এই ভেবে অরো রাস্তা থেকে নেমে মাঠের গাঢ় অন্ধকারের দিকে এগিয়ে গেল।
.পরদিন ভোরে অরোর দেহটি খালের ধারে প্রথম খুঁজে পায় একটি কুকুর। সে কাছে এসে তার মুখ এবং দেহ শুঁকে ধীরে ধীরে চলে যায়।
বাওবাব
বাওবাব – মতি নন্দী – উপন্যাস
এক
দিনটা নভেম্বর ১৭। কলকাতায় সেদিন সন্ধ্যা থেকে মুষলধারে বৃষ্টি আর দমকা হাওয়া। গত সাত দিনে তিনটি সন্ধ্যা বৃষ্টির হাতে মার খেল।
শীত আসছে আসছে করেও ভাইফোঁটা পর্যন্ত মোটামুটি গরম ছিল। রাতে পাখা চালিয়ে ঘুমিয়েছে কলকাতার মানুষ। শুধু শেষরাতে একটা চাদর গায়ে টেনে দিত। সাত দিন আগে সকাল থেকে আকাশে মেঘ জমতে শুরু করে। আন্দামানের তিনশো কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ সৃষ্টি হওয়ায় ঝোড়ো বাতাস আর বৃষ্টি হবার সম্ভাবনা আছে-এইরকম একটা খবর রেডিয়ো জানিয়ে দিতেই ঝানু লোকেরা গরম পোশাক বার করে তৈরি হয়ে যায়। নভেম্বরে বৃষ্টি মাথায় নিয়ে শীত এবার একটু তাড়াতাড়িই এল।
দমকা উত্তুরে হাওয়ার এক-একটা ঝাপটার সঙ্গে এক ডিগ্রি করে শীতের দাঁত শরীরে বসে যাচ্ছে, তার উপর বৃষ্টির প্রলেপ। এসপ্ল্যানেডে কাঁপতে কাঁপতে মিনিবাসে ওঠার সময় উমা নিজেকে ধিককার দিল, কার্ডিগান বা অন্তত আলোয়ান নিয়ে তার বেরোনো উচিত ছিল এবং ছাতাটিও। যদি ছাতা খুবই হাস্যকর অবস্থা তৈরি করত এই হাওয়ার মধ্যে। এইমাত্র সে দেখেছে ছাতার শিক উলটে গিয়ে একটি মেয়েকে অপ্রতিভ হয়ে যেতে।
মিনিবাসের মধ্যে নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া। বাসে উঠে দরজার সামনের সিটটা খালি দেখেই, বিরল সৌভাগ্যে হৃষ্টচিত্তে উমা ঝপ করে বসে পড়ল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই খোলা দরজা দিয়ে আসা কনকনে হাওয়ায় কেঁপে উঠে সে বুঝল অন্য যাত্রীরা কেন এই সিটটা এড়িয়ে গেছে। কিন্তু প্রচুর চর্বিওলা এক পুরুষ যখন তার পাশে বসল যে স্বস্তি বোধ করল। তারপর সে ভাবল মানিকতলা মেইন রোডে কতটা জল জমবে, কাঁকুড়গাছির মোড়ের বা তার আগের স্টপে বাসটা দাঁড়ালে কতটা জল ভেঙে হাঁটতে হবে।
”এক মাসের আগে আর পিচ রেডি হচ্ছে না।”
”তারপরই লিগ শুরু বিনা প্র্যাকটিসেই!”
