কালো একটা পুলিশের গাড়ি এসে বাড়ির সামনে থামবে। পুলিশের ডাক্তার গাড়ি থেকে নামবে, সঙ্গে একজন ইন্সপেক্টর কি সার্জেন্ট। তারপর প্রশ্ন, প্রশ্ন, প্রশ্ন।
আপনার নাম? স্ত্রীর নাম? বয়স? তারসঙ্গে আরো যাবতীয়। ডাক্তাররা যখন নিজেদের মধ্যে কথা বলবে তখন ইন্সপেক্টর বা সার্জেন্ট তার সঙ্গে কথা বলতে থাকবে: পোশাকি সমবেদনা, বিনয়সহকারে।
আপত্তি করবেন কি, ওরা যদি এই সময়টায় ফ্ল্যাটে ঘুরে ফিরে একটু দেখে? সার্চ? ওহ না। শুধু একটু এধার-ওধার দেখা।
যাই বলুক ওটা আসলে সার্চই। প্রথমে তাকগুলো। কিছুই নেই, ভ্রূ কোঁচকাবার মতো কিছুই নেই। শোবার ঘরে। ড্রেসিং টেবিলে প্রসাধনের জিনিসগুলো, তারপর ড্রয়ার, এরপর রান্নাঘর। কিছুই নেই।
বসার ঘর।
আলমারি, বইয়ের র্যাক।
আপনার স্ত্রী কি হজমের গোলমালে ভুগছিলেন। উনি কি খালি ওষুধের কৌটো গুলো জমান?
আচ্ছা এই যে খালি কৌটোটা উনি বইয়ের পিছনে রেখেছেন, এ সম্পর্কে আপনার কি মনে হয়?
গন্ধ শুঁকবে। অবশ্যই গন্ধ নেই। সন্দেহ করারও কিছু নেই। কিছু গুঁড়ো কৌটোর কৌটোর ভিতরের দেওয়ালে লেগে আছে।
এটা বরং নিয়েই যাচ্ছি।
অ্যানালিসিসে অজানা বিষের খোঁজ পাওয়া যাবে। সাধারণ গেরস্ত-বউ এ বিষ পেল কোথা থেকে? আর যদি চিত্রার সঙ্গে তার প্রেমের ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে যায়-পুলিশ দুই আর দুয়ে চার মেলাবেই-তাহলে?
তাহলে কী হবে!
কিছুক্ষণের জন্য অরোর মনে হল, এই রাতের কৌটো সরিয়ে ফেলার সমস্যাটা সমাধান অসম্ভব। বাথরুমের বন্ধ দরজাটার দিকে তাকিয়ে তার মনে হতে লাগল,পুরো ব্যাপারটা তাকে নাকচ করতে হবে।
বড়ো বেশি ঝুঁকি।
শুধু নিজের ব্যাপারই তো নয়, চিত্রাও জড়িয়ে পড়বে। নিশ্চয় চিত্রার বাড়িতেও পুলিশ যাবে। চারদিকে ঢিঢিক্কার পড়বে। পড়বেই। ওর অভিনয়ের দিক থেকে ক্ষতি হবে। ওকে বাড়ি ছাড়তে হবে।
”বড়ো বেশি ঝুঁকি,” অরো ফিসফিস করল। ”বড়ো বেশি ঝুঁকি।”
ঘটে যাবার আগেই সে যে সবকিছু কল্পনায় খুঁটিয়ে দেখে নিতে পেরেছে, এতে আশ্বস্ত বোধ করল। এরকমভাবে কিছু করা যাবে না। শুধু আজকের রাতের মতো নয়, বরাবরের জন্য ব্যাপারটা সে মন থেকে ঝেড়ে ফেলে দিল। কেননা এইসব সমস্যা পরেও তো উঠবে।
বাথরুম থেকে বেরিয়ে অরো শোবার ঘরে এল। নন্দা বাথরুমে যাবার জন্য তৈরি হয়ে রয়েছে। বসার ঘরে এসে অরো সিগারেট ধরাল।
এখন সে স্বস্তি বোধ করছে। জীবন-মৃত্যু সম্পর্কে যে ধারণাই তার থাক, বিশেষ অবস্থায় মানুষ হত্যায় সে যতই উদাসীন হোক, কিন্তু দীর্ঘকাল ধরে মামলা আর ফাঁসির ঝুঁকি নেওয়াটা অন্য ব্যাপার। ভবিষ্যতে কী হবে না হবে তা সে জানে না। কিন্তু এখনকার মতো কিছু করার নেই। এই চিন্তার বশে অরো বেশ আর ঢিলেঢালা আমেজ পেল। যন্ত্রটা বন্ধ হয়ে গেছে সেই সঙ্গে সারবদ্ধ ঘটনাও।
