রবিবার সকাল। ঢিলেঢালা, আলসেমিতে ভরা। সারা বাড়িটা নিঝুম। নন্দা বোধহয় রান্নাঘরে। বাসনের শব্দ আসছে।
একটা শালিক বাগানে নামল। লাফাতে লাফাতে এগিয়ে থমকালো। মাটি থেকে খুঁটে গেল সম্ভবত পোকা।
অতি মন্থরগতিতে বুড়ো আসছে রান্নাঘরের দরজা লক্ষ্য করে। মাথাটা নামানো। এখানকারই সবথেকে বয়স্ক কুকুর। গায়ের লোম অনেক ঝরে গেছে, চোখে ছানি পড়ে গেছে প্রায় অন্ধ। যোগেনের কাছেই থাকে। বয়সের জন্যই নন্দা ওকে বুড়ো নাম দিয়েছে। নাম ধরে ডাকলে বুঝতে পারে। নন্দারা এলে সারাক্ষণ রান্নাঘরের আশেপাশেই থাকে। বেশিরভাগ সময়ই ঘুমিয়ে কাটায়।
বুড়ো বাগানে একবার থামল। আড়মোড়া ভাঙতে সামনের পা-জোড়া এগিয়ে ডন দিল। পিছনের পা দুটি টান টান করে হাই তুলল। শালিকটা হাঁটতে হাঁটতে ওর পাঁচ হাত সামনে দিয়ে চলে গেল গ্রাহ্য না করে। সম্ভবত জেনে গেছে, বুড়োর শরীরে লাফ দিয়ে শিকার ধরার তাগদ আর নেই।
মাটিতে নাক নামিয়ে কী যেন শুঁকে, বুড়ো মুখ তুলে সূর্যের দিকে তাকাল। যেন বুঝতে চাইছে, যে গরম তার লাগছে সেটা ওখান থেকেই নেমে আসছে কিনা।
চিরো নিচু গলায় ডাকল ‘বুড়ো’।
কুকুরটি শুনতে পেল না। চিরো এবার জোরে ডাকল, ‘অ্যাই বুড়ো’!
বুড়ো মাথা ঘুরিয়ে, ছানিপড়া চোখ তুলে তাকাল। ল্যাজটি বারকয়েক নাড়াল। তারপর মন্থরচালে পিছনের দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
বহু মানুষ জীবনে দেখা হয়ে গেছে আর দরকার নেই, এমন এক ভঙ্গি তার চলনে ফুটে রয়েছে। যোগেনের আরও কয়েকটি কুকুর আছে,তাদের সঙ্গে বুড়োর বনে না। চিরোর মনে হল, বুড়োর বোধশক্তির অর্ধেকই অসাড় হয়ে গেছে। এখন ওর দিনরাত মানে-হয় গরম এবং আর নয়তো ঠান্ডা আর কষ্ট, হয় ভরাপেট আর তৃপ্তি নয়তো ক্ষুধা আর ছটফটানি।
চিরো ভাবল, মানুষও কি অনেকটা কুকুরের মতো নয়! কিন্তু মানুষের যে স্মৃতি রয়েছে। সেটা মানুষকে মজা দেয়, সুখ দেয়, কিংবা অত্যাচার করে, কষ্ট দেয়। স্মৃতি একটা ভালোমন্দ মেশানো ব্যাপার। পুরনো ঘা সময়ের প্রলেপে সেরে যায় কিন্তু কুৎসিতগুলো সারে না। কল্পনার ঘষা খেয়ে বরং শুধু জ্বালা করে। জানোয়ারদের এসব জ্বালা-যন্ত্রণা নেই। আশা-নিরাশা ভয়-ভাবনার বালাই নেই। খুব সহজভাবেই ওরা মরে। পাতের এঁটোকাঁটা খেয়ে সান্ত্বনা একমাত্র এরাই পায়।
চিরো স্নান সেরে পিছনের দালানে এসে দেখল নন্দা আর অরো তার জন্য খাওয়ার টেবিলে অপেক্ষা করছে। দুজনে ভাগাভাগি করে খবরের কাগজ পড়ায় ব্যস্ত। টেবিলে টোস্ট, কলা আর পোচ।
