অরো যেসব যুক্তি দেখিয়েছে সেগুলোকে সে এক কথায় বাতিল করে দিল-যদি নিজের বউয়ের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে, তাহলে আমিই বা কী এমন অপরাধ করব যদি চিত্রাকে দখল করি।
চিরো শিস দিতে দিতে গাড়ি চালিয়ে ফিরল।
.চিত্রার কাছ থেকে চিঠি বা টেলিফোন পাবার জন্য চিরো সাতদিন অপেক্ষা করল। কোনো সাড়াশব্দ এল না। ঈর্ষায় দগ্ধ হতে লাগল এইভাবে যে, চিত্রা প্রতিদিনই অরোর সঙ্গে নিশ্চয়ই দেখা করছে। মনের মধ্যে সে নানারকম ছবি দেখতে লাগল : অরো জড়িয়ে ধরছে চিত্রাকে অ্যাডভয়েসের নির্জন স্টুডিয়ো ঘরে। অরোর কাঁধে মাথা রেখে চিত্রা হাঁটছে নির্জন ময়দানের উপর দিয়ে রাত্রে কিংবা বেঞ্চে বসে আছে হাতে হাত রেখে। অরো চুমু খাচ্ছে আর তাতে সাড়া দিচ্ছে চিত্রার ঠোঁট। অরো দু’ হাতে চিত্রাকে জড়িয়ে কানে কানে বলছে, সে কত ভালোবাসে।
যদিও চিরো জানে, ঈর্ষা জন্মায় ভয় বা আত্মবিশ্বাসের অভাব বা অনিরাপত্তা বোধ থেকে, কিন্তু চিত্রার ব্যাপারে সে নিজের ওপর দারুণভাবে আস্থাবান। তা সত্ত্বেও সে ঈর্ষার তীব্র জ্বালায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। অরোর চৌকো, চওড়া মুখটা মনে পড়লেই সে এখন বিরক্তিতে ভরে যায়, অথচ আগে মজাই পেত। চিত্রার ঠোঁটের উপর ওর শুকনো পাংশু ঠোঁট চেপে রয়েছে কল্পনা করলেই চিরো ছটফট করে ওঠে বোবা জন্মায়।
দুদিন সে সন্ধ্যায়, অ্যাডভয়েস থেকে শ’খানেক গজ দূরে গাড়িতে বসে অপেক্ষা করেছে ঠায় তাকিয়ে থেকে। দুদিনই সে অরোকে একা বেরিয়ে এসে বাসে উঠতে দেখে। হয়তো চিত্রার সঙ্গে দেখা করতে কোথাও নামতে পারে ভেবে বাসটাকে সে অনুসরণ করছে। অরো বাড়ি ঢুকছে দেখে তবেই ফিরেছে।
অবশেষে শনিবার সকালে চিরো টেলিফোন করল চিত্রার দেওয়া নম্বরে। ডেকে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে মিনিট তিনেক অপেক্ষা করার পর ওধার থেকে যে কণ্ঠটি ভেসে এল, শুনেই চিরো বুঝল সম্ভবত চিত্রার ফোন।
‘চিত্রা আছেন?’
‘দিদি তো আজই ভোরে বার্নপুর গেছে, ওখানে ওদের শো আছে আজ।’
‘কালই ফিরবেন কি?’
‘ঠিক জানি না।’
‘এলে বলবেন চিরো ফোন করছিল। নামটা মনে থাকবে তো?’
ফোন রেখে চিরো ভাবল, নন্দার সঙ্গে গল্প করে, ওর হাতের রান্না খেয়ে, রাজি হলে ওকে নিয়ে সিনেমা দেখে আজ সারাদিনটা কাটাবে। আর সুবিধা পেলে বাজিয়ে দেখবে অরোর সঙ্গে তার সম্পর্কটা এখন কেমন।
যথারীতি দরজা খুলল মতি। চিরোকে দেখে একগাল হেসে বলল, ‘কেউ নেই আজ।’
‘ব্যাপার কী, গেল কোথায়?’
‘একসঙ্গেই ভোরে দুজন বেরিয়েছে। দিদি শেয়ালদা স্টেশন, বারুইপুর যাবে বলে; দাদা হাওড়া স্টেশন, বার্নপুর যাবে বলে।’
‘অরো বার্নপুর। কেন’?
