‘ভালো লাগল না।’
‘বেশ গরম পড়ে গেছে।’
চিরো মুখ তুলে দেখল, অরোর মুখে কতকগুলো রেখা যা আগে ছিল না। চোখের কোলে ছায়া পড়েছে।
‘হঠাৎ বার্নপুরে?’
‘বার্নপুর ঠিক নয়, আসানসোল। মক্কেল পাকড়াতে গেছলাম। গিয়ে শুনি এক সপ্তাহের জন্য দিল্লি গেছে। ফিল্মে নামতে চায়, অঢেল ঠিকেদারির টাকা।’
মিথ্যে কথা। চিরো মনে মনে হাসল। চিত্রার সঙ্গে ট্রেনে গা ঘেঁষাঘেঁষি করার লোভ সামলাতে পারেনি।
‘ডকুমেন্টারি করতে কেউ টাকা ঢালবে না।’
‘ভাবছি ফিচার ফিল্মেই হাত দেব। বাচ্চচাদের জন্য ছবি করব।’ থেমে একটু হেসে অরো যোগ করল, ‘অ্যাডভয়েসটা ছাড়ব। চিত্রার সঙ্গে কথা হয়েছে, যতদিন না দাঁড়াতে পারব ও স্টেজের কাজ চালিয়ে যাবে। ও রাজি আছে।’
‘চিত্রা অন্য ধরনের।’ কথাটা বলেই চিরো ভাবল, যদি চিত্রাকে পাই, এবং পাবই, তাহলে ও আর জীবনে কখনো স্টেজে পা দেবে না।
‘তবে মনে হয় না বেশিদিন ওকে অভিনয় করার কাজ করতে হবে।’ অরো বলল।
‘করতে হবে না?’
‘ও এমনই মেয়ে, ওর জন্য পৃথিবী জয় করতে ইচ্ছে করে।’
‘এমন ধরনের?’
চিরো মজা পাচ্ছে। অরোর মতন বুদ্ধিমানও মনের ভাব প্রকাশের জন্য বস্তাপচা বহু ব্যবহৃত কথা ছাড়া আর কিছু খুঁজে পেল না।
‘সাকসেসফুল না হবার কোনো কারণ নেই। ঠিক করেছি কমার্শিয়াল হব। বম্বে ফিল্মকে তাক লাগিয়ে দেব।’
‘দাঁড়িয়ে আছিস কেন, বোস।’
চিরো একটু সরে বসল অরোকে জায়গা দিয়ে। তারপর বলল, ‘তোর নাম না হওয়ার কোনো কারণই নেই। নিশ্চয় হবে। প্রথম ছবিতেই হবে।’
ব্যর্থ হওয়াদের সাধারণত যে ধরনের আশ্বাস দেওয়া হয়, অনেকটা সেইভাবেই চিরো বলল। যে লোকের সফল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে তার সঙ্গে উপায় বা সুযোগ নিয়ে কথা বলা যায়, ব্যর্থদের সঙ্গে তা করা যায় না। চিরো জানে, অরোর দ্বারা ব্যবসায়িক ছবি সম্ভব নয়। ও অত্যন্ত আবেগপ্রবণ, দ্বিধাপীড়িত এবং ধড়িবাজিতে অপটু।
‘তুই ঠিক বলেছিস, প্রথম ছবিই হিট করবে?’ অরোর চোখ উত্তেজনায় ঝলসে উঠল। রেখাগুলো বা ছায়া মুখ থেকে মুছে গেছ মনে হল চিরোর।
‘আমিই ঠিকই বলছি, অনেস্টলি।’
‘হলে, চিত্রার জন্যই হবে। কীভাবে যে ও আমায় ইনফ্লুয়েন্স করে।’
আর ঈর্ষাবোধ করছে না চিরো। তার পাশে বসা অরোর শীর্ণ দেহ, বাতাসে ব্রহ্মতালুতে খাড়া চুলগুলির কম্পন দেখতে দেখতে সে ভুলে গেল বিরাগ।
‘আমাদের বিয়ের পর তুই আসা বন্ধ করবি না তো?’
চিরো বেশ জোরেই হেসে উঠল,-‘কী যে বলিস। ভালো কথা, নন্দাকে জানাচ্ছিস কবে?’
