”হ্যালো, আমি নন্দা।”
”এত দেরি হল কেন?” অধৈর্য বিরক্ত স্বরে অরো বলল, ”কি করছিলে?”
”বাথরুমে ছিলাম।”
”কেন, হজমের কিছু হয়েছে?”
”না তো, রুমাল আর মোজাগুলো সাবান জলে দিচ্ছিলাম।”
”তোমার ওষুধটা কিনেছি।”
”না কিনলেও চলতো। যতটুকু আছে আজ খেয়ে নেব। আর খাওয়ার দরকার হবে না। ফোন করছ কেন?”
”দরজার ছিটকিনিটা তুলে রেখো। যদি রাত হয়, তাহলে বারবার বেল বাজিয়ে তোমায় তোলার দরকার হবে না।”
”আমার ঘুম পাতলা।”
”তা হোক।”
”আচ্ছা।”
”রাখছি, কেমন?”
রিসিভার রেখে অরোর মনে হল, এই শেষবার নন্দার কণ্ঠস্বর সে শুনে নিল।
কিছুক্ষণ পরই তার ভ্রূ কুঞ্চিত হল। বাইরের দরজাটা টেনে ধরলেই খাড়া করে রাখা আলগা ছিটকিনিটা পড়ে যায়। দরজা ঠেলে সে ভিতরে ঢুকে নতুন কৌটোটা রাখবে। কৌটো থেকে খানিকটা ওষুধ আগেই অবশ্য ফেলে দিতে হবে। তারপর পুরনোটা পকেটে পুরে নেবে।
কিন্তু নতুন কৌটোয় কার আঙুলের ছাপ থাকবে? তার নিজেরই। অথচ থাকার কথা নন্দার, যে ওটা থেকে ঢেলে নিয়ে খেয়েছে। নন্দা কখনোই ওটা হাতে ধরার সুযোগ পাবে না। তার আগেই সে মৃত। এই হচ্ছে অজানা ফাঁদ আর সে কিনা এতে পা দিয়ে ফেলেছিল। অরো ভাবল, আমি সত্যিই একটা গাড়োল।
ব্যাপারটা অবশ্য সামলে নেওয়া যায়। কিন্তু যেভাবে তা করতে হবে ভাবতেই সে বিষণ্ণ বোধ করল। নন্দার অসাড় মৃত হাতটা নিয়ে তার আঙুলগুলো কৌটোয় চেপে ধরতে হবে। ডান হাতের আঙুলগুলো ঢাকনিতে, বাঁ হাতের আঙুলগুলো কৌটোটা জড়িয়ে।
”অসম্ভব, ও কাজ আমার দ্বারা হবে না।” সে নিজেকে শুনিয়ে বলল।
মাথার মধ্যে তখন ফিসফিস করে কে বলে উঠল, ”সামান্য ব্যাপারে হেরে যাচ্ছে? এইজন্যই তো তুমি জীবনে ব্যর্থ।”
দীর্ঘশ্বাস ফেলল অরো, সে জানে শেষপর্যন্ত এটা তাকে করতেই হবে।
.
রাত অন্তত সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত অরোকে বাইরে কাটাতে হবে। কোথায় কীভাবে, কার সঙ্গে কাটাবে এতক্ষণ। চেনাশোনা লোকদের সঙ্গে থাকার ইচ্ছে তার নেই। সে জানে, ফ্ল্যাটে ফিরে গিয়ে নন্দাকে মরতে দেখা তার পক্ষে সম্ভব নয়। হয়তো শেষমুহূর্তে ‘খেয়ো না খেয়ো না’ বলে কোনো একটা ছুতো দেখিয়ে গ্লাসটা সে কেড়েই নেবে।
বুড়োকে চোখের সামনে সে মরতে দেখেছে। শুকনো মনে নন্দার মৃত্যু নিয়ে চিন্তাও করতে পারে। ওই পর্যন্তই। যুক্তি দিয়ে কাজটার যথার্থতা হয়তো বোঝাতে পারে, কিন্তু ফলাফল দেখার জোর তার নেই।
চিত্রাকে মনে পড়ছে তার। ওর কাছে গেলে হয়তো ওর সঙ্গ তাকে এই কয়েক ঘণ্টা কাটাবার মতো মনের জোর দিতে পারে।