”খুচরো পয়সা আছে, একটা সিকি?” দরজার কাছ থেকে নন্দা বলল। ”মিসেস চ্যাটার্জির চাকর বাজার যাচ্ছে মৌরী আনতে দেব।”
অরো পকেটে হাত ঢুকিয়ে কিছু খুচরো বার করল। তার থেকে একটা সিকি তুলে নন্দার হাতে দিয়ে খুচরোগুলো পকেটে রাখার সময় আচমকা মনে হল, এইভাবেই তো সমাধান করা যায়। পকেটটা তো রয়েছে। এখানেই কৌটোটা রাখা যেতে পারে। পরদিন বেরিয়ে কোথাও গিয়ে ফেলে দিলেই হল।
খুবই সহজ। ভাবামাত্র অরোর মনে আবর ছেঁকে ধরল চিন্তাগুলো
ডাক্তারবাবু যাই ভাবুন, পুলিশ যাই ভাবুক, তাকে গ্রেপ্তার করার মতো প্রমাণ কিছুই এই ফ্ল্যাটে পাবে না। বিষ প্রয়োগের মামলায় গ্রেপ্তার সঙ্গে সঙ্গেই হয় না। অটোপ্সি হবে, খুনের উদ্দেশ্য এবং পদ্ধতি নিয়ে পুলিস আগে নিশ্চিত হবে। এজন্য সময় লাগবে। করোনারি থ্রম্বসিস অনুমান করা হচ্ছে এমন ক্ষেত্রে, মৃত্যুর দু-এক ঘণ্টার মধ্যেই পুলিশ তার পকেট সার্চ করবে এবং জাজ্জ্বল্য প্রমাণ ছাড়াই, হতে পারে না।
দাঁতালো চাকাগুলো ঘুরছে, যন্ত্র আবার চলতে শুরু করেছে। অরো বুঝল আর তার পালাবার পথ নেই। এবার সে এগোবে কেননা এগোতেই হবে। জীবনে সে কর্মক্ষেত্রে ব্যর্থ, সাহসী নয়, নিজের ওপর আস্থাও নেই। সাফল্যের কোনো হাতিয়ার তার নেই। কিন্তু এবার সে অন্তত প্রমাণ দেবে, দরকার হলে পুলিশ আর সমাজকেও টক্কর দিতে পারে। চিত্রাকে সে পাবে। বছরের পর বছর যে অহংবোধ মার খেয়ে এসেছে তাকে সে এইভাবেই খুশি করবে। এখন যদি সে ভয়ে পিছিয়ে যায় তাহলে নিজের কাছেই সে খতম হয়ে যাবে। নিজেকে প্রমাণ দেবার চরম পরীক্ষায় তাকে নামতেই হবে।
খুনের উদ্দেশ্য এবং অজুহাত নিয়ে সে এতদিন নানা যুক্ত খাড়া করেছিল। এবা অন্য একটা কিছু তার চেতনার তলদেশ থেকে ধীরে ধীরে ভেসে উঠছে। হতাশা, গ্লানি, আত্ম-অহঙ্কার ঠেলে তুলছে সেটাকে। শিল্প, বাণিজ্য, খেলা, রাজনীতির জগতে যারা বিজয়ী, অন্য মানুষকে হারিয়ে যারা নাম করেছে তাদের সঙ্গে একই সারিতে থাকার প্রবল ইচ্ছা তার মধ্যে জেগে উঠছে।
কিন্তু ওরা জিতেছে উন্মুক্ত ক্ষেত্রে, সকলের চোখের সামনে। সে বিজয়ী হবে গোপন রণক্ষেত্রে, অন্ধকারের মধ্যে লড়াই করে। এ যুদ্ধে শিকারের লক্ষ্য একমাত্র নন্দা, যে তাকে বিশ্বাস করে।
বাথরুমের মেঝেয় বালতি পড়ার শব্দ হল। অরো চেয়ার থেকে উঠে বারকয়েক পায়চারি করে শোবার ঘরে এল। ওষুধের কৌটোটা খাটের পাশে টেবিলের উপর একইভাবে রয়েছে। সেটা নিয়ে রান্নাঘরে ঢোকার আগে সে বাথরুমের বন্ধ দরজার দিকে তাকাল। নন্দা একটু বেশি সময়ই নেয়। মিনিট পনেরোর কমে ও বেরোবে না।
