দরজাটা বন্ধ। তার পাশের দুটো জানলাও। নন্দা কি কোথাও গেছে? চিরোর মনে পড়ল, ইদানীং দিনেনের পুকুরে নাকি প্রায়ই সে ছিপ নিয়ে বসছে। দিনেন লোকটাকে মন্দ লাগে না তার। প্রাচুর্যে ভরা ওর সবকিছুই-বিত্ত, চিত্ত এবং স্বাস্থ্য। এগুলো ব্যবহারেও কার্পণ্য করে না। বন্ধুত্বপরায়ণ অথচ নিঃসঙ্গ।
রোদ্দুরের ঝাঁঝ এড়াতে সে একটা পেয়ারা গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরাল। নিস্তব্ধতা, গাছপালা মাটির গন্ধ আর বহুদূর পর্যন্ত দেখার মতো আকাশ ধীরে ধীরে চিরোকে কিছুক্ষণের জন্য ভুলিয়ে দিল অরো এবং চিত্রার কথা। ঝিরঝিরে বাতাস বুক ভরে টানতে টানতে সে ভাবল, কলকাতার বাইরে একটা বাড়ি করলে কেমন হয়!
দূরে একটা গরু ডাকল, তারপরই একটা ঘুঘু। চিরো সিগারেট ফেলে বাংলোর দিকে এগোল। কয়েক ধাপ সিঁড়ি বেয়ে টালি ঢাকা বারান্দা। বারান্দাটা ঘুরে পিছন দিকে উঠোনে যাবার আর একটা ছোট দরজায় শেষ হয়েছে। বড়ো বড়ো সেকেলে খড়খড়ির জানলা বারান্দার উপর।
চিরোর পায়ে রাবার সোলের চটি। শব্দ হয় না। সবক’টা খড়খড়ি বন্ধ, শুধু একটির একটি পাল্লা মাত্র খোলা। ওটা বসার ঘর। হয়তো যোগেন মালি ভিতরে আছে। দরজা খুলে দেবার জন্য ওকে ডাকার উদ্দেশ্যে জানালাটার কাছাকাছি এসেই চিরো থমকে পড়ল। ঘরের ভিতর যা তার চোখে পড়ল, তা দেখার জন্য সে আদৌ তৈরি ছিল না। যে ঝাঁকুনি সে পেল তার উৎস, খুন বা নিষ্ঠুর নির্যাতন ধরনের কিছু দেখার ফলে নয়। তবে বড়োরকমের ধাক্কাই সে পেল।
তার মনে হল, গাড়ি থেকে নেমে ভাঙা পাঁচিল দিয়ে ভিতরে না এসে গেটটা খুলে দেবার জন্য যোগেনকে ডাকতে হর্ন বাজানো উচিত ছিল। তার মনে হল এই চটিটা না পরে চামড়ার ভারি গোড়ালির জুতোটা পরে এলেই ভালো হত। তার মনে হল, আজ বারুইপুরে না এলেই ভালো হত।
জানালার সঙ্গে কোণাচে করে রাখা একটা বড়ো শেটি। তাতে নন্দা বসে। তার দু’হাতে বেড়ি দিয়ে রয়েছে একটি লোকের গলা। লোকটির ঠোঁট চেপে রয়েছে তার ঠোঁটে। লোকটি ঝুঁকে মুখ নামিয়ে রয়েছে। ঘরের মধ্যে আবছা আলো-আঁধার। কয়েক সেকেন্ড, তারপরেই অজানা কোনো কারণে দিনেন হঠাৎ মুখ তুলল এবং চিরোকে দেখতে পেল।
দিনেন অস্ফুটে কী বলল নন্দাকে। সিধে হয়ে মাথার চুলে হাত বোলাল বিন্যস্ত করতে। নন্দা চমকে উঠে খাড়া হয়ে বসল এবং সেও চুলে হাত রাখল।
চিরো প্রায় ছিটকে সরে গেছে জানলাটা থেকে। ভেবে পাচ্ছে না এবার সে কি করবে। ভাবল, জায়গাটা ছেড়ে চটপট গাড়িতে উঠে চলে যাই। যেন কিছুই দেখিনি, এমন ভাব দেখিয়ে অন্য কোনোদিন ওদের সঙ্গে দেখা করে কথা বলব।
হয়তো সে তাই করত। কিন্তু ইতস্তত করা কালে আবছাভাবে তার মনে হল, এটাকে হয়তো সে পরে কাজে লাগাতে পারবে।
চিরো মন্থর গতিতে পিছনের দরজার দিকে এগোল, ওদের সামলে ওঠার সময় দিয়ে। ওরা কী বলে, কী করে প্রথমে সে তাই দেখতে চায়। যদি ওরা কিছু না বলে, তাহলে সেও ও সম্পর্কে উচ্চচবাচ্য করবে না, অন্তত এখনকার মতো।
পিছনের দরজার কাছে চিরো পৌঁছবার আগেই সামনের দরজা খুলে দিনেন চেঁচিয়ে বলল, ‘আরে চিরোবাবু যে!’
