‘তোমাদের সম্পর্কে কাল রাতেও অনেকক্ষণ ভেবেছি।’
নন্দা ফিরে তাকাল চিরোর দিকে। তার চোখে প্রত্যাশা, হয়তো তার সমস্যা সমাধানের জন্য চিরো কিছু নৈতিক সহায়তা দিতে পারবে।
‘তোমরা দুজন, দিনেনবাবু আর তুমি, আমার ধারণা সুখীই হবে। কিন্তু আমি ঠিক বুঝতে পারছি না আর একজনকে অসুখী করে, তোমরা তা হতে পারবে কি না।’
‘না, তা হওয়া সম্ভব নয়। তুমি ঠিকই বলেছ।’
খুকি বঁটি নিয়ে এসে পড়ায় চিরো উত্তর দিতে গিয়ে থমকে গেল। সে দালানে উঠে এসে চেয়ারে বসল, তার সঙ্গে সঙ্গে এল নন্দাও।
‘আঁশ ছাড়া আগে।’ নন্দা নির্দেশ দিল এবং তাকাল চিরোর দিকে।
‘কিছু লোক আছে হয়তো পারে, কিন্তু তুমি সুখী হতে পারবে না। তোমার মতো বিবেকসম্পন্ন মেয়ের সাধ্য নয়।’
কপাল থেকে চুলগুলো পিছনে সরাতে লাগল নন্দা। মুখ লাল হয়ে উঠেছে, নীচের ঠোঁট কাঁপছে। আঙুল দিয়ে সে চোখ কচকাল।
‘আমার কি মনে হয় জান, যদি তোমরা সুখী হবে বুঝতাম, তাহলে বলতাম অরোকে ত্যাগই করো।’
নন্দা কথা বলল না। এক দৃষ্টে মাছের আঁশ ছাড়ানো দেখতে লাগল।
চিরো আবার বলল, ‘দিনেন হয়তো সুখী হবে, কিন্তু তুমি হবে না। সারাক্ষণ তুমি অরোর কথাই ভাববে, সবকিছু তেতো হয়ে যাবে। এমনকি হয়তো দিনেনের সঙ্গে সম্পর্কটাও।’
নন্দা হাসবার চেষ্টা করল। চোখে টলটল করছে জল। কাঁপা ঠোঁটে হাসবার চেষ্টা করে সে মাথা নাড়ল।
মুহূর্তের জন্য চিরোর মন বেদনায় ভরে গেল। সেটা নন্দার মনঃকষ্টেতে তার নিজেরই বদমায়েশিতে। বিবাহিতা নারীর পক্ষে যতদূর সম্ভব বড়ো লোভের মুখোমুখি এই নারী। কিন্তু কর্তব্য সম্পর্কে, ন্যায় ও অন্যায় সম্পর্কে ওর নিজস্ব ধারণা এত গভীর যে লোভ দমনের লড়াইয়ে জিতে গেছে।
চিরো হঠাৎ চেয়ার থেকে উঠে, কিছু না বলে, বাইরের বারান্দায় এসে পায়চারি শুরু করল। আমি যা করছি সেটা জঘন্য, চিরো অস্থিরভাবে বিড়বিড় করল, অন্যায় করছি নন্দার উপর। ওকে কি এখন বলব, যেসব কথা বলছি ঠিক তার উলটোটি তোমার করা উচিত। কিন্তু এ-কথা ওর কাছে গিয়ে বলতে পারব না। নিজেকে যতটা শক্ত ভাবি ততটা আমি নই।
চিরো ভেবে দেখল, তিনটি মানুষকে সে সুখী করার ক্ষমতা রাখে। যত সুখী তারা জীবনে হচ্ছে তার থেকেও বেশি। আর একজনকে পারে মোটামুটি সুখী করতে। কিন্তু নির্দয় মানুষদের ক্ষেত্রে প্রায়শঃই যা হয়, প্রচণ্ড আবেগ ফুঁসে উঠে চিরোকে ভাসিয়ে দিল।
