চিত্রা এবারও জবাব না দেওয়ায় চিরো আন্দাজ করল, এখন ও কী ভাবছে। এবার সে বলল, ‘আমার মনে হয় না, অরো কিছু মনে করবে।’
‘না, না, এসব কিছু অরো মনে করবে না। প্রকৃতিটা উদার ওর। তবে একটু আধটু হিংসা হয়তো হবে। এরকমভাবে সন্ধ্যাটা কাটানো ওর দ্বারা সম্ভব নয়।’
অ্যাকসিলারেটর চেপে একটা বাসকে অতিক্রম করে গতিটা চল্লিশ কিলোমিটারে রেখে চিরো বলল, ‘হিংসে করার অধিকার ওর আছে কিনা, তাতে আমার সন্দেহ আছে।’
‘অর্থাৎ?’
‘আমি কী বলতে চাই, আপনি সেটা নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন।’
‘হ্যাঁ,’ নরম স্বরে চিত্রা বলল। তারপর আবার বলল, ‘হ্যাঁ’।
চিত্রার হাত চিরোর পাশেই আলতোভাবে সিটের ওপর। ওর চটি জোড়া পিছনের সিটে। চিরো বাঁ হাতটা রাখল ওর হাতের ওপর সন্তর্পণে। ‘অরো, দারুণ রকমের রোমান্টিক। সবসময় ও খুঁজে বেড়ায় আদত ভালোবাসা।’
মৃদু চাপ চিত্রার হাতে দিয়েই চিরো নিজের হাত স্টিয়ারিংয়ে তুলে নিল।
‘সবসময়ই খোঁজে? তার মানে আপনি বলছেন, ওর প্রথম খোঁজার ফল আমি নই?’
চিরো মাথা নাড়ল।
‘জানি না। হয়তো। হয়তো নয়। যদি জানতাম তাহলেও আপনাকে বলতাম না। আমার কোনো মাথাব্যথা নেই এই নিয়ে।’
চিত্রা চুপ রইল। সিট থেকে হাতটা সরায়নি। থাকুক, চিরো মনে মনে বলল, এবার টেক্কাটা ফেলা যাক।
‘তাছাড়া’, চিরো অন্যমনস্ক স্বরে বলল, ‘যাই ও করুক না, নন্দার শরীরের কথাটা ওর বিবেচনা করা উচিত।’
চিত্রা চট করে মুখ ফেরাল। চিরো সামনের রাস্তার প্রতি মনোযোগী রইল।
‘শরীর! খারাপ নাকি?’
‘হ্যাঁ।’
‘কী হয়েছে নন্দার? কই এ সম্পর্কে অরো আমায় কিছু তো বলেনি?’
বেচারা চিত্রা। চিরো অনুমান করতে পারছে সন্দেহ আর ভয় কীভাবে ওর গলাটা টিপে ধরছে হিমশীতল আঙুলগুলো দিয়ে। কষ্টবোধ করল চিরো। তার ইচ্ছে করছে, গাড়িটা থামিয়ে চিত্রাকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে সান্ত্বনা দিয়ে বলে, কিচ্ছু হয়নি নন্দার, শরীর ঠিকই আছে। শুধু একবার তার বুকের ধড়ফড়ানি হয়েছিল অত্যধিক মাথা ধরার ওষুধ খেয়ে।
‘আমার মনে হয় না,’ চিরো সাবধানে বলল, ‘নন্দার হার্ট খুব জোরালো। অবশ্য সিরিয়াস কিছু নয়।’
চিরো শেষ বাক্যটি একটু ব্যস্ত হয়েই জুড়ে দিল। কোনো বিষয়ে যদি সত্যের আভাস ছোঁয়াতে হয় তাহলে এক-পা পিছিয়ে এসে অস্বীকার করাই ভালো। তাতে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা যায়।
‘আচ্ছা!’ ধীরে চিত্রা বলল। ‘আমি তো জানতাম না, এটা আমি জানতামই না। আমাকে কখনো বলেনি তো।’
‘বলেনি অরো? হয়তো দরকার মনে করেনি। খুব কিছু একটা সিরিয়াস তো নয়।’
