বাথরুমের আয়নায় চুল আঁচড়াবার সময় সে ভাবল, এইসব ছোটোখাটো ব্যাপারগুলোই শেষ পর্যন্ত ধরিয়ে দেয়। সুতরাং এসব দিকে নজর রাখতে হবে।
যে কৌটোটায় বিষ থকবে সেটাকে কী করে পাচার করবে? কয়েকটা সমস্যার উদয় হল অরোর মনে।
তার ফিরে আসার দৃশ্যটা সে কল্পনা করল। হাতে নতুন কৌটো। সদ্য কেনা, এটা না বোঝাবার জন্য লেবেলটা ঘষাঘষি করে ময়লা করতে হবে। বিছানার পাশে বিষ-মেশানো পুরোনো কৌটোটা। নতুনটা রেখে সে পুরোনোটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ডাক্তারবাবুকে অবশ্যই ফোন করতে হবে। মিনিট পনেরো কী তারও কম সময়ে তিনি এসে যাবেন।
বাথরুমে চৌবাচ্চচার পাড়ে বসে অরো স্বচ্ছভাবে চিন্তা করতে চেষ্টা করল। সময়ের ব্যাপারটা নিয়ে খুব সাবধান হতে হবে। শুধু সময়ের মাপজোকই নয়, কাকতালীয়ের মতো একই সঙ্গে কিছু ঝামেলা, অনেক না দেখা, না ভাবা ঘটনা সম্পর্কেও সাবধান থাকতে হবে। এগুলোই প্ল্যানকে ওলটপালট করিয়ে ফাঁসির দড়ি গলায় পরায়। কিন্তু যা আগে ভাবা সম্ভব নয়, তার সম্পর্কে কী করে সাবধান হওয়া যায়?
অধৈর্যভাবে অরো মাথা নাড়ল। অযথা কাল্পনিক বিপদ নিয়ে মাথা ঘামানো। বরং বাস্তব অসুবিধেগুলোর মধ্যেই তার থাকা উচিত। প্রচুর অসুবিধা আশেপাশে রয়েছে।
আবার সে দৃশ্যটা কল্পনা করল। আবার সে নিজেকে দেখল কৌটো হাতে সেখানে দাঁড়িয়ে : অভিযুক্ত করার মতো পদার্থ হাতে। পাশের মিসেস চ্যাটার্জিদের ফ্ল্যাটে টেলিফোন, যেটাকে সে এখুনি ডায়াল করতে যাবে এবং যে-কোনো মুহূর্তে এসে পড়তে পারে ডাক্তার।
কিন্তু যে অরবিন্দকে সে দেখতে পাচ্ছে,সে অনড় হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ব্যাপারটা অরোকে বিভ্রান্তিতে ফেলছে। এইবার তার মনে ভয় ধরতে শুরু করল। তবু ভালো, মতি বাড়িতে নেই। পুলিশ সন্দেহ করবে, ওকে ইচ্ছে করেই ছুটি দিয়ে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মতি নিজেই জানাবে, দেশ থেকে ভাইয়ের পাগলামি বাড়ার চিঠি পেয়ে সে পীড়াপীড়ি করে ছুটি আদায় করেছে নন্দার কাছ থেকে। হ্যাঁ, নন্দাই তাকে ছুটি দিয়েছে। মতির ভাইয়ের পাগল হওয়ার পিছনে অরোর কোনো হাত নেই।
নিজেকে টেনে ধরে অরো বাস্তবে ফিরে এল। বারকয়েক মগে জল তুলে চৌবাচ্চচায় ঢালল। প্রতিটি স্তর ধরে সে অসুবিধাগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল।
দুটো জায়গা আছে জিনিসটা লুকোবার। বাড়ির মধ্যে নয়তো বাইরে।
বাইরে কৌটোটা ফেলে দেওয়া কি বুদ্ধির কাজ হবে?
না হবে না।
কেন? ভুলটা কোথায় হবে?
আশেপাশের বাড়ির কেউ হয়তো সেই সময় জানলায় দাঁড়িয়ে থাকবে, ফেলাটা দেখতে পাবে। পরে কিছু ঘটলে এই ফেলার ব্যাপারটা যুক্ত করবে।
তাহলে মিনিট পাঁচেক হেঁটে মৌলালির কাছাকাছি গিয়ে ডাস্টবিনে ফেললেই হয়, অনেক নিরাপদ সেটা।
না হবে না, এটা অরো বোকামির কাজ।
কেন বোকামি?