চিরো ঘুরে দাঁড়িয়ে কণ্ঠে যথাসাধ্য বিস্ময় ফুটিয়ে বলল, ‘আরে দিনেনবাবু আপনি! এই তো গাড়ি থেকে নেমে ঢুকছি। ভাবলাম, যাই অরো আর নন্দার সঙ্গে আড্ডা দিয়ে খানিকটা টাটকা বাতাস ফুসফুসে ভরে আনি।’
‘গাড়িতে এসেছেন, কই আওয়াজ পেলাম না তো! ঠেলে আনলেন নাকি! ছোট্ট তির্যক হাসল দিনেন। ‘এইদিকে আসুন।’
চিরো সামনের দরজা দিয়ে বসার ঘরে এল।
নন্দা ঘরের প্রান্তে দাঁড়িয়ে, পিছন ফিরে তাকে রাখা ম্যাগাজিনগুলো গোছাচ্ছে। পরনে বেল-বটস আর শার্ট। চিরো ওর শরীরকে তারিফ করল মনে মনে। সে লক্ষ করল, ইতিমধ্যেই শেটিতে হেলান দেবার বালিশগুলো ফাঁপিয়ে সাজিয়ে রাখা, নন্দার চুল এবং পোশাকও পরিপাটি। একমাত্র মেয়েরাই পারে অবিশ্বাস্য দ্রুততায়, দু-এক মিনিটের মধ্যে এইসব কাজগুলো সেরে ফেলতে।
‘তোমাদের ফ্ল্যাটে গিয়ে শুনলাম এখানে এসেছ। ভাবলাম যাই একটা রাত কলকাতার বাইরে কাটিয়ে ফুসফুসটা পরিষ্কার করে আসি।’
নন্দা ঘুরে দাঁড়িয়ে চিরোর চোখে চোখ রাখল সহজভাবে, মুখে মৃদু হাসি, তাতে আতিথ্যে দেবার সম্মতি। শুধু চিবুকটা অযথা উদ্ধত ভঙ্গিতে একটু তোলা।
‘ভালোই তো। থাকো না আজ রাতটা।’
এরপর ওরা স্বাভাবিক মানুষের মতো কথাবার্তা বলার চেষ্টা শুরু করল।
‘বেশ গরম পড়ে গেছে।’ চিরো বলল।
‘কলকাতায় তো এখানকার থেকেও বেশি গরম মনে হয়।’ নন্দা বলল।
‘কালবৈশাখীর মতো একটা ব্যাপার পরশু হয়ে হয়েও হল না।’ দিনেন বলল।
‘এয়ার পল্যুশনের খবরটা দেখেছেন? কলকাতার লোকেরা যে কি করে এখনও বেঁচে আছে বুঝছি না। ভাবতে পারেন চৌরঙ্গীর বাতাসেই নাকি বিষাক্ত গ্যাস সবথেকে বেশি।’ চিরো বলল।
‘কার্বন মনোক্সাইড ওখানেই বেশি জমবে; লরি, বাস, প্রাইভেটকারের ভিড় তো ওখানেই বেশি, নিউ ইয়র্কের থেকেও বেশি।’ নন্দা বলল।
‘নিউ ইয়র্কের থেকে বেশি কিছুতেই নয়।’ দিনেন আপত্তি জানাল। ‘আসলে কার্বুরেটর, সিলিন্ডার, পিস্টন রিং কিছুই তো আমরা প্রপারলি রাখি না, ওভারহল করাই না, ভেঙে গেলেও বদলাই না। সুতরাং গাড়ি কম হওয়া সত্ত্বেও ধোঁয়া বেশি হবেই। এসব ব্যাপারে সাহেবরা পাক্কা। গত মাসে আমার একটা লরির সাইলেন্সার ফেটে বিদঘুটে শব্দ করতে শুরু করে। বসিয়ে দিয়েছিলাম। মানুষের কানের স্বাস্থ্যরক্ষার কথাটা তো অবশ্যই আমাকে ভাবতে হবে।’
