‘অন্তত আমি ঝুঁকি নিতে পারব না।’
এত মতলব, এত দ্বিধা ভয় সাবধানতা, সবকিছুই নিরর্থক হতে চলেছে। নন্দার মৃত্যুর খবর যখন চিত্রা পাবে, কী ভাববে? ভাববে অরোই এটা ঘটিয়েছে। চিত্রার সঙ্গে তার ব্যাপারটা নন্দাকে বলেছে, আর শোনামাত্র নন্দা হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছে। তাহলে চিত্রা কখনোই তাকে বা নিজেকে ক্ষমা করবে না।
‘আমি জানি তুমি আঘাত পাবে, তবু বলতে বাধ্য হচ্ছি, এভাবে আমি বিয়ে করতে পারব না। এভাবে নয়।’
‘এভাবে নয়।’ অরো মৃদুস্বরে পুনরাবৃত্তি করল। নন্দার যখন বুক ধড়ফড়ানি হয়েছিল, তখন অনেকটা এইভাবেই সে বলেছিল।
‘তুমি কি পাকাপাকি সিদ্ধান্তে এসে গেছ।’ অরো বলল।
‘হ্যাঁ, এ আর বদলাবে না।’
একটু ভেবে অরো বলল, ‘বেশ। তাহলে এবার আমরা কি করব?’
‘আমার মনে হয়, পরস্পরকে ভুলে যাবার চেষ্টা করাই ভালো। কোনোদিন আমাদের দেখা হয়নি, এইরকম যদি ভাবতে পারি।’
‘বেশ।’
‘আমি কি কিছু ভুল বলেছি।’
‘না, না, ঠিকই বলেছ। এবার আমি যাই।’
‘তুমি রাগ করেছ অরো?’
‘অনেক আগে এটা জানালে ভালো করতে?’
চিত্রার সিদ্ধান্ত তাকে যা কিছু বেদনা দিয়েছে, তা অসাড় হয়ে আসছে এখন মারাত্মক একটা ভয়ে। নন্দা কেন অকারণে তাহলে মারা যাবে? এখুনি তাকে যেতে হবে, এখুনি এখুনি।
হাত তুলে ঘড়ির দিকে তাকিয়েই অরো আতঙ্কে জমে গেল। আর মাত্র আধঘণ্টা,তারপরেই হয়তো নন্দা সিকোজাইমের কৌটোর দিকে হাত বাড়াবে।
লোহার ছোট্ট গেটটা খুলে বেরোবার সময় অরো কয়েক সেকেন্ডের জন্য ঘুরে দাঁড়াল।
‘না, আমি একটুও রাগ করিনি।’
স্বাভাবিক স্বরে কথাগুলো বলে সে বেরোতে যাচ্ছে, তখনই ইলেকট্রিক আলো জ্বলে উঠল সারা অঞ্চলে। চিত্রার দেহে আলো পড়েছে। অরো বিষণ্ণ চোখে কয়েক সেকেন্ড ওর দিকে তাকিয়ে থেকে বেরিয়ে এল। ছোটোবেলা থেকে যে ভালোবাসার স্বপ্ন সে দেখে এসেছে আর কোনোদিনই তা সম্ভব হবে না। চিত্রাই তার শেষ ব্যর্থতা।
অরো নিজের জন্য করুণাবোধ করল। জীবনে এই প্রথম।
.ভি আই পি রোডের উত্তরে ও দক্ষিণে অরো তাকাল। কুড়ি পঁচিশ সেকেন্ড অন্তর এক একটা গাড়ি চলে যাচ্ছে, কিন্তু তার একটাও ট্যাক্সি নয়।
অধৈর্য হয়ে ঘড়ি দেখল। আর কুড়ি মিনিটের মধ্যে যদি ফ্ল্যাটে পৌঁছতে পারে-কিন্তু অসম্ভব। এখান থেকে এন্টালি, উড়িয়ে নিয়ে গেলেও ট্যাক্সি আধ ঘণ্টার আগে পৌঁছে দিতে পারবে না। হয়তো নন্দা আজ দেরি করেই ওষুধটা খাবে। যদি সে তখন বসার ঘরে থকে, তাহলে শোবার ঘরে গিয়ে পুরোন কৌটোটার বদলে নতুনটা রেখে দেওয়া এমন কিছু শক্ত কাজ হবে না। পরে একসময় পুরনো কৌটোটা রাস্তায় ফেলে দেওয়া যাবে। সুতরাং আধ ঘণ্টা পর পৌঁছলেও ভয়ঙ্কর ব্যাপারটা এখনও বন্ধ করা যেতে পারে। কিন্তু ট্যাক্সি কোথায়?
