”কী ব্যাপার, আজ যে এত ভোরে!”
”এমনিই, হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে গেল। ভাবলাম, কলকাতার সকাল অনেকদিনই তো দেখিনি, আজ একটু দেখব।”
”দেখলে?”
”এই ঘর থেকে যতটা। তোমাকে বেশ সুন্দর দেখাচ্ছে।”
হেসে নন্দা বেরিয়ে যেতে গিয়েও থেমে বলল, ”প্রশংসাই বটে।”
”বিজ্ঞাপনের মতো। কাগজে যেমন দ্যাখো, এক কাপ মিলকোজন পান করুন, আট ঘণ্টা ঘুমোন এবং আমার মতো রূপসী হোন।”
নন্দা চা করে আনল।
চা খেতে খেতে অরো হিজিবিজি গল্প করল। সে জানে নন্দা কথা বলতে ভালোবাসে এবং আজকের সকালটায় যাতে ও খুশি থাকে সেদিকে বিশেষ নজর সে দিয়েছে।
কাগজ আসতেই দুজনে ভাগ করে নিল পাতাগুলো। অরোর অভ্যাস বিছানায় শুয়ে কাগজ পড়া। শোবার ঘরে এসে বিছানায় শুয়ে, সিগারেট খেতে খেতে পড়তে লাগল। সিগারেটটা ফুরিয়ে আসতেই বিছানার পাশে টেবিলে রাখা অ্যাশ-ট্রেতে সেটা নেভাতে গিয়ে তার চোখে পড়ল আধগ্লাস জল, একটি চামচ ও হজমি ওষুধ সিকোজাইমের কৌটোটি।
উঠে বসল অরো। কৌটোর ঢাকনা খুলে দেখল প্রায় অর্ধেক খালি। ধীরে ধীরে এবং নিঃসাড়ে সে তার চিন্তাটাকে নিয়ে একটা মতলবের চারপাশে ঘুরপাক খেতে শুরু করল। একটা বেড়ালকে হঠাৎ কিছু খাবার ধরে দিলে প্রথমে সে যেভাবে সাবধানে শোঁকে, অরো সেইভাবে তার মতলবকে গ্রহণযোগ্য কিনা ভাবতে লাগল।
সেই দুটো জিনিস মনে করতে চেষ্টা করল। প্রতিবার নন্দা কতটা করে খায় এবং হজমের গোলমাল ঘটলে কতবার খায়। তার মনে হয়েছে প্রায় চার চামচ এখনও কৌটায় রয়েছে। যতদূর মনে পড়ছে, নন্দা প্রতিবার দু চামচ জলে গুলে খায়।
সেই লেখাটায় বলা আছে জিনিসটা স্বাদহীন। সিকোজাইমও তাই। বুড়োর ব্যাপারটা সে ভাবল। ঝামেলা না করেই কুকুরটা খেয়ে নেয়। কিন্তু ভাতগুলো গপগপ করে গিলে নিয়েছিল। স্বাদ আছে কী নেই, সেটা এর থেকে বোঝা সম্ভব নয়।
ধরা যাক, পুরিয়ার গুঁড়োটা যতটা দরকার তার দ্বিগুণ সে দিল কৌটোর মধ্যে। নন্দা কি সেটা ধরতে পারবে? ওষুধটা ও ঢক করে গিলে খেয়ে নেয়। সুতরাং স্বাদের তারতম্য বুঝতে পারলেও দেরি হয়ে যাবে। যদি বুঝতে পারে আর তারপরই জ্ঞান হারাতে শুরু করে তাহলে ও ভয় পাবে। নন্দা তাকে সন্দেহ করবে না কিন্তু মারা যাবার আগের মুহূর্তে ওষুধ তৈরিতে কোনো ত্রুটি ঘটেছে ভেবে ভয় পাবে। এরকম ত্রুটির কথা তো কাগজে প্রায়ই থাকে।
অরোর মনে এল, যখন সামান্য বুক ধড়ফড়ানি হতেই নন্দা কেমন ভয় পেয়ে গেছল। ‘কীরকম যেন লাগছে অরো, নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে! পারছি না, পারছি না, বুকের মধ্যে কেমন যেন করছে।’ বলতে বলতে জানলার কাছে ছুটে গিয়ে নন্দা হাঁ করে বাতাস গিলতে থাকে। তারপর দুচোখে প্রচণ্ড ভয় নিয়ে সে ঘুরে দাঁড়িয়ে কাতরে ওঠে, ‘অরো, অরো।’ তারপর আবার ‘অরো, অরো’। ডাক্তার ডাকতে যাবার আগেই বাথরুমে গিয়ে নন্দা জল থাবড়ে ঘরে পায়চারি শুরু করেছিল চোখে সেই ভয় নিয়ে।
গুরুতর কিছু হয়নি। কিন্তু তখন অরো মানসিক যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে ভেবেছিল, ”এভাবে নয়, হে ভগবান, এভাবে ওকে মেরে আমাকে মুক্তি দিয়ো না।’
কিন্তু তারপর থেকে আজ পর্যন্ত ধীরে ধীরে সে বদলে গেছে। এখন সে নন্দার মৃত্যু চায় কিন্তু যন্ত্রণা বা ভয়ের মধ্য দিয়ে নয়। সেজন্য অপেক্ষা করতেও সে রাজি, এক সপ্তাহ, এক মাস, এক বছরও।
কাগজ হাতে সে বসার ঘরে এল। নন্দা মুখ তুলে দেখল একবার।
”আবার কি হজমের গোলমাল হচ্ছে? ঘরে ওষুধটা দেখলাম?”