সে মনে মনে অরোকে তার মৃদু হাসি, শান্ত ভদ্র ব্যবহার, ভীরুর মতো ভাবভঙ্গি সহ কল্পনা করল। অরো ভাবে চিত্রা তার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে কিন্তু কখনোই চিত্রা বুঝতে দেবে না যে তাকে সে ভালোবাসে না। দিনেনের জান্তব পৌরুষের প্রতি আকর্ষিত নন্দার কথা ভাবল। সে বিশ্বাস করে তার স্বামী তার প্রতি বিশ্বস্ততার ওপর নির্ভরশীল, তাই সে নিজের সুখ বিসর্জন দিতে প্রস্তুত। বেচারা এত ভালো।
চিরো ভাবল দিনেনের কথাও। শক্ত সমর্থ, জোরালো চরিত্রের মানুষ। ভদ্র মানুষ। নন্দা যা সিদ্ধান্ত নেবে তাই মেনে নেবে। কষ্ট পেতে হয় যদি স্বীকার করবে। বদান্য, হৃদয়বান দিনেন।
একটু একটু করে আবেগ ফিরে চলে গেল চিরোর মন থেকে।
বদলে ধীরস্থির হয়ে এল তার মন। সিগারেট ধরাল। কখনো যা কল্পনা করেনি, সেই কাজই করবে ঠিক করেছে। নিজের আকাঙ্ক্ষা বাসনা বিসর্জন দেবে ওদের সুখী করতে।
রান্নাঘরের দরজার কাছে এসে সে দাঁড়াল। বুকের মধ্যে দ্রুত দপদপানি চলেছে। কিন্তু সে বদ্ধপরিকর। বুড়ো উঠোনে একইভাবে শুয়ে।
চিরো কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করল দরজায় দাঁড়িয়ে। নন্দা খুন্তি হাতে কড়াইয়ে কী একটা নাড়ছে।
‘নন্দা।’
মুখ থেকে জোর করে শব্দটা বার করতে হল চিত্রাকে। নন্দা মুখ ফিরিয়ে একবার তাকাল, সাড়া দিল না।
‘নন্দা।’ চিরো আবার ডাকল।
নন্দা খুন্তি নাড়া বন্ধ করে ঘুরে দাঁড়াল। কয়েকটা চুল চোখের উপর ঝুলে রয়েছে। ওকে নির্জীব ক্লান্ত দেখাচ্ছে।
‘বলো।’
চিরো এক ধরনের অদ্ভুত আনন্দ বোধ করল ঠিক এই মুহূর্তে। অবিমিশ্র খাঁটি আনন্দ যা একমাত্র দাতার পক্ষেই জানা সম্ভব।
সে কয়েক সেকেন্ড ইতস্তত করল নন্দার অসুখী মুখের দিকে তাকিয়ে। ওর জন্য কি উন্মত্ত সুখ নিয়ে যে সে অপেক্ষা করছে নন্দা তা জানে না। চিরো নিজেকে এখন পবিত্র শুদ্ধ বোধ করছে না, শুধুই আনন্দিত।
পিছনে পায়ের শব্দ তারপর কণ্ঠস্বর শুনল চিরো। চটি থেকে ধুলো ঝাড়ছে অরো। পলকের জন্য চিরো একসঙ্গে দেখল চিত্রা আর অরোকে। ওর চওড়া নিরক্ত ঠোঁট দুটো চিত্রার ঠোঁটে, ওর গভীর সুরেলা কণ্ঠস্বর কূজন করছে চিত্রার কানে। সে কল্পনা করল অরো বিয়ে করেছে চিত্রাকে-আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না চিরো। ‘একটু ঘুরে আসি’, বলে সে বেরিয়ে গেল।
যদি দু’মিনিট দেরি করেও অরো আসত তাহলে ওলটপালট হয়ে যেত ওদের জীবন।
বাইরে ঘুরতে না গিয়ে চিরো বাগানে এসে বসেছিল, কাঁঠাল গাছের নিচে সিমেন্টের বেদিতে। ঈর্ষার জ্বালা, তখনও চেতনায়। যেভাবেই হোক ন্যায় বা অন্যায় যে পদ্ধতিতে হোক, যা সে চায় তা দখল করার জন্য নির্বোধ সহৃদয় দুর্বলতাকে হটিয়ে দিয়ে লড়ার সঙ্কল্প আবার তার মধ্যে ফিরে এসেছে।
অরো বাংলো থেকে বেরিয়ে তার কাছে এসে দাঁড়াল।
‘ঘুরতে গেলি না?’
