ওয়েটারকে বরাদ্দ দিয়ে চিরো বলল, ‘রাত হয়ে গেলে মা নিশ্চয় ভাববেন।’
‘আমার বেশি রাতে ফেরায় মা অভ্যস্ত।’
‘বাবা থাকলে বোধহয় থিয়েটার করা-টরা চলত না।’
‘বলা শক্ত। অঙ্কের অধ্যাপক ছিলেন, প্রিন্সিপল মেনে চলতে চাইতেন, কিছু কিছু গোঁড়ামিও ছিল। কিন্তু অভাবে অসুখে, পোষ্যদের কথা ভেবে, শেষদিকে দেখেছি ওনার অনেক প্রিন্সিপলই শিথিল হয়ে যাচ্ছিল।’
চিরোর মনে হল, আলোচনাটা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া উচিত। তাই আচমকা বলল, ‘আপনি এমএ পরীক্ষাটা তো দিতে পারেন।’
চিত্রা অকৃত্রিম অবাক হল। চিরো লক্ষ করল ওর চোখ দুটি আকর্ষণীয় ভীষণভাবে সম্মোহনকারী। সারা মুখে চামড়া আর পেশি লাবণ্য ছড়িয়ে দিয়েছে ভাঁজে ভাঁজে। এমন মুখ মধ্যবয়সে এমনকি বার্ধক্যেও সুন্দর দেখাবে।
‘আমি?’
হেসে ফেলল চিত্রা। চিরো এইটাই চেয়েছিল।
‘কখনো ভাবিনি। বোধহয় দরকার হয়নি। মেজো বোনটা ফিলজফিতে পাশ করে এখন কাঁথিতে একটা স্কুলে আছে।’
‘বিয়ে দেবেন না?’
‘দিতে কি আর হয়, করে নেবে। বরং বিয়ে দিতে হবে পরেরটিকে। লেখাপড়ায় সাধারণ, দেখতে শুনতেও। ও আর ছোটোভাইটা, এই দুজনই আমার দুশ্চিন্তা।’
‘ভাই কী পড়ে?’
‘হায়ার সেকেন্ডারি। পাশ করতে পারবে কি না আমার সন্দেহ আছে। সাত-আটদিন আগে আঙুল ভেঙেছে ক্রিকেট খেলতে গিয়ে। তার ক’দিন আগে হাঁটুতে চোট পেল চলন্ত বাসে উঠতে গিয়ে পিছলে পড়ে।’
চিরো লক্ষ করে যাচ্ছে চিত্রার মুখ। পরিবারের কথা বলার সময় উৎকণ্ঠা আর উদ্বেগ সত্ত্বেও মুখটিতে কোনো ফাটল ধরছে না।
‘এই বয়সটাও এরকম।’ নিজের মুখের দিকে আঙুল তুলে চিরো বলল, ‘দাগগুলো এখনও রয়েছে।’
চিত্রা যখন তার গালে কপালে থুতনিতে চোখ বোলাচ্ছে, চিরো তখন পূর্ণদৃষ্টিতে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে। চিত্রার সঙ্গে চোখাচোখি হল। এই প্রথম দীর্ঘক্ষণ, একবার শ্বাস টেনে ত্যাগ করার মতো সময় ধরে ওরা কথা না বলে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে রইল।
চিরোই চোখ সরিয়ে, টেবিলের উপর রাখা চিত্রার হাতব্যাগটা নিয়ে নাড়াচাড়া শুরু করে বলল, ‘পাশটা আগে করুক, তারপর নয় আমার কাছে রেখে প্রেসের কাজ শেখার ব্যবস্থা করব।’
কথাটা বলেই সে চোখ তুলল এবং আবার সরিয়ে নিল। কারণ ওর মাথার মধ্যে তখন একটা কুচক্রী কণ্ঠ ফিসফিসিয়ে বলে চলেছে-চিরো বাড়াবাড়ি করো না। যেন না মনে করে তুমি ওর সঙ্গে ধ্যাষ্টামো করতে চাও অনুগ্রহ দান করে, যেন না মনে করে তুমি নেকড়ে চরিত্রের। তাহলে কিন্তু ও পালাবে। ধীরে, অতি ধীরে এগোও।
‘তা যদি হয়, ওর একটা হিল্লে হলে আমি বেঁচে যাই।’
