‘ব্যাপারটা কী? ফোন করে মানুষ বাঁচানো-ফোন কি ডাক্তার, ইঞ্জেকশান, অপারেশন?’
‘বাড়ি কোথায় আপনার?’
‘এন্টালি।’
‘এন্টালি। এত রাতে এখানে কী করছেন?’
অরো ঘড়ি দেখল। দশটা-পঞ্চাশ। নন্দা সম্ভবত এখন চুল আঁচড়াচ্ছে। শোবার আগে আয়নার সামনে বসে ও খুঁটিয়ে নিজের মুখ দেখে। ওর পাশের টেবলেই কৌটোটা। যদি ওষুধটা খেয়ে নিয়ে চুল আঁচড়াবে ভেবে থাকে।
ওদের মুখের দিকে অরো তাকাল। অভুক্ত, ভোঁতা, নির্মম তিনটি মুখ। বয়স হয়তো তিরিশের নিচেই।
‘যদি কাছাকাছি ফোন থাকে তো বলুন, জীবন-মরণের প্রশ্ন এখন।’
ওদের মধ্যে দুজন দৃষ্টি বিনিময় করল। অন্যজন চারধারে তাকিয়ে নিয়ে শিস দিল।
‘আছে। আসুন নিয়ে যাচ্ছি।’
ওরা যেদিক থেকে এসেছে, সেই দিকেই অরোকে নিয়ে চলল। কাঁচা মাটির পথ, মাঠের মাঝ দিয়ে। দূরে দু-চারটে বাড়ির ছায়া। গ্রাম-গ্রাম পরিবেশ। পিঠে ধাতব কঠিন খোঁচা পেল অরো।
‘ব্যস।’ পিছনের কণ্ঠস্বরে সামনের দুজন দাঁড়িয়ে গেল।
‘চুপ করে থাকুন।’
ওরা দ্রুত কাজ করে গেল। ঘড়িটা খুলে নিল, মানিব্যাগ এবং সিকোজাইমের কৌটোটা পকেট থেকে বার করল। কৌটোটা ছুঁড়ে ফেলে দিতে গিয়ে দিল না।
‘কী এটা, ওষুধ?’
অরোর পকেটে ফিরিয়ে রেখে দিল। হিপপকেটে আঙুল ঢুকিয়ে খুঁজল। এবং পুরিয়াটা বার করল।
‘এটাও বোধহয় ওষুধ।’ একবার শুঁকে হিপপকেটে ফিরিয়ে দিল।
‘যান এবার।’
‘ফোন কোথায় পাব, সেটা একটু বলুন।’
ওরা অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছে। শুধু দুটি কথা ভেসে এল : ‘এগিয়ে পেট্রল পাম্পে।’
শোনা মাত্র ভি আই পি রোড লক্ষ করে সে ছুটল। রাসকেলরা দেরি করিয়ে দিল। অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এসে বাঁ হাত তুলল ঘড়ি দেখতে। কবজি ঘিরে ফ্যাকাসে একটা দাগ। একটু এগিয়ে, তার মানে অরো দক্ষিণে ওই দিক দিয়েই হেঁটে এসেছে। মনে করার চেষ্টা করল, কোনো পেট্রল পাম্প দেখেছে কিনা।
আবার ছুটতে গিয়ে বুকের মধ্যে তীক্ষ্ন ব্যথা উঠছে। কিন্তু নন্দার চুল আঁচড়ানো হয়তো এতক্ষণে শেষ হয়েছে। অরো সামনেই পেট্রল পাম্পের আলো দেখতে পেল।
টেবিলে বসা লোকটা হকচকিয়ে দাঁড়িয়ে উঠল হঠাৎ একটা লোককে পাগলের মতো এত রাতে ছুটে ঘরের মধ্যে ঢুকতে দেখে। ড্রয়ার বন্ধ করেই চাবি দিল।
‘এমারজেনসি।’ বলেই অরো রিসিভার তুলে ডায়াল করতে থাকল।
এ-ধারে রিং হয়ে যাচ্ছে। চ্যাটার্জিরা তো দেরিতেই শোয়, তাহলে ধরছে না কেন? অন্য সময় তো ফোনের কাছাকাছিই থাকে বুড়িটা অথর্ব গাধা। অরো রিসিভারের হাতলটা মুঠোয় কচলাতে লাগল। এবং সেই সময়ই তার মনের মধ্যে ক্ষীণ ডায়ালিং টোনের মতো বেজে উঠল। কী বলব আমি নন্দাকে? কী বলার জন্য ফোন করছি? এ আমি কী করতে চলেছি! স্বীকারোক্তি! আমি খুনি, এই কথার?
