‘নন্দাই ওকে সবথেকে ভালো জানে!’ ধীরস্বরে দিনেন বলল। ‘ও মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে, ওকে ছাড়া অরবিন্দ ভেঙে পড়বে। হয়তো ঠিকই। ভদ্রলোক জীবনটাকে বড়ো বেশি গোমড়ামুখে দেখেন।’
চিরোর বুকের মধ্যে অসম্ভব গতিতে এখন দপদপানি শুরু হয়েছে। মাত্র কয়েকটা বাক্য ব্যয় করে সে এই দুজনের বিবেককে শান্ত করে দিতে পারে। মনের গ্লানি, উদ্বেগ, অস্বস্তি দূর করে দিতে পারে। দুজনকে পশ্চিমবাংলার সুখীতম নাগরিকে রূপান্তরিত করতে পারে এবং সেই সঙ্গে অরোর সমস্যাটারও সমাধান করে দিতে পারে।
‘আমার খুব কষ্ট হয় ওর জন্য।’ নন্দা হঠাৎ কথা বলা শুরু করল। ‘খুব বেশিদিন আগে নয়, অরো গভীর রাতে ফিরল খুব ক্লান্ত হয়ে। ঠান্ডাও পড়েছিল সে রাতে। ওর জন্য একটা চিঠি লিখে রেখে দিয়েছিলাম আর একটা চকোলেট। ইদানীং ওকে দেখছি কেমন যেন ঝিমিয়ে পড়েছে, সেটা কাটাবার জন্যই চিঠিটা আধো ঘুমের মধ্যে দেখলাম ও চিঠিটা পড়ল। তারপর শুল। আমি হাত বাড়িয়ে ওর হাত ধরলাম, তারপর ও ঘুমিয়ে পড়ল। কী ঠান্ডা আর ক্লান্ত হয়ে যে ও ফিরেছিল। নিঃসঙ্গ ফ্ল্যাটে নির্জন ঘরে ওকে যে ফিরতে হয়নি, এতে আমি খুশি সত্যিই খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু ডিভোর্স করলে তখন কী হবে?’
‘খাটেন খুবই, কিন্তু ব্যবসার মাথা নেই।’ দিনেন বলল। ‘ওর উচিত কোথাও চাকরি নেওয়া। সকলের সব জিনিস হয় না।’
‘বড়ো বিনীত, বড়ো ভদ্র। যদি ও কাজের ক্ষেত্রে বড়ো হত, প্রচুর টাকা আয় করত, তাহলে আমি ডিভোর্স করতাম।’ নন্দা বলল।
‘যা মনে হচ্ছে, তাতে ডিভোর্স তোমার পক্ষে সম্ভব হবে না।’ দিনেন মৃদু হাসলেও কণ্ঠস্বর তিক্ততায় ভরা। ‘কী বিচিত্র পরিহাস, ভদ্রলোক কাজের ক্ষেত্রে ব্যর্থ, আর সেটাই তাকে জিতিয়ে দিল স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষায়।’
দিনেনের হতাশা কারুরই কান এড়াল না। নন্দা ওর মুখের দিকে তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করল।
চিরো ইতিমধ্যেই ঠিক করে ফেলেছে, অরো এবং চিত্রার সম্পর্কটা এখন যে অবস্থায় সেটা এদের কাছে প্রকাশ করবে না। অরো যদি নন্দার কাছ থেকে মুক্তি পায় তাহলে চিরো হারাবে চিত্রাকে। এবং চিত্রাকে হারাবার কোনো ইচ্ছাই তার নেই।
সহৃদয় অরো এক্ষেত্রে ব্যাপারটাকে যে ফাঁস করে দিত তাতে চিরোর সন্দেহ নেই। কিন্তু অরো জীবনের সবক্ষেত্রেই ব্যর্থ, সে তো নয়। সুতরাং সে বেশিক্ষণ ইতস্তত করল না।
ধীর গম্ভীর এবং কিছুটা বিমর্ষ স্বরে, যেন গভীরভাবে চিন্তা করে, যত অপ্রিয়ই হোক সিদ্ধান্তই জানাতেই হবে, এমন এক পারিবারিক সুহৃদের মতো, নিরপেক্ষ ও উদার ভঙ্গিতে চিরো বলল, ‘আমার মতামতটা কি জানাব?’ এবং ওরা উত্তর দেবার আগেই সে বলল, ‘আমার মনে হয়, নন্দাই ঠিক।’