কণ্ঠস্বর চিরোকে জানিয়ে দিল, চিত্রা জালে ধরা দিচ্ছে। সে বুঝতে পারছে চিত্রার দরকার একজন অভিভাবক। সংসারের জন্য ও জীবনের সেরা সময়ের অনেকটাই খরচ করেছে। এখন চাইছে ভরসা করার মতো সঙ্গী। ও ক্লান্ত, বিশ্রাম পেতে চায়। অরো? মনে মনে হাসল চিরো, বিশ্রাম পেতে হলে টাকা চাই। অরোর টাকা কোথায়? নন্দাকে ডিভোর্স করলে মাসোহারা দিতে হবে। দেবার পর, চিত্রাকে স্বাচ্ছন্দ্যে রাখার মতো টাকা কোথায়। যথেষ্ট রোজগার ওর নেই। চিত্রাকে থিয়েটার করে যেতেই হবে। অরো শুধুই স্বপ্ন দেখে। চিরো ভাবল, স্বপ্নই যদি দেখতাম তাহলে এতবড়ো ব্যবসা গড়ে তুলতে পারতাম না। মেয়েরা চায় দড়, পোক্ত বাস্তববাদী স্বামী।
‘ওর জন্য আপনি ভাববেন না, লেখাপড়ায় আমিও প্রচণ্ড ফাঁকিবাজ ছিলাম। এখনও যথেষ্টই মুখ্যু। তবে-‘
চিরো হাঁফ ছেড়ে বাঁচল ওয়েটারকে খাবারের প্লেট হাতে আসতে দেখে। আর একটু হলেই সে নিজের প্রশংসা শুরু করে দিয়েছিল।
ওরা যতক্ষণ ব্লু মুন-এ ছিল একবারও অরোর নাম উল্লেখ করেনি। গাড়িতে উঠে মিনিট তিনেক পর চিত্রাই প্রথম অরো প্রসঙ্গ তুলল। সোজা প্রশ্ন।
‘আচ্ছা অরোর ব্যাপারটা কী বলতে পারেন? ওর স্ত্রীর সঙ্গে গোলমালটা কোথায়?’
যেন এখুনি কারুর গাড়িচাপা পড়ার কথা আছে, তাই সন্তর্পণে রাস্তার দু-ধারে তাকাতে তাকাতে চিরো সময় নিল উত্তরটা ভেবে নিতে।
‘সবাই বলবে কোনো গোলমাল নেই। কিন্তু আছে।’
‘দোষটা কার?’
‘কারুরই নয়।’
চিরো ধরেই নিল দোষটা যে নন্দারই, সে বিষয়ে চিত্রার মনে সন্দেহ নেই। অরো নিশ্চয়ই ভালোবাসা বঞ্চিত স্বামীর ভূমিকায় সুযোগ্য অভিনয় করে গেছে চিত্রার কাছে। কিন্তু সে যে অনুমানে ভুল করেছে, এটা বুঝল চিত্রার পরের কথায়।
‘অরোও তাই বলে। দোষটা কারুরই নয়।’ এরপর ইতস্তত করে সে যোগ করল, ‘অরোর গোলমালটা হল, সুখের জন্য ও নির্ভর করে আবেগের ওপর। আর এমন একজনের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে, যে জাগতিক ব্যাপারের সব কিছু দখলে রাখার ওপরে নির্ভর করে। মানুষ হিসাবে কিন্তু দুজনেই ভালো।’
‘এটাই ট্র্যাজেডি।’
‘অরোর গোলমালটা হল, এমন কাউকে কখনো পায়নি যে ওকে ভালোবাসা দিতে পারে।’
‘কখনো, নাকি এ পর্যন্ত?’ চিরো মুখ ফিরিয়ে চিত্রার দিকে তাকাল। ‘আপনাকে ও দারুণ ভালোবাসে আর যতদূর মনে হয় আপনিও ওকে, ঠিক?’
‘এখনও জানি না।’
‘সে কি!’ চিরোর অবিমিশ্র বিস্ময় তার কণ্ঠস্বরে একটু জোর দিয়েই প্রকাশ পেল। ‘আমি তো জানি আপনারা গভীরভাবে মগ্ন, একের অপরকে ছাড়া চলবে না।’
চিত্রা সামনে রাস্তার দিকে তাকিয়ে নিরুত্তর রইল। চিরো অপেক্ষা করতে করতে ভাবল, অরোর জীবনে যে দুটি মেয়ে এসেছে, একটি ব্যাপারে তাদের মধ্যে মিল আছে…কেউই মিথ্যা কথা বলতে পারে না।
