‘মুশকিলটা হল,’ অবশেষে চিত্রা বলল, ‘মেয়েদের প্রয়োজনটা শুধু ভালোবাসা পাওয়ারই নয়, দেওয়ারও। অরো আমাকে ভালোবাসে, আমাকে ওর দরকার। কিন্তু কেন যে, সেটাই বুঝছি না। যাই হোক ওর ভালোবাসাকে স্বীকার করে নিয়েছি। আমাকে ভালোবাসার জন্য ওর কাছে আমি কৃতজ্ঞ।
চিত্রা কথা বলল না। চিরো আবার বলল, ধীর ও স্পষ্ট স্বরে, ‘ওর ধারণা, আপনি ওকে ভালবাসেন।’
চিত্রা এবারও কথা বলল না। চিরো ইচ্ছে করেই ওর দিকে তাকাল না। এই কথা নিয়ে চাপ দিয়ে ওকে অপ্রতিভ করে তুলতে তার ইচ্ছে করছে না। বরং সহানুভূতিতেই সে আচ্ছন্ন হচ্ছে। চিত্রা এখন নিজের মনকে যাচাই করার চেষ্টা করে চলেছে। বেচারা এখন কষ্টের মধ্যে রয়েছে। তার ইচ্ছা করছে বলতে, আমায় তুমি কিছু বুঝিয়ে বলতে চেয়ো না চিত্রা, আমি এসব বুঝি।
কিন্তু তার বদলে চিরোর মাথার হিসেবি দিকটা মতলব ভাঁজতে শুরু করল। অত্যন্ত মৃদু এবং কোমল স্বরে সে বলল, ‘অরোর সঙ্গে জীবন শুরু করার পক্ষে, মনে হয় না কৃতজ্ঞতা খুব একটা পোক্ত বনিয়াদ হবে। ওর চাহিদাটা আরও বেশি।’
‘অরো বেশিই তাহলে পাবে।’
তীক্ষ্ন দ্রুত জবাব দিল চিত্রা। সঙ্গে সঙ্গে চিরো কুঁকড়ে পিছিয়ে গিয়ে বলল, ‘নিশ্চয়, বেশিই পাবে।’
‘মানুষটাকে আমি ভালোবাসি, এটা আপনি ঠিক বুঝতে পারছেন না। আমি ওকে দেখব, যত্ন করব ও দেখবে আমায়। আমি চাই ওকে স্নেহ-মমতা, ভালোবাসা দিতে! মনে হয় আঘাত পেয়েছে, স্বপ্ন ভেঙে গেছে, তা থেকে ওকে সারিয়ে তুলতে চাই।’
ঈর্ষার ছুরি চিরোর বুকে বিঁধে তাঁকে যন্ত্রণায় কাঁপিয়ে দিচ্ছে। তবু যতটা সম্ভব উৎফুল্ল স্বরে সে বলল, ‘আমার তো মনে হয় আপনি তা পারবেন।’
‘ওকে বিয়ে করব ঠিক করে কি ভুল করেছি?’
‘আপনার বিবেক বিচার করার অধিকারী আমি নই। আর এ কথাটা বলছি অরোর বউয়ের কথা ভেবে নয়। অরোর কথা ভেবেই সেই সঙ্গে আপনারও।’
‘আমি ওকে সুখী করতে পারব। অন্তত এখন যতটা সুখী তার থেকে বেশিই পারব। মানুষটা এত ভালো।’ চিত্রা প্রায় বিষণ্ণকণ্ঠে বলল, ‘আমি ওকে সুখী দেখতে চাই।’
বুকের মধ্যে টনটন করল চিরোর। অরোকে তারও ভালোবাসতে ইচ্ছে করে কিন্তু আজকের অরোকে নয়। স্কুলের সেই তাড়া খাওয়া অসহায় অরো, ছুটির পর স্কুলঘরের জানলায় দাঁড়িয়ে থাকা শুকনো মুখ ছেলেটির কথা ভাবলেই চিরো দুর্বল হয়ে পড়ে। কিন্তু এখন এ ধরনের চিন্তাকে বেশিক্ষণ প্রশ্রয় দিতে সে রাজি নয়।
‘আমার দিকে তাকিয়ে বলুন তো, অরোকে কি আপনি ভালোবেসেছেন?’
চিত্রা মুখ ফিরিয়ে বলল, ‘এ প্রশ্ন কেন?’
‘যা জানতে চেয়েছি আগে তাই বলুন, আপনি কি অরোকে ভালোবেসেছেন?’
