এখন নিজেকে অদ্ভুত রকমের বিচ্ছিন্ন ও নিঃসঙ্গ বোধ করছে অরো। যেন খুব কাছের থেকে অরবিন্দ ভাদুড়ি নামে একটি লোকের কাজকর্ম সে দেখে চলেছে। কৌটো থেকে চামচ খানেক ওষুধের গুঁড়ো বেসিনে ফেলে দিল যে লোকটি, জল দিয়ে বেসিনে লেগে থাকা গুঁড়ো ধুয়ে দিল যে লোকটি, সেই মানুষ যে সে নিজেই এটা তার কাছে সত্য বলে মনে হচ্ছে না।
কৌটোয় আর কতটা রইল, সেটা ভালো করে অরো দেখল। চামচ তিনেক প্রায়। এর থেকে দু’চামচ নন্দা খাবে। কী ভেবে সে, আর একট গুঁড়ো ফেলে বেসিনটা ধুয়ে দিল। যতটা রইল সবটাই ওকে খেতে হবে।
পকেট থেকে পুরিয়াটা বার করে সে সাবধানে কাগজের পাট খুলে তাকে রাখল। মেঝের থেকে একটা দেশলাইয়ের পোড়া কাঠি কুড়িয়ে, তার ডগা দিয়ে যতটা বিষ ওঠে, বিষ তুলে সে কৌটোয় ফেলল। কাঠিটা দিয়ে নেড়ে কৌটার ঢাকনি আঁটল। কাঠিটা রান্নাঘরের জানলা দিয়ে ফেলে দিল। পুরিয়ার কাগজ ভাঁজ করে পকেটে রাখল।
কাজ চুকে গেল।
জিনিসটা এখন কৌটোর মধ্যে। কৌটোটা বিছানার পাশে টেবলে যে অবস্থায় ছিল, ঠিক সেইভাবেই অরো রেখে দিল। সারা ঘরে চোখ বোলাল সে। বসার ঘরে এল। এখানেও সে খুঁটিয়ে সারা ঘর দেখল। আর বড়োজোর একটা রাত ঘরটা এইরকম থাকবে।
মাসখানেক অন্তত চিত্রার থেকে দূরে থাকতে হবে। ও বুঝবে কেন দূরে থাকছি। ভাববে, শোক মোচন করতে একা থাকতে চাইছি। ছ-মাস এক বছর বিয়ের ব্যাপারটা পিছিয়ে দিতে হবে। তাড়াহুড়ো করলে কথা উঠবে, কানাকানি হবে, সন্দেহ রটবে, পুলিশের কানে যাবে। হয়তো গোপনে তদন্ত শুরু করবে।
তবে অত দেরিতে তদন্ত করে কিছুই পাবে না। তাহলেও সাবধানের মার নেই। বেরোবার জন্য তৈরি হয়ে অরো অপেক্ষা করতে লাগল।
স্নান সেরে নন্দা বাথরুম থেকে বেরোল। মসৃণ তেলা চামড়ার উপর ফোঁটা ফোঁটা জল। তাজা প্রফুল্ল মুখমণ্ডল। মৃদু সৌরভে ঘরটা ভরে যাচ্ছে।
”বেরোচ্ছি। বাইরেই এ বেলা খেয়ে নেব। রাতে নেমন্তন্ন আছে, এক বড়ো কোম্পানির পি আর ও-র ছেলের পৈতে, বেহালায়। এই এক ঝামেলা, না গেলেও নয় অথচ রাতে অত দূর থেকে ফেরাও এক ঝঞ্ঝাটের।”
”কত রাত হবে?”
”জানি না, তবে সাড়ে এগারোটার মধ্যেই ফিরব নয়তো বাস পাব না।”
”কিছু একটা দিতে হবে তো।”
”হবেই। বইটই কিনে নেব।”
”সারাটা দিন আমায় একা থাকতে হবে।”
”সিনেমায় যেতে পারো তো।”
”তাছাড়া আর কী করার আছে।”
কথা বলতে বলতে দুজনে বাইরের দরজার কাছে এসেছে।
”সাবধানে থেকো। মতি কবে আসবে, পরশু?”