‘বন্ধুর অসুখ, দেখতে গেছে।’
শোনামাত্রই প্রচণ্ড বজ্রাঘাতে চিরোর শরীরের অভ্যন্তর খাক হয়ে গেল। কিছুক্ষণ সে মতির মুখের দিকে চুপ করে তাকিয়ে রইল।
‘চা খাবেন?’
চিরো কিছু না বলে, ভিতরে ঢুকে বসবার ঘরে এসে চেয়ারে বসল। মাথার মধ্যে একটা কথাই তালগোল পাকাচ্ছে : চিত্রা আর অরো দুজনেই একসঙ্গে বার্নপুর গেছে। ওখানে অরোর কোনো বন্ধু আছে বলে কখনো সে শোনেনি। এটা মিছে কথা, তবে চিত্রার হয়তো শো আছে। ওর সঙ্গে সময় কাটাবার জন্যই অরো গেছে। অনেকগুলো ঘণ্টা ওরা একসঙ্গে থাকতে পারবে। হয়তো একঘরেও থাকবে।
‘কফি করে দোব?’
চিরো মাথা হেলাল। মতি ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে সে অন্যমনস্কের মতো টেবিলের একটা খাতায় পাতাগুলো ওলটাল। কয়েক পাতা উলটিয়ে বন্ধ করার সময় দেখল একটা সেলফোন খাম। খাতাটা বন্ধ করে সে ভাবল, এই মুহূর্তে কোনো ট্রেন আছে কি বার্নপুর যাবার?
কিন্তু সেখানে গিয়ে সে কি করবে? ওরা দুজন তাকে দেখে অবাক হবে ঠিকই কিন্তু বার্নপুরে আসার কী কারণ দর্শাবে? ব্যবসার কাজে এসেছি? খবর পেলাম চিত্রা এখানে অভিনয় করবে তাই চলে এলুম। অরো ভাবতে পারে, চিত্রার অভিনয় দেখার জন্য চিরোর এত মাথাব্যথা কেন? চিত্রা কী বিরক্ত হবে? অরোর সঙ্গে নিবিড় সান্নিধ্যে বিঘ্ন উপস্থিত হওয়ার জন্য চটতে পারে।
মতি কফি এনে দিল। কাপটা নিয়ে চিরো জানতে চাইল, ‘অরো কবে ফিরবে কাল?’
‘তেমন কিছু তো বলে যায়নি। ফিরলেও ফিরতে পারে। তবে দিদি কাল বারুইপুর থাকবে। এখন মাছ ধরার দারুণ নেশায় পেয়ে বসেছে। দিনেনবাবুর পুকুরে প্রায়ই ছিপ নিয়ে বসছে।’
‘তাইতো’, চিন্তিত স্বরে চিরো বলল। ‘ভাবলুম সারাদিন এখানে আড্ডা দেব, তা আর হল না। কি করি বলতো?’
‘সারাদিন তাহলে ঘুমোন, বিকেলে সিনেমা যাবেন।’
‘ধ্যুৎ, দিনে ঘুমোনো অভ্যাস নেই।’
‘তাহলে এধার-ওধার বেড়ান। বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করুন।’
‘হুঁ।’
চিরো কপি শেষ করে উঠে দাঁড়াল। ‘বরং বারুইপুর থেকে ঘুরে আসি।’
‘যদি যান তো, দিদির ওষুধটা তাহলে নিয়ে যান। ভুল করে ফেলে রেখে গেছে। রোজ রাতে খাওয়া অভ্যেস।’
মতি দ্রুত বেরিয়ে গেল এবং ফিরে এল সাদা প্লাস্টিকের একটা কৌটো হাতে। চিরো সেটা নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নামটা পড়ল।
‘সিকোজাইম। হজমি গুঁড়ো।’
.চিরো বারুইপুর পৌঁছল একটা নাগাদ। বাগানটা পাঁচিলে ঘেরা। পঞ্চাশ-ষাট বছর আগে তৈরি মানুষ সমান উঁচু পাঁচিল বহু জায়গায় ভেঙে পড়েছে। টিনের চাদরে মোড়া বিরাট গেটটা বন্ধ ভেতর থেকে। গাড়ি থেকে নেমে, চিরো পাঁচিলের ধার দিয়ে হেঁটে, একটা ভাঙা জায়গা পেল। সেখান থেকে সে ভিতরের বাগানে ঢুকল। গেটে ভিতর থেকে তালা দেওয়া। পেঁপে আর পেয়ারা গাছগুলোর ফাঁক দিয়ে একতলা বাংলোর সদর দরজাটা দেখা যাচ্ছে।