উমার পিছনেই দুই তরুণ। তারই অঞ্চলে কোথাও ওরা থাকে। গুণেন ভবনের সামনের মাঠটায়, পুজোর পর মাঝে মাঝে সকালে ব্যাট-বল নিয়ে ওরা নামে। গুণেন ভবনের দোতলায় তার পাশের ফ্ল্যাটের পুলকও সকালে খেলত এদের সঙ্গে। দু’বছর আগে পুলু শেষবারের মতো খেলেছে।
একদিন সকালে খেলার সময়ই গুটি পাঁচেক ছেলে হঠাৎ কোথা থেকে এসে মাঠের মধ্যেই পুলুকে ঘিরে ধরে। উমা শুনেছে, ক্ষুর দিয়ে পুলুর গলার নলিটা কেটে ওরা অপেক্ষা করে। দু’হাতে গলা চেপে পুলু বাড়ির দিকে ছুটে আসছিল। পথ আটকে মাঠের দিকে ওরা বারবার তাকে ঠেলে দেয়। পুলুর সহখেলোয়াড়রা, প্রায় জনা ছয়েক, যাদের মধ্যে এই ছেলে দুটিও, নিস্পন্দ হয়ে ব্যাপারটা দেখে যায়। ওরা পরে বলে, তাদের দেহে তখন নাকি সাড় ছিল না। শান্ত, নিখুঁত এবং এমন দ্রুত ব্যাপারটা ঘটে যায় যে মাঠের ধারের রাস্তা দিয়ে একটি লোক তখন যাচ্ছিল, তারা বা গুণেন ভবনের কোনো ফ্ল্যাটের কেউ জানতেও পারেনি। পুলু মাটি আর রক্তে মাখামাখি হয়ে যখন ঘাসের উপর মুখ রগড়াচ্ছে ছটফটাচ্ছে তখন অদ্ভুত এক ধরনের চিৎকার করতে করতে ছুটে এসেছিল হাবা। একটা বাঁশের খোঁটা ছিল হাবার হাতে। দু’হাতে সেটা মাথার উপর তুলে সে ছুটে আসতে গিয়ে পড়ে যায় হুমড়ি খেয়ে। আততায়ীরা গোটা দুই-তিন পটকা ফাটিয়ে চলে যায়। সেই ঘটনার দু’বছর পর হাবার লাশ মাঠে পড়ে থাকতে দেখা গেল, মাত্র পাঁচ দিন আগে ভোরবেলা।
গত পাঁচ দিন সুনীতও বাড়িতে নেই। উমা আজও দুপুরে সুনীতের অফিসে ফোন করেছে। চিন্ময় ঘোষ একই উত্তর দিয়েছে। গুণেন ভবনের ‘এ’ ব্লকের আটটি ফ্ল্যাটের কেউই এখনও জানে না তার স্বামী পাঁচ দিন নিরুদ্দেশ। ‘বি’ ব্লকের কারুর সঙ্গে তাদের আলাপ-পরিচয় নেই। সুবল দিনে অন্তত চার-পাঁচবার ব্যাপারটা তোলে, উদ্বেগ প্রকাশ করে, উমাকে তাগিদ দেয় আরও খোঁজখবর নেবার জন্য। বুনো মানুষটি গত পাঁচ বছরে একবারও নিজেকে রাঁধুনি বা চাকর ভাবতে পারেনি। সুনীত বাচ্চচাছেলে নয়, বয়স প্রায় আটত্রিশ, তাই কি, বোধহয় সাঁইত্রিশ।
উইন্ডস্ক্রিন ওয়াইপারটা অনর্থকই আঁচড়ে যাচ্ছে বৃষ্টিধারাকে কাচের উপর লেপে দিয়ে। তাইতে রাস্তার আলোকে আরও ঘোলাটে দেখাচ্ছে কাচের ওধারে। পাশে বসা বিরাটকায় যাত্রীটি উমার স্পর্শ বাঁচাতে যথাসম্ভব কুঁকড়ে বসেছে। ফলে দেহের অর্ধেকটাই সিটের বাইরে। চাকা গর্তে পড়ে বাসটা ঝাঁকিয়ে উঠলেই লোকটি সামনের সিট আঁকড়ে ধরছে টাল সামলাতে। উমা একবার ভাবল, ওকে সরে বসতে বলবে। শেষ পর্যন্ত আর বলা হয়নি। মানিকতলার মোড়ে লোকটি নেমে গেল।
স্টপ থেকে তিরিশ গজ এগিয়ে মিষ্টির দোকানের গাড়িবারান্দার সামনে সম্ভবত দয়াপরবশ হয়েই ড্রাইভার বাসটা থামাল। উমা ছুটে বারান্দার নীচে এল। হাওয়ার বেগ এখন একটু কম, বৃষ্টিও। স্তিমিত চোখে মিষ্টিওলা তার দিকে একবার তাকাল। জনাচারেক পথচারী, একটি কুকুর ও এক ঝালমুড়িওলা বারান্দার নীচে আশ্রয় নিয়েছে। রাস্তার ওপারে ইলেকট্রিকের ও মদের দোকানের সিঁড়িতে এবং দেয়াল ঘেঁষেও কিছু লোক দাঁড়িয়ে রাস্তার বাতিগুলোর বালব ঘিরে বাতাসে শ্যামাপোকার মতো ভনভন করছে বৃষ্টির জল। ব্রিজের উপর জানলা বন্ধ ট্রেন গড়গড় শব্দে একটা কালো আঁচড় টেনেই আবার তা মুছে গেল।