অরো তুমি, একটা বোকা! পাড়া-প্রতিবেশীরা জানবেই ঠিক কখন নন্দা মারা গেছে। যদি ওরা দেখে তুমি ওর মারা যাবার পর বাড়িতে এলে আর কয়েক মিনিট পরেই বেরিয়ে গেলে এবং ফিরলে বেশ কিছুক্ষণ পর আর তখনও তুমি ডাক্তার ডাকোনি তাহলে কি বিপদকেই ডাকা হবে না? তোমার এই ছোট্ট ভ্রমণটি নিয়ে প্রশ্ন উঠলে মুশকিলে পড়বে না কি?
যদি প্রতিবেশীরা দেখেই ফেলে, তাহলে ওরা তো ভাবতে পারে ডাক্তারের বাড়িতে গেছলাম।
আকাশ-কুসুম। ওরা ভাবতে পারে আবার নাও তো ভাবতে পারে। ধরো পথে প্রতিবেশীদের কেউ রকে বসে হাওয়া খচ্ছে। সে দেখল একা বেরোলে এবং একাই ফিরলে লোকটা পরে দেখল ডাক্তারকে একা আসতে। ডাক্তারবাবুর সঙ্গে লোকটার পরিচয়ও থাকতে পারে।
তাহলে এভাবে জিনিসটা ফাঁস হয়ে যেতে পারে।
বরং কৌটোটা বাড়িতেই থাক। অন্তত রাত্রির মতো। পরদিন ফেলে দেওয়া যাবে, কিন্তু এই রাত্রে নয়। তাহলে বাড়িতেই রাখা সাব্যস্ত হল।
কোথায়?
কেন, যে-কোনো জায়গায়। ডাক্তারের চোখে পড়বে না এমন জায়গায়। রান্নাঘরে অন্যান্য কৌটাগুলোর সঙ্গে, আলমারিতেও রাখা যায়। ডাক্তারবাবু ডেথ সার্টিফিকেটে সই করে চলে যাবেন। ব্যস, ওখানেই চুকে গেল : করোনারি থ্রম্বসিস, কারণটা তাই লিখবেন।
সমস্যা চুকে গেছে ভেবে বাথরুম থেকে বেরোতে গিয়ে অরো থমকে দাঁড়াল।
করোনারি থ্রম্বসিসের মতোই যে মনে হবে তার নিশ্চয়তা কী? ডাক্তারবাবু যদি তখুনি লিখতে রাজি না হন? বুড়ো খুঁতখুঁতে লোক, ধীরে-সুস্থে কাজ করেন। ডাক্তারির প্রফেশনে ডেথ সার্টিফিকেট দেওয়া একটা বিপজ্জনক কাজ। ভুল করে দিলে ডাক্তার বিপদে পড়বে। ডাক্তারের মাথার মধ্যে থ্রম্বসিসের ধারণাটা ঢুকিয়ে দেবার মতো জ্ঞানগম্যি তার নেই। ডাক্তারবাবুকেই এক্ষেত্রে সিদ্ধান্তে আসতে হবে।
খুনের চিন্তাটা অবশ্য ওনার মাথায় আসবে না। এ নিয়ে চিন্তাই করবেন না।
কিন্তু আত্মহত্যা! যদি তাই সন্দেহ করেন?
বাথরুমের বন্ধ দরজায় কপাট চেপে ধরে নিজেকে গুছিয়ে নেবার চেষ্টা করল। সে কল্পনায় দেখতে পাচ্ছে, ডাক্তারবাবু তাকে নিয়ে বসার ঘরে এলেন। কল্পনা করল তিনি বলছেন : ”না, আমার কেমন যেন মনে হচ্ছে…আপনার স্ত্রীর মনে কোনোরকম কি কিছু ছিল… না না, না, আপনার যতটুকু জানা বা বোঝা সম্ভব, নিশ্চয় নয়, কোনোক্রমেই সম্ভব নয়, …তবুও…মডার্ন লাইফের নানারকম ঝঞ্ঝাট…নার্ভের ওপর দারুণ চাপ পড়ত, অরবিন্দবাবু, অদ্ভুত অদ্ভুত ব্যাপারও ঘটে…কাগজে এই সেদিনই একটা … বুঝতেই পারছেন আমাকে সাবধান হতে হবে…নিশ্চয়ই কিছু মনে করবেন না… একটা ফোন করা দরকার।”