অরো বাসে শেয়ালদার মোড়ে এসে ঘড়িতে দেখল মাত্র ছটা। চিত্রা অন্তত আটটার আগে বাড়ি ফিরবে না। এই দীর্ঘ সময় কোথাও বসে কাটানো মানেই চিন্তাগুলোকে জোঁকের মতো মাথায় লাগানো। তার থেকে বরং হাঁটাই ভালো। যতদূর পারবে হাঁটবে, তারপর বাসে উঠে পড়বে।
কিন্তু যা ভেবেছিল, মোটেই তা হল না। শেয়ালদার ভিড় কাটিয়ে মানিকতলার দিকে হাঁটতে শুরু করেই সে ভাবনার মধ্যে ডুবে যেতে থাকল।
কী এমন অন্যায়। অরো ভাবল, এভাবে বিনাযন্ত্রণায় মরাই তো ভালো। এটা তো করুণাবশতই সরিয়ে নেওয়া। অনেক দেশেই দেহের অক্ষমতার যন্ত্রণা থেকে চিরতরে মুক্তি দিতে নিঃসাড়ে হত্যা করা হয়। বহু দেশের সমাজ এটা ক্ষমার চোখেই দেখে। তাহলে মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তির জন্য নয় কেন? অরো তার পুরনো যুক্তিটা ঝালাতে ঝালাতে চলল।
একসময় তার মনে হল, ভগবান বলে কেউ আছে কি? থাকলে, এখন তার সম্পর্কে কী ভাবছে? তার কাজটার জন্য নরকে না স্বর্গে পাঠানো হবে? কাজটা অবশ্যই যুক্তিপূর্ণ, মানবিক তো বটেই। কিন্তু মানবিকই যদি হয়, তাহলে মনটাকে এখন অন্য দিকে, চিত্রার সঙ্গ পাওয়ার দিকে, সরিয়ে নেবার জন্য সে এত পথ হাঁটতে যাচ্ছে কেন? বুক ফুলিয়ে বসে থাকতে পারত।
অপঘাতে মরলে নাকি প্রেত হয়ে বেঁচে থাকে। নন্দা প্রেত হবে? প্রতিশোধ নিতে ও কি গলা টিপে ধরবে? বহুকাল আগে এইরকম একটা ব্যাপার সে দেখছে। একটা কঙ্কাল গলা টিপে মারল ভিলেনকে। ভিলেনের পার্ট করেছিল ধীরাজ ভট্টাচার্য। নন্দাকে অবশ্য পুড়িয়ে দেওয়া হবে। লোকজন জোগাড় করতে হবে। ওসব ব্যবস্থা চিরোই করে দেবে।
ঘণ্টাখানেক হাঁটার পর অরো একটা চায়ের দোকানে ঢুকে বসল। একটা ডাবল-হাফ দ্রুত খেয়েই সে আর একটা দিতে বলল। ধূমায়িত আর এক কাপ আসতেই সে মুখে তুলেও নামিয়ে রাখল।
এত তাড়াতাড়ি খাওয়াটা উচিত নয়। একটু একটু চুমুক দিয়ে খাওয়া দরকার। প্রথম কাপ অত তাড়াতাড়ি শেষ করেই সঙ্গে সঙ্গে আর এক কাপ চেয়ে সে ইতিমধ্যেই বোকামি করেছে। যদি পরে কিছু গোলমাল ঘটে যদি পলাতকের সন্ধান চেয়ে তার ছবি কাগজে বেরোয়, যদি চা-ওয়ালাটা সেই ছবি দেখে, আর যদি মনে পড়ে যায়, পর পর গরম দু’কাপ চা খেয়েছিল এই লোকটিই-তাহলে কি হবে?
কোর্টে এই লোকটাই সাক্ষী দিয়ে বলবে, ‘হুজুর, আমার ঠিকই মনে আছে। অমন চৌকো চওড়া মুখ আর মোটা চশমা সহজে ভোলা যায় না। সেদিন খদ্দেরপাতিও বেশি ছিল না। কী যেন ভাবছিল, বিড়বিড় করছিল আর গরম চা খুব তাড়াতাড়ি খাচ্ছিল।’
উকিল ব্যাপারটাকে এমনভাবে বোঝাতে চাইবে যেন গরম দু’কাপ চা তাড়াতাড়ি শুধু খুনিরাই খায়। চৌকো চওড়া মুখ আর মোটা চশমা যেন পৃথিবীতে একজনেরই আছে, তাই দেখামাত্রই চেনা যায়।