”তেমন কিছু নয়। ইদানীং একটু-আধটু খাওয়া দরকার হচ্ছে।”
”দিনে কতবার খাও?”
”রাতে শোবার আগে। কিনতে হবে একটা, এটা ফুরিয়ে এসেছে।”
”আমি কিনে আনব’খন।”
”আজ আর কালকের মতো আছে।”
”আজই কিনে আনব।”
”এত তাড়াতাড়ির কিছু নেই।”
যা জানতে চেয়েছিল অরো তা জেনে গেল। রাত্রে শোবার আগে একবার খায় সম্ভবত দু’চামচই। সোলোফেন মোড়কটা স্ক্রিপটের খাতাটার মধ্যেই আছে। নন্দা ওতে হাত দেয় না। দেবার কারণও নেই।
শান্ত মনে অরো দাড়ি কামাল, স্নান করল, সময় নিয়ে ভাবতে ভাবতে সে কাজগুলো সারল। মনের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব মিটিয়ে একটা সিদ্ধান্তে আসতে পারায় সে হালকা বোধ করছে।
আজই সে সিকোজাইম কিনবে। ফ্ল্যাটে ফিরে এসে যখন নন্দাকে মৃত দেখবে, তখন বিষ মেশানো কৌটোটার জায়গায় নতুনটা রেখে দেবে। দাঁত মাজতে মাজতে থেমে গিয়ে অরো অবাক হয়ে ভাবে, আশ্চর্য ‘মৃত’ শব্দটার সঙ্গে সঙ্গে এমন কুঁকড়ে গেল কেন মনটা। ”নন্দা মৃত।” কল্পনা করা শক্ত এমন গোছানো, জোরালো মেয়েটি মৃত। জীবনের সবকিছু স্তব্ধ। অসম্ভব মনে হয়।
ঘড়ি দেখে হিসেব করল অরো। রাতে নন্দার শুতে যাবার এখনও পনেরো ঘণ্টা বাকি। রেডিয়ো শেষ হলে, ঘড়ি মিলিয়ে এগারোটায় শোয়।
নন্দা পনেরো ঘণ্টা পর মারা যাবে, তাতে অরোর মনে এখন আর কোনো সন্দেহ নেই। এখন আর তার পড়ে থামা সম্ভব নয়। ঘটনাগুলো সার দিয়ে চলেছে, তার সঙ্গে সেও জড়িয়ে পড়েছে অপ্রতিরোধ্যভাবে। সে জানে মনের দিক থেকে তার আর রেহাই নেবার ক্ষমতা নেই। যন্ত্রটাকে সে চালিয়ে দিয়েছে তার থেকেও ওটার ক্ষমতা বেশি। এখন আর সে থামাতে পারবে না।
মনে মনে অরো ছক ভাঁজতে লাগল।
নতুন কৌটো থেকে এক চামচ মতন রেখে বাকিটা ফেলে দেবে। বেশিও নয়, কমও নয়। যদি তদন্ত হয়, তাহলে পুরো নতুন কৌটো নন্দার বিছানার পাশে দেখলে সন্দেহের উদ্রেক করবে। পুলিশ বা ডাক্তারবাবুর নজর অযথা নতুন কৌটোর ওপর পড়ুক তা সে চায় না। ওরা হয়তো বাকি গুঁড়োটুকু অ্যানালিসিস করাতে চাইবে। তা করাক, কিছু এসে যাবে না তাতে। কিন্তু পুরোনোটার খোঁজ সারা ফ্ল্যাট তন্নতন্ন করবে বা রাস্তায় আস্তাকুঁড়ে ঘাঁটবে এবং খুঁজে না পেয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে, এটা সে চায় না।