নন্দা অতি দ্রুত ঝলকে চিরোর দিকে তাকিয়েই চোখ সরিয়ে নিল। মুহূর্তের সেই চাহনির মধ্যে চিরো যেন যন্ত্রণার স্ফুলিঙ্গ নন্দার চোখের আড়ালে দেখতে পেল। হয়তো ও আশা করেছিল, যত কথা বলেছে, যত যুক্তি দিয়েছে, চিরো সেগুলি পালটা যুক্তিতে খণ্ডন করবে। করলে সে রেহাই পেত।
চিরোর আরও মনে হল, খানিকটা মরিয়াভাবও যেন সে দেখেছে। যেন আশা করার মতো যতটুকু ছিল, তাও আর এখন নেই। চিরো মনে মনে দুঃখ পেল, কিন্তু তার দ্বারা আবেগে আচ্ছন্ন হল না।
‘আমার মনে হয় নন্দা ছাড়া অরোর এক মুহূর্তও চলবে না। ও ঠিকই আন্দাজ করেছে, অরো তার দুঃখযন্ত্রণা ভুলতে কিছু একটা করবেই, হয়তো মদ ধরবে। আর কাজকর্মও নষ্ট করবে।’
নন্দা বলল, ‘ধন্যবাদ চিরো, মুখ ফুটে কথা ক’টা বলার জন্য।’
দিনেন এবার মুখ খুলল। ‘আবার বিয়ে করতে পারে, এটা কি মনে হয় না?’
ওর গলায় যেন জরুরি তাগিদ অনুভব করল চিরো। শেষবারের মতো মরিয়া আবেদন। বেচারা!
‘না, তা মনে হয় না।’ চিরো সাবধানে তার যুক্তি পেশ করল। ‘মনে হয় না আবার প্রেমে পড়বে। ওকে আমি ছোটোবেলা থেকেই চিনি তো।’
চিরো উঠে গিয়ে জানলার কাছে দাঁড়াল। সন্ধ্যা নেমে আসছে। পাখিদের কিচিরমিচির পুরোদমে চলছে। তার মনে হল,অরো এখন চিত্রাকে নিয়ে বার্নপুরের রাস্তায় বেড়াচ্ছে। চমৎকার নির্জন একটা বিরাট পার্ক আছে বার্নপুরের অদূরে। সেখানে কি অরোর কোমর জড়িয়ে শরীরে শরীর লাগিয়ে চিত্রা হাঁটছে এখন। অরোর একটা হাত তার কাঁধে। নবীন প্রেমিক-প্রেমিকার মতো আশপাশের লোককে ওরা গ্রাহ্য করছে না। আরও ভারি গম্ভীর গলায় ভালোবাসার কথা বলতে বলতে চিত্রা বাহু আঁকড়ে ধরছে। নিরালা নির্জন জায়গায় এলেই অরো ঝুঁকে চিত্রার ঘাড়ে বাহুতে বা বুকে চুমু খেয়ে নিচ্ছে।
ঈর্ষা আবার আক্রমণ করছে চিরোকে। প্যান্টের পকেটে তার দুই মুঠো শক্ত হয়ে উঠল। ঘুরে দাঁড়িয়ে সে বলল, ‘আমার মনে হয় না আবার বিয়ে করার কোনোরকম সুযোগ অরোর আছে।’
চিরোর উত্তেজিত চড়া গলা শুনে ওরা দুজন ভাবল, অরোর ভালোমন্দর কথা ভাবতে ভাবতে সে মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছে।
পরদিন ভোরের ট্রেনেই কলকাতা থেকে অরো বারুইপুর এসে পৌঁছল। বার্নপুরে সে দুপুরের কয়েক ঘণ্টা মাত্র ছিল।
.চিরো খালি গায়ে জানলায় দাঁড়িয়ে। বসন্ত চলে গিয়ে গ্রীষ্ম এসে গেছে এইরকম একটা অনুভূতি মাখানো খুবই সাধারণ সকাল। তবে কলকাতার এত হালকা সোনার মতো রোদ, এত উজ্জ্বল এবং জ্বালাহীন এমন সকাল থাকে না। অল্পক্ষণের মধ্যে কলকাতা চিড়বিড় করে ওঠে। ফুরফুরে হাওয়া দিচ্ছে। চিরো কয়েকবার দীর্ঘশ্বাস টানল। গায়ের চামড়ার ওপর দিয়ে বাতাস কেটে চলেছে। অদ্ভুত শিরশিরানি লাগছে তার, যেন এইমাত্র মালিশ করা হয়েছে তাকে। এমন তাজা ঝরঝরে বোধটা বহুদিন সে পায়নি।
