অরো একদৃষ্টে নন্দার মুখের দিকে তাকিয়ে। তারপর বলল, ‘ওকে ভুগতে হল না। কোনোরকম জ্বালা যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে হল না। এটাই হচ্ছে বড়ো কথা। মরতে তো একসময় হবেই, আমাদেরও হবে। কয়েকদিন বা কয়েক মাস বা কয়েক বছর আগে আর পরে। কখন মরছ সেটা তো কথা নয়, কীভাবে মরছ সেটাই আসল কথা।’
চিরোর মনে পড়ল, এইরকম কথাই যেন অরো বলেছিল স্কুলে পড়ার সময়।
যোগেনের ব্যবস্থাপনায় বাগানের এককোণে বুড়োকে কবর দেওয়া হয়।
বিকেলে চিরো জানাল কলকাতায় তার জরুরি কাজ আছে। নন্দা এবং অরোকে তাদের নিজস্ব ভাবনার মধ্যে রেখে চিরো রওনা হয়ে যায়।
বারুইপুর থেকে দ্রুত গাড়ি চালিয়ে সে পৌঁছল দমদমে শ্রীপুর কলোনিতে। তার কেমন যেন মনে হচ্ছে চিত্রা ফিরেছে, আজই দুপুরে।
তার অনুমান মিথ্যা হল না।
সন্ধ্যা নেমেছে কিন্তু অন্ধকার গাঢ় হয়নি, এমন সময়ে সে চিত্রাদের বাড়ির সামনে হর্ণ বাজাল। পিছনের বাড়ি, পাশের বাড়ি থেকে মুখ উঁকি দিল।
চিত্রাদের একতলার দরজা খুলে বেরিয়ে এল একটি মেয়ে। একই সঙ্গে দোতলার জানালায় দাঁড়াল চিত্রা। অন্ধকারেই চিরো হাত নাড়ল। হর্নের শব্দ ও গাড়ি দেখেই সে বুঝেছে কে এসেছে।
দু’মিনিটের মধ্যেই চিত্রা বেরিয়ে এল।
‘আপনি আবার আশ্চর্য করলেন।’
‘ফিরলেন কখন? কথা ছিল আপনার অভিনয় থাকলে জানাবেন, কথা রাখেননি।’
ঝড়ের বেগে কথাগুলো চিরো বলল।
‘সে তো বার্নপুরে!’
‘তাতে কি হয়েছে, যেতাম। পৃথিবীর শেষ প্রান্তেও যেতে রাজি আপনার অভিনয় দেখতে, এ তো মাত্র বার্নপুর।’
কথাটা বলেই চিরো ভাবল, সংলাপটা খুবই কাঁচা হল, কিন্তু আর কিছু এখন মুখে আসছে না। চিত্রা বুদ্ধিমতী, নিশ্চয় বুঝে নেবে এসব কথার কী অর্থ। বুঝুক। অন্ধকারে ওর মুখভাব বোঝা যাচ্ছে না।
চিত্রার হাসি শুনে চিরো আশ্বস্ত হল।
‘এই জেট আর রকেটের যুগে পৃথিবীর শেষপ্রান্তে যাওয়া অনেক সোজা, বার্নপুরে ট্রেনে যাওয়া-আসার থেকে।’
‘কষ্ট করার সৌভাগ্য থেকেও আমাকে বঞ্চিত করেছেন, ডাবলফাইন হওয়া উচিত।’
‘কী রকম!’
‘চলুন বেরোই।’
‘এখন! বিশ্বাস করুন ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে পড়ছে। শুয়ে ছিলাম।’
‘বিশ্বাস করছি। কিন্তু আপনাকে হার্ডল রেস করতে বা এয়ার পলুশ্যনের ওপর বক্তৃতা শুনতে যেতে বলছি না। ময়দানে কীসের একটা মেলা বসেছে চলুন দেখে আসি।’
‘কিন্তু ফিরতে যে রাত হয়ে যাবে।’
‘হোক। দু’মিনিট সময় দিলাম।’
‘দু’মিনিট!’