‘জানাব’ অন্যমনস্কের মতো চিরো বলল, ‘সময় হলেই জানাব।’
বুড়ো বেরিয়ে এসেছে। অরো শিস দিয়ে হাত নাড়তেই সে পরিচয় জ্ঞাপনের জন্য ল্যাজ দোলাতে দোলাতে এগিয়ে এল। বুড়োর কানের পিছন ও গলা চুলকিয়ে দিতে লাগল অরো।
‘চিরো একটা কথা বলি, আমার এই সময়ে তোকে পাশে পেয়ে যা ভালো লাগছে।’
‘কী আর আমি করেছি।’ চিরো অস্বস্তিভরে বলল। ‘আমাকে ছাড়াই চলে যাবে।’
অরো মাথা নাড়ল।
‘এই সময়টায় কথা বলার জন্য কাউকে চাই। তোকে পেয়ে বেঁচে গেছি, নয়তো-‘
অরো কথা বন্ধ করে আবার মাথা নাড়ল এবং বুড়োর পিঠে, পাঁজরে চাপড় দিতে থাকল। চিরোর মনে হল তার হৃৎপিণ্ডটা কেউ মুঠোয় চেপে ধরেছে। সে বলল ‘চল এবার ভিতরে যাই।’
দুপুরে সকলের খাওয়া শেষ হবার পর বুড়ো মরে গেল।
ব্যাপারটা এইভাবে ঘটে।
ভিতরের দালানে অরো, চিরো এবং নন্দা টেবিল বসে যতক্ষণ ধরে খাচ্ছিল, বুড়ো ততক্ষণ উঠোনে উবু হয়ে বসেছিল। তিনটি কুকুর, সম্ভবত বুড়োরই অধঃস্তন চতুর্থ কি পঞ্চম, পুরুষ, বয়সে তরুণ, উঠোনেই দরজা ঘেঁষে অপেক্ষা করছিল উচ্ছিষ্টের আশায়। ভিতরে আসতে পারেনি অরোর ভয়ে।
খাওয়ার সময় অরো কইমাছের মুড়ো এবং কাঁটা প্লেটে রাখছিল বুড়োর জন্য। চিরো এবং নন্দাকেও রাখতে বলে।
খাওয়া শেষ হতে অরো বলল, তোমরা যাও, আমি বুড়োটাকে খাইয়ে যাব। নয়তো ওগুলো সব কেড়ে খেয়ে নেবে। আর একটু ভাত লাগবে, রান্নাঘরে আছে?’
নন্দা বলল, ‘দেখতে হবে। খুকি সবটাই নিয়ে গেছে কিনা জানি না।’
নন্দা রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছিল, অরো বাধা দিয়ে বলল, ‘থাক, আমিই দেখছি।’
ব্যস্ত হয়ে কাঁটা ভরা প্লেট হাতে অরো রান্নাঘরে ঢুকল। নন্দা এবং চিরো বাথরুমে হাত ধুয়ে দালানে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। মিনিট চারেক পর অরো রান্নাঘর থেকে বেরোল।
নন্দা জিজ্ঞাসা করল, ‘এত দেরি হল যে? পেয়েছ?’
‘হ্যাঁ, কাঁটার সঙ্গে মেখে দিতে দেরি হল।’
অরো প্লেটটা উঠোনে রাখতেই বুড়ো এগিয়ে এসে খেতে শুরু করে। ওর পিঠে কয়েক সেকেন্ডের জন্য হাত রাখল অরো। সিগারেট ধরিয়ে চিরো মশলার কৌটো থেকে সুপুরি বাছছে। কৌটোটা ধরে আছে নন্দা।
খাওয়া শেষ করে বুড়ো দরজার দিকে আস্তে আস্তে এগোল। কিন্তু দরজা পর্যন্ত ও পৌঁছল না। গজ তিনেক গিয়েই ধীরে ধীরে উঠোনে শুয়ে কাত হয়ে গড়িয়ে পড়ল। একবার যেন দীর্ঘশ্বাস ফেলল শ্রান্তের মতো। তারপর অনড় হয়ে গেল।
সঙ্গে সঙ্গে অরো এগিয়ে গেল কুকুরটার দিকে। কয়েক সেকেন্ড পর অদ্ভুত স্বরে বলল, ‘একদম মরে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে ছটফটও করেনি। এভাবে মরা অনেক ভালো; কাতরানি নেই, খাবি খাওয়া নেই। ঠিক যেন ঘুমিয়ে পড়ল।’
নন্দা এবং চিরো এগিয়ে এসে ঝুঁকে বুড়োকে দেখল। অন্য কুকুরগুলো পালিয়ে গেছে। আঙুল কামড়াচ্ছে নন্দা, মুখ থমথমে। বলল, বেচারা বুড়ো। ও না থাকলে বাড়িটা অন্যরকম লাগবে। কী যেন একটা নেই মনে হবে।’