অরো দক্ষিণ দিকে হাঁটতে শুরু করল, একটু জোরেই। পিছনে মোটর এঞ্জিনের শব্দ পেলেই থমকে যায়। তারপর দেখে লরি বা প্রাইভেট কার আসছে।
অরো জোরে, প্রায় ওয়াকিং রেসের প্রতিযোগীর মতো এবার সে হাঁটতে লাগল। এখন তার মনে চিত্রা নেই, শুধু নন্দা আর একটি উদ্বেগ-তাকে এখুনি পৌঁছতে হবে। আবার ঘড়ি দেখল সে এবং প্রায় নির্জন রাস্তার একধারে দাঁড়িয়ে জিপটির অতিক্রম করে যাওয়া দেখে সিদ্ধান্তে এল, এখন ট্যাক্সি পেয়েও সে নন্দাকে বাঁচাতে পারবে না।
দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ অরোর মনে হল, কেউ তাকে লক্ষ্য করছে। চারধারে তাকিয়ে কাউকে দেখতে পেল না।
ভয় তাকে ঠান্ডা মুঠোয় টিপে ধরেছে। তার মনে হচ্ছে অন্ধকারের মধ্যে থেকে কিছু একটা বেরিয়ে এসে ঘিরে ধরবে। কী হতে পারে সেটা? একটা দড়ি। গোল হয়ে তাকে ঘিরে ক্রমশ ছোটো হতে হতে গলায় আটকে যাবে। নয়তো চারিদিকে চারটে দেওয়াল ক্রমশ এগিয়ে আসবে, আলো-বাতাস বন্ধ করে তাকে চেপে ধরবে। দম বন্ধ হয়ে সে মারা যাবে।
সম্ভবত নন্দার আগেই সে মারা যাবে। তাহলে নন্দাকে বাঁচাবে কে? একমাত্র উপায় টেলিফোন করে ওকে ওষুধটা খেতে নিষেধ করা। এখন তার দরকার একটা টেলিফোন। মনে হওয়া মাত্র অরো ছুটতে শুরু করল।
দু’ধারে তাকাল সে। একদিকে নিম্নবিত্তদের টালি বাড়ি, অন্যদিকে বিরাট পাঁচিল, ভিতরে কারখানা। একটি লোকে আসছে সামনে থেকে। অরো দাঁড়িয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘বলতে পারেন, এখানে কোথায় ফোন আছে? ভীষণ দরকার, খুব জরুরি!’
‘ফোন!’
লোকটি তার দু’পাশে তাকিয়ে যেন খুঁজল। চিন্তিত স্বরে বলল, ‘ফোন তো কাছাকাছি কোথাও নেই। আর একটু এগিয়ে দেখুন, ওষুধের দোকানে থাকতে পারে।’
অরো হাঁটতে শুরু করল আবার। অ্যাশফাল্টের ওপর জুতার থপ থপ শব্দটাই এখন তার একমাত্র সঙ্গী। পাশ দিয়ে মাঝে মাঝে মোটর চলে যাচ্ছে। সে দুধারে তাকাচ্ছে। মোটামুটি সম্পন্ন চেহারার একটা বাড়িও যদি দেখতে পায়, তাহলে দরজা ধাক্কাবে।
‘ও মশাই ছুটছেন কেন? কী হয়েছে?’
অরো থেমে গেল। হাঁফাচ্ছে।
জীবনে সে খেলাধুলা করেনি। কোনোদিন এভাবে দৌড়োয়নি। হাঁ-করে শ্বাস টানতে লাগল। বাঁ পাশের ঝোপঝাড় থেকে এগিয়ে এল তিনটি ছেলে।
‘ব্যাপার কী, দৌড়চ্ছেন কেন?’
ওরা তাকে ঘিরে দাঁড়াল।
‘ফোন করব, এখুনি। কোথায় পাওয়া যাবে বলতে পারেন?’
‘ফোন করবেন তো দৌড়চ্ছেন কেন?’
‘খুব জরুরি?’
‘একজন মারা যাচ্ছে।’ অরোর মনে হল সেই অজানা চোখ, যা তাকে লক্ষ করে যাচ্ছে মনে হয়েছিল, সে কি এরাই? ‘ফোন করে হয়তো বাঁচানো যেতে পারে।’