‘হ্যালো।’
‘আমি অরবিন্দ। নন্দাকে খুব দরকার। ডেকে দেবেন দয়া করে।’
‘দেখছি।’
অরবিন্দ এইবার নিজ মুখে বলো তোমার অপরাধের কথা। অরো মরিয়া হয়ে ভাবল, যদি ইতিমধ্যে নন্দার কিছু হয়ে থাকে, তাহলে আর বলতে হবে না। বেঁচে যাবে সে। কিন্তু কার কাছ থেকে? ব্যর্থ, আজীবন ব্যর্থ আমি। আজীবন ভীরু, শুধুই মায়া-মমতা আমার উদ্দেশ্যে দান করা হয়েছে। নিজেকে ছাড়িয়ে একবারও উঠতে পারলাম না।
‘হ্যালো, কে অরো?’
হৃৎপিণ্ডটা অরোর গলার কাছে লাফিয়ে উঠল। নন্দা বেঁচে এখনও।
‘হ্যাঁ।’ নিজেকে অচঞ্চল শান্ত রাখতে রাখতে অরো বলল, ‘একটা কথা বলব, মন দিয়ে শোনো।’
কয়েক সেকেন্ডের জন্য সে থামল। তারপর ধীরে ধীরে তার গম্ভীর গলায় স্পষ্ট উচ্চচারণে বলল, ‘তোমার হজমের ওষুধ যেটা তুমি এক্ষুনি হয়তো খাবে, সেটায় বিষ মেশানো আছে। আমিই মিশিয়েছি। বিষটা মারাত্মক।’
ওধারের অস্ফুট তীক্ষ্ন বিস্ময়ে অরো শুনল। আর দেখল সামনের লোকটা কাঠ হয়ে উঠে বিস্ফারিত চোখে তার দিকে তাকিয়ে।
‘জিজ্ঞাসা করবে নিশ্চয়, কেন তোমাকে মারতে চেয়েছি? অনেক কথা তাহলে বলতে হয়। এত সময় নিয়ে ফোনে এই মুহূর্তে বলা সম্ভব নয়। শুধু বলছি, করুণাবশতই আমি চেয়েছি। আমি তোমাকে ভালোবাসি, তাই চেয়েছি যন্ত্রণাহীন মৃত্যু হোক তোমার। নন্দা এখন তুমি জীবনের চুড়োয়। ওখান থেকে অনুকম্পার লোকলজ্জার, নিঃসঙ্গতার গর্তে পড়লে আঘাতটা জোরেই লাগবে যদি ডিভোর্স করি। আমার পক্ষে অকল্পনীয় তোমাকে কষ্টকর জীবনের দিকে ঠেলে দেওয়া। আমি যে ভালোবাসা চেয়েছি, নন্দা তুমি তো দিতে পারোনি। কিন্তু অন্তত ভালো স্ত্রী-র পক্ষে যা যা করা উচিত, তা তুমি করেছ। আমি কৃতজ্ঞ সেজন্য। তুমি ওষুধের কৌটোটা এখুনি ফেলে দাও। এখুনি।’
অরো রিসিভার নামিয়ে রাখল।
‘আমার কাছে কোনো পয়সা নেই। একটু আগেই ছিনতাই করে নিয়েছে যা কিছু ছিল।’
লোকটির বিস্ময়ের ঘোর এখনও কাটেনি। শুধু বলল, ‘এসব কথা কাকে বলছিলেন।’
অরো হেসে বলল, ‘সম্ভবত নিজেকে।’
জায়গাটা থেকে বেরিয়ে সে রাস্তায় দাঁড়াল। অদ্ভুত রকমের শান্ত আবহাওয়া এখন তার মনের মধ্যে। পৃথিবীর সঙ্গে যোগসূত্রগুলির প্রত্যেকটি ছিঁড়ে গেছে যেন। নিজেকে ভার লাগছে তার। এখনই বোধহয় সে পারে, বিরাট কোনো কাজ করতে।
রাস্তা দিয়ে মন্থরভাবে হাঁটতে হাঁটতে নন্দা, চিরো এবং চিত্রার কথা সে ভাবল। তারপর বলল : এইবার ঠিক করতে হবে, কীভাবে নিজের সঙ্গে লড়া যায়। আমাকে জিততেই হবে। এবার নিজের কাছ থেকে নিজেকে রক্ষা করা, সাহসীর মতো। মর্যাদাসহকারে।