”তাই তো বলে গেছে।”
”সাবধানে থেকো।”
দরজা খুলে অরো, সাবধানে ভেজিয়ে দেবার সময় দেখল নন্দা তাকিয়ে আছে তার দিকে। মৃদু হাসল।
সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে অরো সামান্য বিব্রত হল। মনের মধ্যে কিছুই হচ্ছে না তার। না দুঃখ, না আবেগ। আগাগোড়াই সে শীতল, অনুত্তেজিত ভঙ্গিতে জনৈক অরবিন্দ ভাদুড়ীকে যেন দেখে যাচ্ছে। দৃশ্যের মধ্যে অরোর নিজের কোনো অংশ নেই। মনে হচ্ছে অন্যান্য দিনের সকালের মতোই আজকের সকালটাও। অন্যান্য রাতের মতোই হয়তো আজকের রাতেও ফিরে এসে দেখবে নন্দা বই পড়ছে কী রেডিয়ো শুনছে।
অরো ভেবে পাচ্ছে না, আসলে সে কতটা অস্বাভাবিক হয়ে পড়েছে। বাড়ি থেকে সে বেরোল কপালে উদ্বিগ্ন কয়েকটি কুঞ্চন নিয়ে।
দুপুরে অ্যাডভয়েস থেকে বেরিয়ে মাইলখানেক হেঁটে সে এক ছোটো ওষুধের দোকানে ঢুকল।
ভিড় নেই। মাঝবয়সি একটি লোক চুপচাপ রাস্তার দিকে তাকিয়ে বসে আছে কাউন্টারে।
”সিকোজাইম দিন তো।”
”বড়ো না ছোটো কৌটো?”
অরো মুশকিলে পড়ল।
কোনটা? কোনো মাপের কৌটো? বাড়িতে যেটা রয়েছে সেটা ছোটো না বড়ো? এই সবই হচ্ছে অজানা, অদেখা বিপদ।
না শোনার ভান করে সে জিজ্ঞাসা করল, ”কি বললেন?”
”বড়ো না ছোটো কৌটো দেব?”
”ছোটো।”
দেখলেই চিনতে পারবে। যদি ছোটো হয় তাহলে বলবে বড়ো চাই। না থাকলে অন্য দোকানে যাবে।
আলমারি থেকে দোকানি যেটি বার করল, অরো দেখেই বুঝল এটা ঠিক মাপেরই। দাম চুকিয়ে সে আবার হেঁটে অ্যাডভয়েসে ফিরে এল।
দুপুর গড়িয়ে বিকেলে পৌঁছল।
এক সময় আবার মনে হল, হয়তো নন্দা রাত পর্যন্ত অপেক্ষা না করে এখনই ওষুধ খেয়েছে। হয়তো দুপুরে ভাত খাওয়ার পরই দরকার বোধ করেছে।
বলা যায় না। হয়তো এতক্ষণে ও মারা গেছে।
এই নিয়ে ভাবনা শুরু হতেই ওর বুকের মধ্যে হাতুড়ির ঘা পড়তে শুরু করল। কিছুক্ষণ পর আর সে ধৈর্য রাখতে পারল না। ফোন করল মিসেস চ্যাটার্জির ফ্ল্যাটে।
ওধার থেকে প্রৌঢ়ার ধীর গম্ভীর স্বর শুনে বলল, ‘আমি অরবিন্দ। একবার নন্দাকে ডেকে দেবেন?”
”দিচ্ছি।”
রিসিভার কানে চেপে ধরে অরো বসে রইল। মস্তিষ্ক অসাড় হয়ে আসছে। নন্দা এসে কথা বলবে, নাকি মিসেস চ্যাটার্জিই বিব্রত কণ্ঠে বলবেন, ”অনেকক্ষণ বেল টিপলাম কিন্তু ভিতর থেকে তো কেউ সাড়া দিচ্ছে না।”
যদি তাই বলে তাহলে সে বলবে, ”থাক, হয়তো ঘুমোচ্ছে। আপনি ব্যস্ত হবেন না। পরে দেখা হলে বলে দেবেন আমার ফিরতে রাত হবে।”
এত দেরি হচ্ছে কেন ওধারে। দরজা কেউ খুলছে না দেখে কি উনি চেঁচামেচি করে লোক জড়ো করবেন? সর্বনাশ! দরজা ভেঙে ওরা যদি নন্দাকে মৃত দেখে, তাহলে আগেই তো পুলিশকে খবর দেবে। পুলিশ এসে প্রথমেই কৌটোটা পাবে।
অরো রেগে উঠল নিজের উপর। কেন ফোন করলাম।