‘বেশি দিলাম বোধহয়। সুন্দরী মেয়েদের সাজগোজ না করলেও চলে। যে-কোনো শাড়ি চটিতেই মানিয়ে যায়, শুধু বাড়িতে বলে আসার জন্য সময় দিলাম এক মিনিট।’
‘আপনি ভিতরে এসে বসুন ততক্ষণ।’
চিত্রার গলায় হুকুমের আমেজ, কিন্তু হালকা চালে। চিত্রা ভাবল মান্য করাই উচিত।
দরজার পাশেই যে ঘরটায় সে বসল, চিরোর মনে হল এটায় চিত্রার ভাই থাকে। তাকে এলোমেলো পড়ার বই, দেয়ালে হ্যাঙারে ঝুলছে প্যান্ট, তক্তপোশে গোটানো বিছানার তলা থেকে বেরিয়ে রয়েছে ক্রিকেট ব্যাটের হাতল।
একটি মেয়ে চা নিয়ে এল। সুন্দর নক্সা করা কাপ ও পিরীচ। চিরো আন্দাজ করল নিশ্চয় চিত্রারই বোন, মুখের মিল রয়েছে।
‘দিদিকে একটু তাড়া দেবে? তোমার নাম কী?’
‘গীতা। বলছি দিদিকে।’
মেয়েটিকে মিশুকে মনে হল না চিরোর।
দশ মিনিট পর চিত্রা নেমে এল। ওর হালকা প্রসাধনে যত্নের ছাপ দেখতে পেলো চিরো। তার সঙ্গে বেরোনোকে গুরুত্ব দিয়েছে। কিংবা হতে পারে, পেশাদার অভিনেত্রী বাইরে চটক বজায় রাখতে চায়। প্রথম দেখা হওয়া দিনটির হালকা সবুজ রেশম শাড়িটি পরেছে এমনভাবে যা শরীরের রেখাগুলোকে স্পষ্ট করে। চিরো আবার কামনা করল চিত্রাকে।
তারা ময়দানের মেলায় এল। যা খুশি তাই খেল। কিছুক্ষণ ম্যাজিক দেখল, কিছুক্ষণ বাউলের গান শুনল, কবিদের আসরে খানিকটা সময় দিল, বেলুন ফাটালো ছররা ছুঁড়ে, জিমন্যাসটিক দেখল এবং জায়ান্ট হুইলে চড়ে বন বন পাক দিয়ে ওপর-নিচ করার সময় চিরো বাহু আঁকড়ে কাঁধে মুখ গুঁজে চিত্রা ফিসফিসিয়ে বলল, মাথা ঘুরছে। তখন চিরো নিজের গাল ঠেকাল চিত্রার মাথায়, বাহু ধরা চিত্রার আঙুলগুলো চেপে ধরল সজোরে এবং মনে মনে বলল, যেভাবেই হোক তোমাকে দখল করতেই হবে।
নাগরদোলা থেকে নামতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে চিত্রার চটির স্ট্র্যাপ ছিঁড়ল। সঙ্গে সঙ্গে কুড়িয়ে নিয়ে বগলে রাখল চিরো বইয়ের মতো। চিত্রার কোনো আপত্তি শুনল না।
ঘূর্ণিঝড়ের মতো চিরো ঘণ্টা দুয়েক চিত্রাকে এলোমেলো করে রাখল। বারুইপুর থেকে আসার পথেই সে ঠিক করে রাখে, চিত্রার নিঃসঙ্গতা এবং তার তাড়াহুড়োমি, এই দুটির উপর সে নির্ভর করবে। অরো কিছু ভাববে কিনা, এই চিন্তা চিত্রার মনে আসতেই দেবে না। সেদিক থেকে চিরো সফল হয়েছে। তার মনে হচ্ছে, বহুকাল চিত্রা এমন উচ্ছল আমুদে সময় কাটায়নি। গোমড়া, ভদ্র, সিরিয়াস অরো এমনভাবে চিত্রার সময় কিছুতেই কাটিয়ে দিতে পারবে না।
সারাক্ষণ শুধু হাসি আর হাসি, শুধু ব্যতিক্রম বাড়ি ফেরা সময় পথের শেষ দিকটায়।
মানিকতলা মেন রোড থেকে ভি আই পি রোডে পড়ার পর চিরো জিজ্ঞাসা করে, ‘আবার কবে আমরা বেরোচ্ছি?’
চিত্রা নিরুত্তর রইল।
‘পঁচিশে বৈশাখে শান্তিনিকেতন যাবেন? আমি এখনো পর্যন্ত দেখিনি।’
