর্থাৎ পুলিশকে ব্যাজার না করাই ভালো।
”প্রায় থেমে গেছে।”
লোকটি অনুমোদনসূচক মাথা নাড়ল। ঠান্ডা ভিজে হাওয়ার ঝাপট মুখের উপর দিয়ে বয়ে যেতেই উমা জানলা থেকে সরে এসে একটা চেয়ারের পিঠ ধরে দাঁড়াল। নীরবে কয়েক সেকেন্ড তারা পরস্পরকে লক্ষ করল। রান্নাঘরে চামচ নাড়ার শব্দ হচ্ছে। দু’কাপ চা দিয়ে যাবার মতো বুদ্ধি সুবলের নিশ্চয়ই আছে। উমা মাথা ঝাঁকিয়ে চুলের ডগার জল ঝাড়ল। জবজবে ভিজে রয়েছে শায়াটা।
”লালবাজার থেকে আসছি, ইনস্পেকটার বসাক।”
মুখস্থ বলার মতো। বহুবার নিজের পরিচয় জ্ঞাপনের অভ্যাস থেকে ভঙ্গিটা তৈরি হয়েছে। উমা নার্ভাস বোধ করল।
”সুনীত মুখার্জি আপনার স্বামী, কতদিন বাড়িতে নেই?”
”আপনার স্বামী” বলার পর উত্তরের জন্য অপেক্ষা না করেই প্রশ্ন। দত্তদের ফ্ল্যাটে নাকি একটু আগে গেছল। উমা সতর্ক হল।
”পাঁচ দিন, গত রবিবার থেকে।”
”কোথায় গেছেন?”
”জানিনা, কিছু বলে যাননি।”
ভ্রূ কুঁচকে উঠল। উমা এতক্ষণে লক্ষ করল ইনস্পেকটারের দুই ভ্রূর মাঝে একটা কাটা দাগ আছে।
”খোঁজ করেছেন?”
”কেন, কিছু হয়েছে কি ওর?”
উমা ঝুঁকে পড়ল টেবিলে। ইনস্পেকটার ওর মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ধীরে মাথা নাড়ল।
”জানি না। স্বামী পাঁচ দিন বাড়ি আসেনি, স্ত্রীর তো উচিত খোঁজ নেওয়া।”
”সোমবার দুপুরে ওর কলিগ চিন্ময় ঘোষকে ফোন করেছিলাম।” উমা দেখল ইনস্পেকটারের হাতে বলপয়েন্ট কলম ও নোটবুক। তিনি বললেন, ”পুলিশে আর হাসপাতালের খোঁজ নেবেন।”
”কোথা থেকে ফোন করেছিলেন?”
”আমার অফিস, ওরিয়েন্টাল ফার্মাসিউটিক্যাল থেকে। রাত্রেই উনি এসে জানিয়ে যান কোথাও খবর মেলেনি। আর কী করতে পারি এ ছাড়া। বাচ্চচাছেলে তো নয় যে হারিয়ে যাবে বা চুরি যাবে?”
”কী বলে বেরিয়েছিলেন, রোববার তো ছুটির দিন, কোথায় যেতে পারেন বলে মনে হয়?”
”কিছুই বলেননি? শুধু, ফিরতে রাত হবে আর খাব না, এইটুকুই বলেছিলেন।”
”কী পরে বেরিয়েছিলেন?”
”কালোর উপর ছাই রঙের স্ট্রাইপ দেওয়া প্যান্ট, ফিকে নীল বুশশার্ট আর পাম্প শু।”
ইনস্পেকটার লেখায় ব্যস্ত। সুবল দু’কাপ চা এনে টেবিলে রাখল। একটি সসারে চারখানি বিস্কুটও। ইতস্তত করে ইনস্পেকটার চায়ের কাপ তুলে নিয়ে, ”বেশ ঠান্ডা পড়েছে” বলতে বলতে চুমুক দিল। চাপা আরাম ছড়িয়ে পড়ল মুখে। আশ্বস্ত হয়ে উমাও কাপ তুলল।