চিত্রা কিছু বলল না দেখে চিরো বলল, ‘যাইহোক, এটা আপনি অরোকে বলবেন না। ভাববে, আমি বোধহয় নাক গলাচ্ছি।’
‘বলব না কেন, নিশ্চয় বলব। অনেক কিছুই নির্ভর করে এটার ওপর।’
‘অরোর সঙ্গে আমি ঝগড়া করতে পারব না, চিত্রা। ছোটোবেলা থেকে আমার বন্ধু। আপনাকে বলাটা মনে হচ্ছে, উচিত হয়নি। ভেবেছিলাম, আপনি এটা জানেন।’
কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে চিত্রা বলল, ‘বেশ, বলব না অরোকে। নন্দার হার্ট ভালো নয়, এটা জানিয়ে ভালোই করলেন।’
বাড়ির সামনে গাড়ি থামিয়ে চিরো নামল। ঘুরে এসে চিত্রার জন্য দরজা খুলল। নেমে চিত্রা বলল, ‘চটিজোড়া দিন।’
‘না’।
‘সে কি।’
‘দেওয়া যায় না। কারণ, ওরা আপনার পায়ে ধরার সুযোগ পায়। আমাকে হিংসেয় ফেলার জন্য ওদের শাস্তি দিয়ে ফেরত পাঠাব।’
গাড়িতে উঠে স্টার্ট দিল চিরো। চিত্রা শুধুই দাঁড়িয়ে রয়েছে।
গুনগুন করতে করতে চিরো ফিরল। একবার তার মনে পড়ল অরোর কথা। বেচারা! বাচ্চচার হাত থেকে মোয়া তুলে নেওয়াও এর থেকে শক্ত ব্যাপার।
.
ঘুমন্ত নন্দার মুখের দিকে তাকিয়ে অরো ভাবল, একদিন না একদিন ওকে তো মরতেই হবে। বুড়ি হয়ে, অক্ষম জরাগ্রস্ত হওয়া পর্যন্ত নিজেকে টেনে নিয়ে শেষপর্যন্ত কী লাভ, কী সুখ ও পাবে। এইভাবে যদি ঘুমিয়ে পড়ে, কষ্ট যন্ত্রণা না পেয়ে যদি ঘুমিয়ে পড়ে, সেটাই কি ভালো নয়! এর বদলে, পরিত্যক্তার মানসিক যন্ত্রণা, নিঃসঙ্গতা, চারধার থেকে করুণার পীড়ন ভোগ করার মতো বিশ্রী ব্যাপার আর হয় না। তা হতে দেওয়া যায় না।
প্রতিদিন সকালে নন্দারই আগে ঘুম ভাঙে। কী শীতে কী গ্রীষ্মে। গ্যাস জ্বেলে চা করে। খেয়ে, সে খবরের কাগজ নিয়ে বসে। অরো তখনও ঘুমিয়ে থাকে। দ্বিতীয়বার চা করে অরোকে জাগায়।
আজ সে নন্দার আগেই জেগেছে। ওর ঘুম যাতে ভেঙে না যায়, তাই নড়াচড়া না করে অনেকক্ষণ চিৎ হয়ে শুয়ে থেকে ধীরে ধীরে মাথাটি ঘুরিয়ে সে তাকায় নন্দার মুখের দিকে এবং ভাবতে থাকে, কী করবে, বিশেষ কীভাবে সে করবে।
নন্দা ঘুমিয়ে আছে শান্ত মুখ। নিরাসক্ত মনে অরো ভাবল, এভাবে হয়তো ওর দিকে এই তার শেষ দৃষ্টিপাত। চেষ্টা করল মনের মধ্যে কোমল আবেগের শিখা জ্বালাতে। কিছুই জ্বলল না।
সন্তর্পণে বিছানা থেকে উঠে সে বসার ঘরে এল। তিনদিন ছুটি নিয়ে মতি বসিরহাটে তার দেশে গেছে। কাগজের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল সিগারেট ধরিয়ে।
কিছুক্ষণ পর নন্দা বসার ঘরে এল। ঘুমে ফোলা মুখখানি তাজা এবং কচি দেখাচ্ছে। অরো নিরাবেগ মন নিয়ে লক্ষ করল, নন্দা বেশ সুন্দরীই। তারপর খুশি হল এই ভেবে যে, আবেগ চুঁইয়ে হৃদয়ে মাখামাখি হবার পথগুলো সে বেশ ভালোভাবেই বন্ধ করতে পেরেছে।
