অরো ধীরে ধীরে দ্বিতীয় কাপ শেষ করে রাস্তায় বেরিয়ে এল। শ্রীপুর কলোনিতে পৌঁছল সাড়ে আটটায়। ঘুটঘুটে অন্ধকারে কলোনিটা ডুবে রয়েছে। লোডশেডিং। বাড়িগুলোর জানালা দিয়ে হ্যারিকেন আর মোমবাতির হলদেটে ম্লান আলো দেখা যাচ্ছে। গরমের জন্য রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছে অনেক লোক।
চিত্রাদের বাড়িতে অরো অপরিচিত নয়। অনেকবার দুপুরে বা রাত্রে খেয়ে গেছে। সময় কাটিয়েছে দোতলায় চিত্রার ঘরে গল্প করে। ওকে এই সময়ে শ্রান্ত চেহারায় দেখে চিত্রা নিশ্চয়ই অবাক হবে।
‘কি ব্যাপার, আপনি?’ চিত্রার বদলে চিত্রার বোন। হ্যারিকেনটা একটু তুলে ধরে অবাক মুখে তাকিয়ে। ‘দিদি তো মাকে নিয়ে বিকেলেই বেরিয়েছে। নটা-সাড়ে নটা নাগাদ আসবে।”
‘ওহ, আমার একটু দরকার ছিল। আচ্ছা, ঘুরে আসছি।’
অরো তার শ্রান্ত দেহটাকে নিয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়াল। একা বাড়িতে চিত্রার বোন। নয়তো সে বলত, চেয়ার দাও বাইরে চাতালটায় বসছি।
ঘড়িটা চোখের কাছে তুলেও সময় দেখতে পেল না। আর কত বাকি? আড়াই ঘণ্টা? তিন ঘণ্টা? দিন বছর। যদি কতকগুলো বছর কম আর বেশি হয়, কী আসে যায়?
একটা অন্ধকার রকের ওপর বসল। পিছনের জানালাগুলো বন্ধ। বাড়িতে কেউ নেই বোধহয়। চোর ভাববে না তো তাকে? ভাবুক। আজ মনের জোর পরীক্ষা করার রাত। দেয়ালে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করল।
তন্দ্রা এসেছিল আবার। একসময় তার মনে হল কেউ হিপপকেট থেকে পুরিয়াটা তুলে নিচ্ছে চুপিচুপি। ধড়মড়িয়ে উঠে দাঁড়াল সে। অন্ধকারের মধ্যেও টের পেল একটা কুকুর তার পিছনে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে। তাকে দ্রুত দাঁড়াতে দেখে বেচারা সন্ত্রস্ত হয়ে উঠে বসল।
কটা বাজে? এখনও কেন অন্ধকার? কুকুরও কি মরে ভূত হয়। অরো আবার চিত্রাদের বাড়ির পথ ধরল। বারুইপুরের বাড়িটা সে কি করবে? নন্দা মারা গেলে ওটা তারই হবে। বিক্রিই করে দেবে, ওখানে গিয়ে আর বসবাস করা যাবে না। কিংবা, নন্দার দাদাদেরই ফিরিয়ে দেবে। সেটাই ভালো দেখাবে।
চিত্রা ফিরেছে। গীতার কাছেই সে শুনেছে অরো এসেছিল এবং আবার আসবে।
‘ব্যাপার কি? এত রাতে।’
‘কিছু না, এমনিই। হঠাৎ ইচ্ছে হল। তুমি কোথায় গেছলে মাকে নিয়ে?’
‘মাকে মেজোমাসির বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে রিহার্সালে গেছলাম। হল না রিহার্সাল, ওদের নিজেদের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি-যাকগে, বাইরেই বোসো। ঘরে বড্ড গরম।’
বাড়ির সামনের চাতালে দুটো চেয়ার পেতে ওরা বসল। হ্যারিকেনটা দরজার কাছে রাখা যাতে বাড়ির ভিতরে ও বাইরে আলো পড়ে।
‘খিদে পেয়েছে?’