চিত্রা ইতস্ততঃ করছে। সেই মুহূর্তেই চিরো সন্দেহের ক্ষুদ্র বীজটি চিত্রার উর্বর কোমল হৃদয়ে আলতো করে ফেলল এই আশায়, যদি তা থেকে কোনোদিন ফল ফলে।
খুবই হালকা চালে, আপন মনে চিরো বলল, ‘আসলে, নন্দা ওকে ভালোবাসে না বললে ভুল বলা হবে। নিজস্ব ধরনে নিশ্চয়ই সে অরোকে ভালোবাসে। তাই ভয় হয়, আঘাতটা খুব জোরেই পাবে বোধহয়। অরো যা করতে যাচ্ছে, আমি হলে কিছুতেই তা করতে পারব না।’
এরপর চিত্রাকে কিছুটা বিষণ্ণ মনে হল চিরোর। পথনির্দেশ দেবার জন্য সে বেশি কথা বলল না। কলোনি বললেই মাটির সরু রাস্তা, একতলা চালাবাড়ির যে দৃশ্য চোখে ভেসে ওঠে শ্রীপুর আদৌ তা নয়। চওড়া পিচরাস্তা, পার্ক, দিঘি এবং আধুনিক নকসার দোতলা-তিনতলা বাড়িতে ভরা এলাকাটির যে রাস্তায় চিত্রাদের বাড়ি সেখানে গাড়ি ঢোকার আগেই চিত্রা থামাতে বলল।
‘গাড়ি ঘোরাবার জায়গা নেই আমাদের এই রাস্তাটায়। আমি হেঁটেই যাই বরং, ওইতো সামনেই বাড়ি।’
চিরোও নেমে ওর সঙ্গে হাঁটতে শুরু করল।
‘এত রাতে আপনাকে আর বসতে বলব না, আর একদিন বিকেলে বরং আসুন। চা-এর নেমন্তন্ন রইল।’
‘চা! আমার মতো খাইয়ে লোক শুধু চা-বিস্কুট খেতে এতদূর আসবে?’
‘বেশ তাহলে দুপুরেই নয় আসুন।’
‘কবে?’
‘জানাব’খন।’
‘কী করে? আমার ঠিকানা কি ফোন নাম্বারটা তো জানেন না।’
ব্যাগ থেকে কার্ড বের করে চিত্রার হাতে দিয়ে চিরো বলল, ‘আপনার তো ফোন নেই, তাহলে জানব কী করে কবে আপনার অভিনয় আছে?’
‘সামনের বাড়িতে ফোন আছে। ভালো লোক ওরা, ডেকে দেয়। দিন কলমটা।’
অন্ধকারেই চিরোর আর একটা কার্ডের পিছনে ফোন নাম্বারটা লিখে দিল। সেই সময় চিরোর ইচ্ছা করছিল ওকে ভীষণভাবে বুকে জড়িয়ে ধরতে, ওর দুই ঠোঁটের কোমলতা নিজের ঠোঁটে, ওর দেহের উষ্ণ কমনীয়তা নিজের দেহে অনুভব করতে।
কিন্তু কুচক্রী কণ্ঠস্বরটি মাথার মধ্যে ফিসফিসিয়ে বলল-বাড়াবাড়ি কোরো না। নেকড়ে হয়ো না। ধৈর্য্য ধরো, তাহলেই সফল হবে।
বিদায় নিয়ে, লোহার ছোট্ট গেটটা খুলে চিত্রা ভিতরের আঙিনায় ঢুকল। চিরো অন্ধকার রাস্তায় দাঁড়িয়ে। সম্ভবত ওর মা-ই দরজা খুললেন। দরজা বন্ধ হল। কিছুক্ষণ পর দোতলার ঘরে আলো জ্বলে উঠল।
চিরো নিজের সঙ্গে তর্ক করতে করতে ফিরল। বারবার সে নিজেকে বোঝাল-কিছু লোক ভণ্ডামি করার জন্যই জন্মায়, আমিও তাই। অরোর সঙ্গে বন্ধুত্ব ছুটে যাবে। যাক আমি অবিবাহিত; অরো বিবাহিত। চমৎকার একটি ভালো বউ ওর আছে। যে-কোনো সাধারণ লোক নন্দার মতো বউ পেলে বর্তে যাবে। তাছাড়া এই ধরনের আঘাত পাবার মতো কোনো অপরাধই নন্দা করেনি।
