একটা স্টেট বাস এল। সেটা থেকে কয়েকজন নামল, দুজন ছুটে এল বারান্দার নীচে। কেউই কথা বলছে না। কনকনে হাওয়ার দিকে পিঠ ফিরিয়ে চোয়াল শক্ত মুখগুলোয় হতাশ ও বিরক্তি নিঃশব্দে ছড়িয়ে আছে। নীরব বিষণ্ণ একটি সন্ধ্যা কাঁকুড়গাছির মোড়ে।
উমা হাত বাড়াল। মনে হল কমেছে। আরও দু-তিনজন হাত বাড়িয়ে বৃষ্টির ধারাবেগ অনুমান করল। ইতস্তত করে একজন হাঁটা শুরু করতেই বাকিরা চঞ্চল হয়ে উঠল।
আঁচলটা মাথায় ছড়িয়ে, ব্যাগটা বগলে চেপে উমা রাস্তাটা পার হবার আগে দু’ধারে তাকাল। রাস্তায় দুই বাতিস্তম্ভের মাঝে ঘন ঝোপের মতো অন্ধকার। তার মধ্যে থেকে একটা রিকশা বেরিয়ে এসে আবার সেঁধিয়ে গেল আর এক অন্ধকারে। শাড়িটা বাঁ হাতে পায়ের গোছের উপর তুলে, ডান হাতে মাথার আঁচলটা চেপে ধরে কুঁজো হয়ে সে দ্রুত রাস্তা পার হল। চুলকাটার সেলুনের পাশ দিয়ে দক্ষিণে চলে গেছে গোলাপবাগান রোড। উমা সেটায় ঢুকল।
তাকে মিনিট চারেক হাঁটতে হবে। দু’পাশের বাড়িগুলোর চেহারা বলে দেয় অঞ্চলটি পুরনো। পুবে দেড়শো মিটার দূরেই নতুন পাতা সি আই সি রোড, দমদম এয়ারপোর্টে যাতায়াতের পথ। দু’ধারের সারিবদ্ধ নতুন বাড়িগুলো পাঁচিলের মতো খাড়া হয়ে দমচাপা, ঘিঞ্জি পুরনো অঞ্চলকে আড়াল করে রয়েছে।
গোলাপবাগান রোডের বাতিগুলোয় তেজ কম। একটি করে বালব একটি করে স্তম্ভে। কয়েকটি প্রায়শই জ্বলে না। রাস্তা অসমান এবং গর্তবহুল। উমা যথাসম্ভব সতর্ক হয়েই দুটি বাঁক অতিক্রম করল। এরপরই এলাকাটি তার প্রাচীনত্বের অবসান ঘটিয়েছে। বাড়ির সংখ্যা এখান থেকে কমে গেছে। তিরিশ বছর আগে গোলাপবাগান রোড এই পর্যন্ত এসে থেমে ছিল। তারপর ছিল জঙ্গল। শিয়াল ডাকত। ষোলোটি ফ্ল্যাট নিয়ে চারতলা গুণেন ভবন এবং আরও কিছু বাড়ি তৈরি হবার পরও দীর্ঘকাল এদিকটা ফাঁকাই ছিল। এখন যতটুকু বসত, গত দশ বছরে তা গড়ে উঠেছে।
গোলাপবাগান রোড থেকে ‘দ’-এর আকৃতিতে একটা কাঁচা রাস্তা বেরিয়ে শেষ হয়েছে গুণেন ভবনের কোলাপসিবল গেটে। তারপর পাঁচিল ঘেরা একখণ্ড জমি, যেটায় ছোট্ট একটা বাড়ি উঠেছে। রাস্তাটার বাঁ ধারে কাঁচা দেয়ালের খাটাল, তার পিছনে বিহারি গোয়ালাদের টালির চালের ঘর। ডান দিকে মাঠ যেখানে ছোটোরা ক্রিকেট, ফুটবল খেলে। মাঠেরই কিছুটা জমি নিয়ে গোলাপবাগান রোডের ধারে ছেঁচাবেড়া ও টিনের চালায় তৈরি তিনটি দোকান-কয়লার, মাংসের এবং চায়ের।