খিদে! শব্দটা অরো যেন এই প্রথম শুনল। পাকস্থলী অসাড় হয়ে রয়েছে, খিদের কোনো বোধই নেই। তার মনে হচ্ছে এক বছর তার খাওয়ার কোনো দরকার হবে না।
মাথা নাড়ল সে।
‘শুধু জল খাব। শরীরটা ভালো লাগছে না।’
অরোর কপালে হাত রেখে তাপ বুঝতে চেষ্টা করল চিত্রা।
‘না, জ্বরটর হয়নি।’ বলে সে জল আনতে গেল।
জল খেয়ে গ্লাসটা চিত্রার হাতে দিয়ে অরো ‘আহহ’ করে উঠতেই চিত্রা গ্লাসটা মেঝেয় রেখে চেয়ারে বসে বলল, ‘চিন্তিত দেখাচ্ছে, কিছু কি হয়েছে? নন্দা কেমন আছে?
বিস্মিত হয়ে অরো তাকাল।
‘কেন? হঠাৎ নন্দার কথা?’
‘চিরোকে দেওয়া কথা ভুলে চিত্রা বলে ফেলল, ‘ওর হার্টের অসুখ আছে না? একবার তো ডাক্তারও ডাকতে হয়েছিল।’
‘হ্যাঁ, হয়েছিল একবার।’
অরোর মনে হল নন্দার করোনারি থ্রম্বসিসের খরবটার জন্য চিত্রাকে আগাম তৈরি করে রাখলে কেমন হয়? তারপর ভাবল, থাক বেশি চালাক হয়ে কাজ নেই। আবার মনে হল, কেনই বা নয়? ক্ষতিটা কী?
‘হার্ট ব্যাপারটা একটু গোলমেলে।’
‘হুঁ।’
‘আজ কেমন চুপচাপ দেখছি যেন তোমায়?’
‘কারণ আছে।’
‘রিহার্সাল হল না বলে?’
‘অরো, যা বলব তাতে আমায় ভুল বুঝো না। চিত্রা কোলে দুই মুঠো রেখে চাপা স্বরে বলল, ‘তুমি আমার কাছে যতটা, আর কেউ তা নয়।’
অরো নিথর হয়ে অপলক তাকিয়ে রইল থেমে যাওয়া চিত্রার দিকে। গুরগুর করে উঠছে বুক। একটা বিরাট ঢেউ বোধহয় পাথরের গায়ে আছড়ে পড়তে চলেছে। তার ধ্বনিটা ক্রমশই এগিয়ে আসছে তার বুকে, মাথায়, সর্বাঙ্গে-এমনকি আঙুলের ডগাতেও প্রতিধ্বনি।
চিত্রা এবার সোজা তাকাল অরোর মুখে। হাত বাড়িয়ে আলতো করে ধরল অরোর বাহু।
‘অরো, আমার মনে হয় না এভাবে কিছু করা উচিত। কয়েকটা দিন আমি ভালো করে ভেবে বুঝেছি নন্দার প্রতি অন্যায়ই করা হবে, সবথেকে বড়ো কথা ওর জীবনও বিপন্ন হতে পারে।’ ইতস্তত করে যোগ করল চিত্রা, ‘তোমার বা আমার প্রতিও অন্যায় করা হবে।’
ঢেউটা ফিরে গেছে, শুধু পড়ে আছে ক্ষয়ে যাওয়া রুক্ষ পাথরটা কিন্তু গুরুগুরু শব্দটা অরোর বুকের মধ্যে দ্বিগুণ জোরে ধ্বনিত হচ্ছে।
‘তুমি কি বলছ চিত্রা! কেন এসব কথা এখন উঠছে। প্লিজ, আজ নয়। এখন এসব বলে আমাকে ধসিয়ে দিয়ো না।’
‘তুমি কি চাও, তোমার ধস বন্ধ করতে তোমায় বিয়ে করি? কর্তব্যবোধ থেকে বিয়ে করা উচিত, এটাই কি বলতে চাও?’
‘মোটেই নয়।’ পাংশু মুখটা সে নিচু করল। হ্যারিকেনের আলো তার চশমার কাচে প্রতিবিম্বিত হল।
‘তুমি কি এটা বুঝতে পারছ না, যদি নন্দার কিছু ঘটে, তাহলে আমরা নিজেদের কখনোই ক্ষমা করতে পারব না। সবসময় আমাদের দুজনের মাঝখানে ও রয়েই যাবে।’
‘যাবে? মাঝখানে রয়েই যাবে?’ তিক্তস্বরে অরো বলল। ‘নাটক নভেলে এসব পড়েছি, সবসময় দুজনের মধ্যে ওর অস্তিত্ব অনুভব করা, দুজনের মাঝে ছায়া ফেলে থাকা, সুখকে তেতো করে দেওয়া। কিন্তু এমন কি সত্যিই হয়?’