ওরা কেউই দু’চারটির বেশি কথা বলল না। চিরো বুঝল, ওরা দুজনেই সচেতন, সে তাদের গোপন কথার অংশীদার। চিরো সচেতন, ওরা দুজন নিজেদের মনোভাব পরস্পরের কাছে যেন না ব্যক্ত করে। দুজনের মধ্যে নন্দাকেই তার সুন্দর চরিত্রের মনে হয়। ভালো না বেসে বিয়ে করলেও, সে দাম্পত্য সম্পর্ক ভাঙতে চায় না, বোঝাপড়া করে রাখতে চায় আর সেজন্য মানসিক কষ্ট ভোগ করতেও রাজি। তা নয়। চিরো জানে যদি না সে বাধা দিয়ে বন্ধ করায় তাহলে অরো দাম্পত্য সম্পর্ক ভেঙ্গে দেবেই এবং চিত্রাকে বিয়ে করবে।
চিরো ভাবল এক্ষেত্রে দুদিকে দুটো কাজ করতে হবে। নন্দা আর দিনেনের ব্যাপারটায় দেখতে হবে নন্দার যেন অরো সম্পর্কে সহানুভূতি, মমতা, করুণাবোধ ক্রমশ বাড়ে আর চিত্রার সঙ্গে দেখা করে তার মনে এই ধারণাটা পোক্ত করান দরকার যে নন্দার কাছ থেকে অরোকে সরিয়ে নেওয়াটা অন্যায় হবে।
দিনেন গোটা দশেক কই মাছ পাঠিয়ে দিয়েছে সকালেই। দৈর্ঘ্যে এক একটি প্রায় এক বিঘৎ। যোগেনের বছর বারো বয়সি মেয়েটি উঠোনে ছাড়া মাছগুলোর কানকোয় ভর দিয়ে চলাফেরা সামলাচ্ছে একটা কাঠের সাহায্যে। বুড়ো সামনের পা ছড়িয়ে বসে বন্ধ চোখ মাঝে মাঝে খুলে একবার নন্দা, আর একবার মাছগুলোর দিকে তাকাচ্ছে। আর দুটি কুকুর খিড়কি দরজার কাছে বসে।
‘মাছগুলো মারা এক সমস্যা, নয়তো মেয়েটা কুটতে পারবে না।’ নন্দা চিন্তিত স্বরে বলল।
চিরো বলল, ‘তেল-কই হোক আজ, দারুণ ঝাল দিয়ে, কি বলিস?’
‘যা খুশি হোক। আমার শুধু ডাল-ভাতেরও আপত্তি নেই।’ এই বলে অরো কাগজে মন দিল।
নন্দা রান্নাঘরে গিয়ে কোমরে অ্যাপ্রন জড়িয়ে এল। হাতে কয়লা ভাঙার লোহার ডান্ডাটা। চিরো বলল, ‘কী হবে ওটা দিয়ে?’
‘পিটিয়ে পিটিয়ে না মারলে, কুটবে কী করে?’
উঠোনে পড়ে থাকা থলিটায় মাছগুলো ভরার জন্য চিরো মেয়েটিকে বলল। তারপর উঠোনে নেমে এসে থলিটার মুখ জড়ো করে মুঠোয় ধরে আছড়াতে শুরু করল মাটিতে। বুড়ো ধড়মড়িয়ে উঠে দাঁড়াল।
নন্দা হেসে উঠল।
‘বিনা রক্তপাতে খুন।’
‘এতে খুনির বিবেক কিছুটা পরিষ্কার থাকে’, চিরো আছাড় মারতে মারতে বলল। ‘ম্যাকবেথের মতো রক্তের কথা ভেবে তাহলে আর আঁতকে উঠতে হবে না।’
মুখ তুলে সে দেখল অরো বাড়ির ভিতরে চলে যাচ্ছে চেঁচিয়ে সে বলল, ‘অরো চললি কোথায়?’
‘বাগানে যাচ্ছি, যোগেন শশাগাছের মাচা তৈরি করছে।’
চিরো হেসে নন্দাকে বলল, ‘চিরকালইও এইরকম। নিষ্ঠুরতা, রক্ত, যন্ত্রণা সহ্য করতে পারে না।’
নন্দা বলল, ‘সেটা যে অন্যের যন্ত্রণার কারণ হয়।’ তারপর উঠোনে পড়ে থাকা নিথর মাছগুলোর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বঁটি নিয়ে আয় খুকি।’