উমা ইতস্তত করল কাঁচা খাটালের রাস্তাটায় ঢোকার আগে। ভাঙা ইটে, কাদায় ও গর্তে ভরা এই রাস্তা বৃষ্টির জলে এখন বিশ্বাসঘাতকের মতো মসৃণ হয়ে আছে। এই খাটালের রাস্তা ছাড়িয়ে, তিনটি দোকান অতিক্রম করে গজ পঁচিশেক এগিয়ে মাঠে নেমে গুণেন ভবনের গেটে পৌঁছানো যায়। ব্যস্ততা না থাকলে সে মাঠের উপর দিয়েই যায় অবশ্য যদি রাস্তার বাতিটা নিভে না থাকে।
বাতিটা আজ জ্বলছে। দিন দুই আগেও বালবটা কাটা ছিল। একটা জিপ মাঠের ধারে গোলাপবাগান রোডের উপর দাঁড়িয়ে। দেখেই চেনা যায় এটা পুলিশের। এই অঞ্চলের ওয়াগন ব্রেকারদের কাজকর্মের জন্য প্রায়ই গাড়িগুলো আসা-যাওয়া করে। সোমবারও একটা পুলিশের ভ্যান এসেছিল হাবার খুনের তদন্তে।
বৃষ্টি এখনও একটানা ঝিরঝিরে। উমার দেহে শাড়িটা সপসপে লেপটে রয়েছে। দমকা হাওয়া কিছুটা শান্ত কিন্তু ঠান্ডায় অসাড় হয়ে যাচ্ছে তার পাঁজরের দু-পাশ। কুঁকড়ে থাকার জন্য পিঠের পেশিতে ব্যথা করছে।
উমা খাটালের রাস্তা ধরল। ‘দ’-এর বাঁকটা পার হয়ে, বাঁ দিকে খাটালের শেষ ও গুণেন ভবনের পঁচিলের মাঝে হাত পাঁচেক লম্বা ও হাত তিনেক চওড়া ক্যানেস্তারা চালার একটা নিচু মাটির ঘর। বউকে নিয়ে হাবা এটায় থাকত। ওর খুনের তদন্তেই কি আবার পুলিশ এসেছে? উমা তার ডান দিকে মাঠের ওপারে পুলিশ জিপটার দিকে তাকাল। ক্যানভাসের পর্দাটা জানলায় নামানো। ভিতরে কেউ আছে কি না বোঝা যাচ্ছে না। সে বাঁ দিকে হাবার ঘরের দিকে তাকাল। দরজা জানলার কোনো ব্যাপার নেই। একটা ছেঁড়া চট পর্দার মতো ঝুলছে। উমার মনে হল চটটা সরিয়ে কেউ যেন তাকে দেখল। নিশ্চয় হাবার বউটা। গুণেন ভবনের দুটি ঘরে ও বাসনমাজার কাজ করে।
কোলাপসিবল দরজার উপরেই একটা বালব আছে। এখন জ্বলছে না। দরজার পরেই একটা ছোটো চত্বর। তার দু-ধারে ‘এ’ ও ‘বি’ দুটি ব্লকের সিঁড়ি, লেটার বক্স ও ইলেকট্রিক মিটারগুলো সারি দিয়ে সিঁড়ির দু-ধারে। চত্বরের পরেই দারোয়ান চরিত্তর সিংয়ের ও জলের পাম্পের ঘর এক বিরাট এবং ঢাকা চৌবাচ্চচা। চল্লিশ ওয়াটের একটা বালব চত্বরটাকে যতটা সম্ভব আলোকিত রাখার চেষ্টা করছে। একটা লোক ‘এ’ ব্লকের সিঁড়ির গোড়ায় দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে। বাঁ হাতে ওয়াটারপ্রুফ, ডান হাতের আঙুলে সিগারেট। উমাকে দেখেই সিধে হয়ে দাঁড়াল।
কারুর জন্য অপেক্ষা করছে। উমা একবার মাত্র তাকিয়ে লোকটির পাশ দিয়ে সিঁড়িতে উঠল এবং তার সহজাতবোধ থেকেই টের পেল লোকটি তাকে লক্ষ করছে এবং দৃষ্টি যে কোথায় তা-ও অনুভব করল। ভারী নিতম্বে চামড়ার মতো সেঁটে থাকা শাড়ির উপর আঁচল টানার জন্য হাতটা পিছনে আনতে আনতে সে একবার মুখ ফেরাল। লোকটি মুখ নিচু করে গামবুট দিয়ে সিগারেট চটকাচ্ছে।
